অধ্যায়ের এই অংশটা সবচেয়ে কাজে লাগে, আর সবচেয়ে কম মনে রাখা হয়। কারণ এটা কোনো তথ্য নয়, একটা পদ্ধতি। একবার হাতে এলে এটা রসায়নের বাইরেও চলে, কারণ ধাপগুলো আসলে যেকোনো প্রশ্নের।
১. গবেষণা মানে কী
সংজ্ঞাটা শুনতে যত সাদামাটা, তত গুরুত্বপূর্ণ: পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কোনো কিছু জানার চেষ্টাই গবেষণা। আর এর থেকে একটা কথা সরাসরি বেরিয়ে আসে, যেটা বইটা বলতে ভয় পায় না: যিনি এই প্রক্রিয়া মেনে কাজ করেন, তিনিই বিজ্ঞানী। বড় গবেষণাগার লাগে না, দামি যন্ত্র লাগে না; নিয়মটা লাগে।
নিচের উইজেটে একটাই ছোট পরীক্ষা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চালানো হয়েছে। প্রশ্নটা এই: অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড (NH₄Cl) পানিতে দ্রবীভূত হলে তাপ উৎপন্ন হয়, না তাপ শোষিত হয়? ধাপে ধাপে এগোও, আর ওপরের ছবিটা কীভাবে বদলায় খেয়াল করো।
ধাপে ধাপেপরের ধাপে যাও
একটা প্রশ্নের উত্তর, শুরু থেকে শেষ
বিষয়বস্তু নির্ধারণ। প্রশ্নটা এমন হতে হবে যার উত্তর পরীক্ষা করে পাওয়া যায়। “রসায়ন কি সুন্দর” প্রশ্নের উত্তর মাপা যায় না, কিন্তু এটার যায়: NH₄Cl পানিতে দ্রবীভূত হলে তাপ উৎপন্ন হয়, না শোষিত হয়?
তথ্য সংগ্রহ। বই আর আগের গবেষণা দেখে নাও কে কী জানে। দেখা যাবে, কিছু পদার্থ দ্রবীভূত হওয়ার সময় তাপ ছাড়ে, যেমন চুন, আর কিছু তাপ নেয়। কাজেই আগে থেকে ধরে নেওয়া যাবে না। এই ধাপটা বাদ দিলে যা ইতিমধ্যে জানা, সেটাই আবার আবিষ্কার করতে হয়।
কাজের পরিকল্পনা। কী লাগবে ঠিক করে নাও: বিকার, মাপা পানি, থার্মোমিটার, ত্রিপদী স্ট্যান্ড, চামচ আর ওজন করা NH₄Cl। আর কী মাপবে সেটাও আগেই ঠিক: প্রতিবার যোগ করার পর তাপমাত্রা।
অনুমিত সিদ্ধান্ত। তথ্য থেকে একটা সম্ভাব্য উত্তর আগেই দাঁড় করাও। এটা এমন একটা দাবি যা পরীক্ষায় ভুল প্রমাণ হতে পারে, আর সেটাই এর কাজ। অনুমান সেই জিনিস নয় যেটা তুমি রক্ষা করবে; এটা সেই জিনিস যেটা তুমি ভাঙার চেষ্টা করবে।
পরীক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ। পানির প্রাথমিক তাপমাত্রা লিখে নাও। তারপর অল্প অল্প করে NH₄Cl যোগ করো, প্রতিবার নেড়ে তাপমাত্রা মেপে লিখে রাখো। যা ঘটছে তা-ই লেখো, যা আশা করেছিলে তা নয়।
অনুমান যাচাই। তালিকাটা দেখো। প্রতিবার NH₄Cl যোগ করার পর তাপমাত্রা কমেছে, আর বিকারের গা ঠান্ডা লাগছে। তার মানে দ্রবীভবনের জন্য চারপাশ থেকে তাপ শোষিত হচ্ছে। অনুমান যদি উল্টোটা বলত, তবে অনুমানটাই বদলাতে হতো, তথ্যটা নয়।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। একবারে নয়। পরীক্ষাটা কয়েকবার করো, আর প্রতিবার একই ফল পেলে তবেই সিদ্ধান্ত: NH₄Cl পানিতে দ্রবীভূত হওয়া একটা তাপহারী প্রক্রিয়া, অর্থাৎ এতে তাপ শোষিত হয়।
ফলাফল প্রকাশ। কী প্রশ্ন করেছিলে, কীভাবে পরীক্ষা করেছ, কী তথ্য পেয়েছ, কী সিদ্ধান্তে এসেছ, সব লিখে প্রকাশ করো, যাতে অন্যরা একই পরীক্ষা করে যাচাই করতে পারে। প্রকাশ না করলে কাজটা বিজ্ঞান হয়ে ওঠে না, আর আলকেমিস্টরা ঠিক এই জায়গাতেই থেমে যেতেন।
ছবিগুলো হাতে আঁকা মডেল, মাপা চিত্র নয়।
ধাপগুলো মুখস্থ করার জিনিস নয়, চালিয়ে দেখার জিনিস। আর পুরো প্রক্রিয়াটার ভেতরে সবচেয়ে বেশি ভুল হয় দুই জায়গায়: তথ্য সংগ্রহ পরীক্ষার আগে, আর ফলাফল প্রকাশ সবার শেষে। শুরুতে না পড়লে জানা জিনিস আবার আবিষ্কার করতে হয়, আর শেষে প্রকাশ না করলে কাজটা যাচাইযোগ্যই থাকে না।
মিলিয়ে দেখোএকটা উত্তর বেছে নাও
সবার শেষে কোনটা
গবেষণা প্রক্রিয়ার সর্বশেষ ধাপ কোনটি?
পরীক্ষণ মাঝখানে। তার পরেও অনুমান যাচাই, বারবার করে দেখা আর প্রকাশ, তিনটে ধাপ বাকি থাকে।
অনুমান আসে শুরুর দিকে, পরীক্ষার আগে। পরীক্ষার পরে যেটা আসে সেটা অনুমান নয়, সিদ্ধান্ত।
ঠিক। কাজটা শেষ হয় ফলাফল প্রকাশে, যাতে অন্য গবেষকরা একই পরীক্ষা করে যাচাই করতে পারেন। প্রকাশ না করলে দাবিটা যাচাইযোগ্য থাকে না, আর যাচাইযোগ্য না হলে সেটা বিজ্ঞানও নয়।
তথ্য সংগ্রহ শুরুর দিকের ধাপ, পরীক্ষার আগে। এটাকে শেষে রাখলে পুরো ক্রমটাই উল্টে যায়।
২. কেন মাপতেই হয়
ধাপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সহজে বাদ পড়ে মাপার ধাপটা, কারণ উত্তরটা অনেক সময় আগে থেকেই জানা মনে হয়। এখানে একটা দ্বিতীয় পদার্থ পাশে রাখলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যায়। চুন পানিতে মেশালে পাত্রের গা গরম হয়, অর্থাৎ তাপ বের হয়। NH₄Cl মেশালে গা ঠান্ডা হয়, অর্থাৎ তাপ ঢোকে। দুটোই দ্রবীভবন, অথচ উল্টো দিকে।
এইজন্যই আগে থেকে ধরে নেওয়া চলে না। দুটোর যেকোনো একটায় ট্যাপ করে দেখো তাপমাত্রা কোন দিকে যাচ্ছে।
নিজের হাতেদুটোর যেকোনোটায় ট্যাপ করো
মাপলে তবেই জানা যায়
লেখচিত্রটা শুধু দিকটা দেখানোর মডেল। কোনো মাপা পাঠ এতে নেই; নিজে পরীক্ষা করলে সংখ্যাগুলো তোমার যন্ত্রের।
তাপ শোষিত হলে প্রক্রিয়াটাকে বলে তাপহারী, আর তাপ নির্গত হলে তাপ উৎপাদী। ঘন সালফিউরিক এসিড (H₂SO₄) পানিতে মেশালেও প্রচুর তাপ বের হয়, আর সেই তাপ এত বেশি যে সেটা একটা নিরাপত্তার প্রশ্নও হয়ে দাঁড়ায়। সে কথাটা অধ্যায়ের শেষ অংশে ফিরে আসবে।
কে আগেযেটা আগে, সেটায় আগে ট্যাপ করো
ধাপগুলো সাজাও
শুরুতে কোনটা? যেটা ছাড়া বাকি কিছুই শুরু করা যায় না।
হ্যাঁ। পরেরটা?
এখনো না। এর আগে আরেকটা ধাপ বাকি।
ঠিক। সবচেয়ে বেশি ভুল হয় দুই জায়গায়: তথ্য সংগ্রহ পরীক্ষার আগে, আর ফলাফল প্রকাশ সবার শেষে।
৩. অনুমান আর সিদ্ধান্ত এক জিনিস নয়
এই দুটো গুলিয়ে ফেলাই সবচেয়ে দামি ভুল। অনুমিত সিদ্ধান্ত আসে পরীক্ষার আগে, আর সেটা এমন একটা দাবি যা ভুল প্রমাণ হতে পারে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসে পরীক্ষার পরে, আর একবারের পরীক্ষায় নয়, বারবার একই ফল পাওয়ার পরে।
আর দুটোর মাঝখানে যে নিয়মটা দাঁড়িয়ে আছে, সেটা গোটা বিজ্ঞানের মেরুদণ্ড: তথ্য অনুমানের সঙ্গে না মিললে অনুমানটা বদলাতে হয়, তথ্যটা নয়। তথ্য বদলে দিয়ে অনুমান বাঁচানো যায়, কিন্তু তাতে জানাটা আর কিছুই থাকে না।
নিচে একজন শিক্ষার্থীর খাতা থেকে আটটা বাক্য তুলে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটায় ট্যাপ করে দেখো, সেটা কোন ধাপের।
খাতার বাক্যযেকোনো বাক্যে ট্যাপ করো
এই বাক্যটা কোন ধাপের
বিষয়বস্তু নির্ধারণ। পরীক্ষাযোগ্য একটা প্রশ্ন ঠিক করা। খেয়াল করো, এই প্রশ্নটার দুটো সম্ভাব্য উত্তরই আছে, আর দুটোই মেপে যাচাই করা যায়।
তথ্য সংগ্রহ। অন্যের জানা তথ্য আগে দেখে নেওয়া। এই বাক্যটা পরীক্ষার আগের, পরের নয়।
কাজের পরিকল্পনা। দ্রব্য আর পদ্ধতি আগেই ঠিক করে নেওয়া। যা মাপা হবে, সেটাও এখানেই ঠিক হয়।
অনুমিত সিদ্ধান্ত। এখনো কিছুই প্রমাণ হয়নি। “মনে হচ্ছে” শব্দটাই বলে দিচ্ছে এটা সিদ্ধান্ত নয়, আর এটাকে ভাঙার জন্যই পরীক্ষাটা।
পরীক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ। যা ঘটল, তা-ই লেখা। এখানে কোনো ব্যাখ্যা নেই, শুধু পাঠ।
অনুমান যাচাই। তথ্যের সঙ্গে অনুমান মিলিয়ে দেখা। মিলেছে বলে ভালো, না মিললেও ঠিক ছিল, তখন অনুমানটা বদলাতে হতো।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। একবারের ফল যথেষ্ট নয়। “তিনবার” শব্দটাই এই ধাপটাকে আগেরটা থেকে আলাদা করে দিচ্ছে।
ফলাফল প্রকাশ। অন্যে যাচাই করতে পারে বলেই এটা বিজ্ঞান। খাতা জমা দেওয়াও ছোট মাপের প্রকাশ, আর নীতিটা একই।
আটটাই দেখা হলো। সবচেয়ে কঠিন জোড়াটা ছিল “মনে হচ্ছে” আর “তিনবার করলাম”, অর্থাৎ অনুমান আর সিদ্ধান্ত। একটা পরীক্ষার আগে, অন্যটা অনেকগুলো পরীক্ষার পরে।
মিলিয়ে দেখোএকটা উত্তর বেছে নাও
বিকারের গা ঠান্ডা
অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড পানিতে দ্রবীভূত করলে বিকারের গা ঠান্ডা লাগে। এ থেকে কী সিদ্ধান্তে আসা যায়?
তাপ উৎপন্ন হলে গা গরম লাগত, যেমন চুন বা ঘন H₂SO₄ পানিতে মেশালে হয়। ঠান্ডা লাগাটা ঠিক উল্টো ইঙ্গিত।
ঠিক। গা ঠান্ডা লাগার মানে তাপ বিকার আর তার চারপাশ থেকে চলে যাচ্ছে, অর্থাৎ দ্রবীভবন প্রক্রিয়াটা তাপ শোষণ করছে। একেই বলে তাপহারী প্রক্রিয়া।
বাষ্পীভবনেও তাপ লাগে ঠিকই, কিন্তু এখানে ঘটনাটা দ্রবীভবন, আর তাপমাত্রা নামছে যোগ করার সঙ্গে সঙ্গে। ঘরের তাপমাত্রায় রাখা পানি এত দ্রুত বাষ্প হয় না।
দ্রবীভূত না হলে তাপমাত্রার কোনো বদলই হতো না। বদলটা নিজেই প্রমাণ যে কিছু একটা ঘটছে।
৪. ধাপগুলো রসায়নের নয়
শেষ কথাটা এই: এই ধাপগুলোর সঙ্গে রসায়নের কোনো বিশেষ সম্পর্ক নেই। “আমার গাছের পাতা হলুদ হয়ে যাচ্ছে কেন”, এই প্রশ্নটাতেও একই ধাপ চলে। আগে খোঁজো কী কী কারণে পাতা হলুদ হয়। তারপর একটা অনুমান দাঁড় করাও, ধরো পানি বেশি হচ্ছে। তারপর দুটো গাছ আলাদা করে আলাদা নিয়মে পানি দাও আর লিখে রাখো। তারপর মিলিয়ে দেখো, আর কয়েকবার করে দেখো।
আর শেষ ধাপটা বাদ দিয়ো না, এমনকি গাছের ক্ষেত্রেও। যাকে বলতে পারো তাকে বলো। বললে কেউ ভুলটা ধরিয়ে দিতে পারে, আর সেটাই আসলে পুরো পদ্ধতিটার কাজ।
মিলিয়ে দেখোএকটা উত্তর বেছে নাও
অনুমান মিলল না
একজন শিক্ষার্থী অনুমান করেছিল NH₄Cl মেশালে তাপমাত্রা বাড়বে, কিন্তু পরীক্ষায় দেখা গেল তাপমাত্রা কমছে। তার এখন কী করা উচিত?
তথ্য বদলে দিলে অনুমানটা বেঁচে যায়, কিন্তু জানাটা মরে যায়। এটাই সেই একটা কাজ যা করলে বাকি সবটুকু অর্থহীন হয়ে যায়।
অনুমান ভুল প্রমাণ হওয়া ব্যর্থতা নয়, ফলাফল। বরং এই পরীক্ষাটাই সবচেয়ে বেশি শেখাল, কারণ এটা একটা ভুল ধারণা সরিয়ে দিল।
ঠিক। গবেষণার মূল নিয়মটাই এখানে: তথ্য অনুমানের সঙ্গে না মিললে অনুমানটা বদলাতে হয়, তথ্যটা নয়। তারপর পরীক্ষাটা কয়েকবার করে নিশ্চিত হওয়া।
যন্ত্র সত্যিই নষ্ট হতে পারে, কিন্তু সেটা ধরে নেওয়ার জিনিস নয়, যাচাই করার জিনিস। অন্য থার্মোমিটারে আবার মেপে দেখাটা বৈধ পদক্ষেপ; শুধু ধরে নেওয়াটা নয়।