“রসায়ন পড়ে কী লাভ” প্রশ্নটার উত্তর তালিকা দিয়ে দিলে কাজ হয় না, কারণ তালিকা পড়ে সবাই মাথা নাড়ে আর ভুলে যায়। বরং নিজের একটা দিন ধরে ধরে দেখো। সকাল সাতটা থেকে রাত নটা, আটটা মুহূর্ত, আর একটাতেও তুমি গবেষণাগারে ছিলে না।
১. একটা দিন, ভেতরে রসায়ন
ঘড়িটার যেকোনো ভাগে ট্যাপ করো। প্রতিটা ভাগে একটা করে মুহূর্ত, আর প্রতিটার সঙ্গে অন্তত একটা আসল পদার্থের নাম। আটটা ভাগই খুলে ফেলো।
একটা দিনঘড়ির যেকোনো ভাগে ট্যাপ করো
সকাল সাতটা থেকে রাত নটা
সকাল ৭:০০, দাঁত মাজা। টুথপেস্টে থাকে মৃদু ঘষামাজার কণা আর ক্ষয়রোধী যৌগ। ফ্লোরাইড দাঁতের এনামেলকে এসিডের ক্ষয় থেকে বাঁচায়।
সকাল ৭:১৫, সাবান। সাবান হলো চর্বি আর ক্ষারের বিক্রিয়ার ফসল। এর অণুর এক মাথা পানি টানে, আরেক মাথা তেল টানে, আর সেজন্যই ময়লা ছেড়ে দেয়।
সকাল ৮:০০, ভাত। ভাতের স্টার্চ হজম হয়ে গ্লুকোজে পরিণত হয়, আর সেই গ্লুকোজ শ্বসনে পুড়েই সারাদিনের শক্তি।
সকাল ৮:৩০, চা। গরম পানিতে চা-পাতার যৌগ দ্রবীভূত হয়, আর তাপমাত্রা বেশি বলেই দ্রুত হয়। কেন দ্রুত হয়, সেই প্রশ্নটার নাম ভৌত রসায়ন।
সকাল ৯:০০, ইস্ত্রি করা জামা। তুলার সেলুলোজ তন্তু, নয়তো কারখানায় বানানো পলিয়েস্টার। কাপড়ের রংটাও একটা রাসায়নিক যৌগ, আর রং করার কাজটাও রাসায়নিক প্রক্রিয়া।
সকাল ১০:০০, খাতা ও কলম। কাগজ তৈরি হয় কাঠের সেলুলোজকে রাসায়নিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে। কলমের কালি রঞ্জক আর দ্রাবকের মিশ্রণ।
দুপুর ১:০০, বাসে ফেরা। ডিজেল একটা হাইড্রোকার্বন। পুড়লে তাপ দেয়, সঙ্গে কার্বন ডাই-অক্সাইড আর পানি তৈরি করে, আর অসম্পূর্ণ দহনে কালো ধোঁয়া।
রাত ৯:০০, পড়ার আলো। বিদ্যুৎ আসে দূরের কেন্দ্র থেকে। আর যদি ব্যাটারিতে চলে, তবে ভেতরে একটা রাসায়নিক বিক্রিয়াই বিদ্যুৎ হয়ে বেরিয়ে আসছে।
আটটা মুহূর্ত, আটটাতেই রসায়ন, আর একটাতেও তুমি ল্যাবে ছিলে না। এটাই “রসায়ন পড়ে কী লাভ” প্রশ্নটার আসল উত্তর।
ঘড়িটা হাতে আঁকা মডেল, কোনো নির্দিষ্ট দিনের হিসাব নয়।
২. মৌলিক প্রয়োজন থেকে শিল্প
মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলো ধরো: খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা আর শিক্ষা। পাঁচটার একটাও রসায়ন ছাড়া মেটে না। খাদ্যে সার আর সংরক্ষণ, বস্ত্রে তন্তু আর রং, বাসস্থানে সিমেন্ট আর ইস্পাত, চিকিৎসায় ওষুধ আর জীবাণুনাশক, আর শিক্ষায় সেই কাগজ ও কালি যেটা এখন তোমার সামনে খোলা।
চিকিৎসার দিকটা সবচেয়ে সরাসরি। কলেরা, টাইফয়েড, যক্ষ্মার মতো রোগের ওষুধ রসায়নেরই তৈরি, আর তার সঙ্গে জীবাণুনাশক, খাবার স্যালাইন, টিকা সংরক্ষণের ব্যবস্থা, সবই। কৃষিতেও তাই: সার মাটিকে মৌল ফিরিয়ে দেয়, কীটনাশক ফসল বাঁচায়, আর ভিনেগার বা প্রিজারভেটিভ খাবারকে নষ্ট হওয়া থেকে ঠেকায়।
আর শিল্প। তেল, চিনি, কাগজ, ওষুধ, বস্ত্র, সিমেন্ট, প্রতিটা কারখানাই আসলে একটা নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক প্রক্রিয়া, বড় মাপে চালানো। গবেষণাগারের এক বিকারে যে বিক্রিয়া ঘটে, কারখানায় সেটাই ঘটে হাজার গুণ বড় পাত্রে, আর সেই মাপ বদলানোটাই শিল্প রসায়নের কাজ।
নোট থেকে কাটাকার্ড উল্টে দেখো
রান্নাঘর আর দোকানের রসায়ন
জিনিসসাবান
ভেতরেচর্বি ও ক্ষারের বিক্রিয়ার ফসল। এক মাথা পানি টানে, আরেক মাথা তেল টানে।
জিনিসবেকিং সোডা
ভেতরেসোডিয়াম বাইকার্বোনেট। তাপে বা এসিডে CO₂ ছাড়ে বলেই কেক ফোলে।
জিনিসভিনেগার
ভেতরেলঘু অ্যাসিটিক এসিড। স্বাদের জন্য, আর খাদ্য সংরক্ষণের জন্যও।
জিনিসলবণ
ভেতরেNaCl, সোডিয়াম ও ক্লোরিনের যৌগ। শুধু স্বাদ নয়, খাদ্য সংরক্ষণের পুরোনো পদ্ধতিও।
ভেতরেকার্বনভিত্তিক পলিমার। হালকা ও টেকসই বলেই সুবিধা, আর পচে না বলেই সমস্যা।
জিনিসব্যাটারি
ভেতরেভেতরের রাসায়নিক বিক্রিয়াটাই বিদ্যুৎ তৈরি করছে। রাসায়নিক শক্তি থেকে তড়িৎ শক্তি।
জিনিসসার
ভেতরেগাছকে নাইট্রোজেন, ফসফরাস আর অন্যান্য মৌল ফিরিয়ে দেয়, যেগুলো ফসলের সঙ্গে মাটি থেকে চলে গিয়েছিল।
৩. এখন অন্য ধারটা
এতক্ষণ যা পড়লে তার পুরোটাই এক দিকের কথা। বইয়ের যুক্তিটা দু-ধারি, আর দ্বিতীয় ধারটা বাদ দিলে অধ্যায়টা অর্ধেক পড়া হয়। একই রসায়ন ভুলভাবে ব্যবহার করলে ক্ষতি করে, আর সেই ক্ষতির উদাহরণ খবরে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই থাকে।
মাছে ফরমালিন, কার্বাইড দিয়ে ফল পাকানো, মাত্রাছাড়া কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে, খোলা জায়গায় প্লাস্টিক পোড়ানো, আর সিসা-পারদ-আর্সেনিকের মতো ভারী ধাতুর দূষণ। তালিকাটা লম্বা করা যায়, কিন্তু লম্বা করার দরকার নেই, কারণ প্রতিটারই গল্পটা একই।
গল্পটা এই: পদার্থটা নিজে অপরাধী নয়। ফরমালিন গবেষণাগারে নমুনা সংরক্ষণে দরকারি জিনিস, মাছে অপরাধ। কীটনাশক ফসল বাঁচায়, আবার মাত্রা ছাড়ালে সেটাই বিষ। পার্থক্যটা পদার্থে নয়, পরিমাণে আর উদ্দেশ্যে।
ভাগ করোচিপ, তারপর বাক্স
একই বিজ্ঞান, দুই ধার
একটা চিপ ধরো, তারপর বাক্সে ছাড়ো।
ঠিক। পরেরটা।
এটা এখানে না। প্রশ্নটা পদার্থটা কী, তা নয়; প্রশ্নটা হলো কাজটা কার উপকারে।
খেয়াল করো, বাঁ দিকের কোনোটাই ডান দিকের চেয়ে “কম রসায়ন” নয়। রসায়ন নিজে ভালোও নয়, খারাপও নয়, ব্যবহারটাই ঠিক করে দেয়। আর ভেজাল ধরতে গেলেও রসায়নই জানতে হয়।
মিলিয়ে দেখোএকটা উত্তর বেছে নাও
কোন কথাটা সবচেয়ে সঠিক
রসায়ন পাঠের গুরুত্ব নিয়ে নিচের কোন কথাটা সবচেয়ে সঠিক?
তোমার শরীরের প্রতিটা অণুও রাসায়নিক পদার্থ, পানি আর লবণও। “রাসায়নিক” শব্দটা বিপদের সমার্থক নয়, আর এড়িয়ে চলার কোনো উপায়ও নেই।
এই নোটের ঘড়িটাই এর উত্তর। আটটা মুহূর্তের একটাতেও কেউ কারখানায় বা ল্যাবে ছিল না।
ঠিক। যুক্তিটা দু-ধারি: খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা আর শিক্ষা, পাঁচটাই রসায়ননির্ভর; আবার ভেজাল, অপরিশোধিত বর্জ্য বা মাত্রাছাড়া কীটনাশক ক্ষতি করে। পদার্থ নয়, ব্যবহারই ভালো-মন্দ ঠিক করে।
ওষুধ তালিকার একটা মাত্র নাম। কাগজ, সিমেন্ট, সার, সাবান, জ্বালানি, প্রতিটারই পেছনে রসায়ন।
৪. তাহলে কেন পড়তে হবে
উত্তরটা তিন স্তরে সাজানো যায়। নাগরিক হিসেবে: কোনটা নিরাপদ আর কোনটা নয়, সেটা বুঝতে হলে রসায়ন লাগে, কারণ ভেজাল ধরার জন্যও রসায়নই লাগে। পেশা হিসেবে: চিকিৎসা, কৃষি, প্রকৌশল, খাদ্য, পরিবেশ আর ওষুধশিল্পের প্রায় প্রতিটা কাজেই এটা ভিত্তি। আর নতুন সমস্যার মুখে: বিশুদ্ধ পানি, নবায়নযোগ্য শক্তি, কম দূষণের উপাদান, এই তিনটে সমস্যার সমাধান রসায়নের ভেতর দিয়েই আসতে হবে।
আর নতুন সমাধান আসে কোথা থেকে? একটা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে, যার নিজের ধাপ আছে। অধ্যায়ের পরের অংশটা ঠিক সেটাই নিয়ে।
মিলিয়ে দেখোএকটা উত্তর বেছে নাও
কেক ফোলে কেন
কেক বা রুটি ফোলানোর জন্য বেকিং সোডা ব্যবহার করা হয়। কারণ কী?
পানি শুষে নিলে খামির শুকিয়ে যেত, ফুলত না। ফোলার জন্য দরকার গ্যাস, আর গ্যাসটাই আসল কথা।
ঠিক। বেকিং সোডা হলো সোডিয়াম বাইকার্বোনেট। তাপ পেলে বা টক কিছুর সংস্পর্শে এলে এটি CO₂ ছাড়ে, আর সেই গ্যাসের বুদবুদ খামিরে আটকে গিয়েই ফুলে ওঠে। এটা একটা রাসায়নিক পরিবর্তন।
রং বদলালে ফোলার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক থাকত না। প্রশ্নটা আয়তন নিয়ে, রং নিয়ে নয়।
চর্বি গলে ঠিকই, কিন্তু সেটা তাপের কাজ, বেকিং সোডার নয়। আর গলা চর্বি খামিরকে ফোলায় না।
মিলিয়ে দেখোএকটা উত্তর বেছে নাও
কার্বাইডে পাকানো আম
একজন ব্যবসায়ী আম দ্রুত পাকাতে কার্বাইড ব্যবহার করলেন। এটা কেন সমস্যার, আর এ থেকে অধ্যায়ের কোন শিক্ষাটা পাওয়া যায়?
“প্রাকৃতিক” মানেই নিরাপদ নয়। সিসা, পারদ আর আর্সেনিকও প্রাকৃতিক, আর তিনটাই বিষ। প্রশ্নটা উৎস নিয়ে নয়, ব্যবহার নিয়ে।
খরচ এখানে প্রসঙ্গই নয়। সমস্যাটা স্বাস্থ্যের, আর শিক্ষাটাও দামের নয়, উদ্দেশ্যের।
ঠিক। খাদ্যে ব্যবহারের অনুমোদন না থাকা বাণিজ্যিক কার্বাইডে ক্ষতিকর অপদ্রব্য থাকে, আর এভাবে পাকানো ফল স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। অধ্যায়ের শিক্ষাটা এখানেই: রসায়ন নিজে ভালো-মন্দ নয়, ব্যবহারটাই ঠিক করে দেয়। আর ঠিক-ভুল আলাদা করতে হলেও রসায়ন জানতে হয়।
স্বাদ এখানে সবচেয়ে ছোট প্রশ্ন। আসল প্রশ্নটা স্বাস্থ্যের, আর “রসায়ন স্বাদ নষ্ট করে” কথাটা একটা ভুল সাধারণীকরণ।