বিজ্ঞানের শাখাগুলো আলাদা আলাদা বিষয় নয়। একই প্রকৃতিকে সবাই আলাদা প্রশ্ন করছে, এইটুকুই পার্থক্য। আর রসায়নের প্রশ্নটা, কী দিয়ে তৈরি আর কীভাবে বদলায়, প্রায় প্রতিটা শাখার ভেতরে একবার না একবার এসে পড়ে।
১. প্রতিবেশী নয়, নিচের স্তর
“সম্পর্ক আছে” কথাটা শুনতে ভালো এবং বোঝায় কম। বইয়ের দাবিটা এর চেয়ে শক্ত: রসায়ন অন্য বিজ্ঞানের পাশের ঘর নয়, নিচের তলা। জীববিজ্ঞানের প্রক্রিয়াগুলোই রাসায়নিক বিক্রিয়া। ভূবিজ্ঞানের শিলা ও খনিজই যৌগ। প্রকৌশলের প্রতিটা উপাদান কোনো না কোনো রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ফল।
সবচেয়ে পরিষ্কার উদাহরণটা জীববিজ্ঞান। দুটো বৃত্ত আঁকো, একটা জীববিজ্ঞানের আর একটা রসায়নের, আর দেখো মাঝখানের ঘরটায় কী কী পড়ে। বোতামগুলো চেপে দেখো।
ছেদবোতাম চাপো
মাঝখানের ঘরটায় কী আছে
কোষের গঠন, অঙ্গতন্ত্র, শ্রেণিবিন্যাস, বাস্তুতন্ত্র। এখানে “কী দিয়ে তৈরি” প্রশ্নটা এখনো ওঠেনি।
প্রাণরসায়ন। সালোকসংশ্লেষণ, শ্বসন, হজম, এনজাইমের কাজ, DNA আর RNA। জীবনের প্রতিটা প্রক্রিয়াই আসলে রাসায়নিক বিক্রিয়া। এই ঘরটাই দেখায় জীববিজ্ঞান আর রসায়ন আলাদা বিষয় নয়।
পর্যায় সারণি, রাসায়নিক বন্ধন, বিক্রিয়ার হার, আকরিক থেকে ধাতু নিষ্কাশন। প্রাণহীন পদার্থের রসায়ন।
তিনটে ঘর একসাথে। খেয়াল করো, মাঝখানের ঘরটা ছোট নয়। জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর অনেকগুলোই ওখানে পড়ে।
মিলিয়ে দেখোএকটা উত্তর বেছে নাও
মিলনস্থলের নাম
জীববিজ্ঞান ও রসায়নের মিলনস্থলে গড়ে ওঠা শাখাটির নাম কী?
ভৌত রসায়নও একটা সীমানার শাখা, কিন্তু সেটা পদার্থবিজ্ঞানের সীমানায়, জীববিজ্ঞানের নয়। নামটা মনে রাখার সহজ উপায়: সীমানার দুই পাশের নামই শাখার নামে থাকে।
ঠিক। জীবদেহের ভেতরের রাসায়নিক প্রক্রিয়া, সালোকসংশ্লেষণ থেকে এনজাইম আর DNA পর্যন্ত, নিয়ে কাজ করে প্রাণরসায়ন।
বিশ্লেষণী রসায়ন জীবদেহেও কাজে লাগে, যেমন রক্ত পরীক্ষায়। কিন্তু সেটা কোনো সীমানার শাখা নয়, বরং রসায়নের নিজের একটা কাজ: কী আছে আর কতটুকু আছে।
নিউক্লিয়ার রসায়নের বিষয় নিউক্লিয়াসের ভেতরের বিক্রিয়া। চিকিৎসায় তার ব্যবহার আছে, কিন্তু জীববিজ্ঞানের সঙ্গে মিলনস্থল সেটা নয়।
২. সম্পর্কটা দুমুখো
এখানে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী এক দিক শেখে আর অন্য দিকটা বাদ দিয়ে দেয়। রসায়ন পদার্থবিজ্ঞান থেকে যন্ত্র আর তত্ত্ব নেয়, এটা সবাই বলে। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের যন্ত্রগুলো যে উপাদান দিয়ে তৈরি, সিলিকন চিপ, তামার তার, চুম্বকীয় সংকর ধাতু, ব্যাটারির ভেতরের রাসায়নিক, সেগুলো রসায়নের দেওয়া। সম্পর্কটা লেনদেনের, একতরফা নয়।
নিচের জালটায় রসায়ন মাঝখানে আর সাতটা শাখা তার চারপাশে। যেকোনো একটায় ট্যাপ করো, আর দুটো বাক্য পাবে: রসায়ন ওটা থেকে কী পায়, আর ওটাকে কী দেয়।
জালযেকোনো শাখায় ট্যাপ করো
রসায়ন কার সাথে কীভাবে জড়িত
জীববিজ্ঞান।পায়: জীবনের প্রক্রিয়াগুলো, সালোকসংশ্লেষণ থেকে হজম, যেগুলো রাসায়নিক সমীকরণে লেখা যায়। দেয়: সেই প্রক্রিয়ার অণুগুলোর ব্যাখ্যা, প্রোটিন, এনজাইম, DNA। মিলনস্থল প্রাণরসায়ন।
গণিত।পায়: হিসাবের ভাষা, সমীকরণ সমতা করা থেকে মোল, শতকরা সংযুতি, গ্যাসের সূত্র আর বিক্রিয়ার হার। পরমাণুর মডেলটাই দাঁড়িয়ে আছে গাণিতিক সমীকরণের ওপর। দেয়: এমন বাস্তব সমস্যা, যার সমাধান করতে গিয়ে নতুন গাণিতিক পদ্ধতি তৈরি হয়।
ভূবিজ্ঞান।পায়: শিলা, খনিজ আর আকরিকের নমুনা, আর পৃথিবীর নিজের ইতিহাস। দেয়: সংযুতির বিশ্লেষণ, কোন আকরিকে কোন ধাতু কতটুকু আছে, আর কয়লা ও পেট্রোলিয়াম কীভাবে তৈরি হলো তার ব্যাখ্যা।
কৃষিবিজ্ঞান।পায়: মাঠের সমস্যা, মাটিতে কোন মৌলের ঘাটতি আর কোন পোকা ফসল নষ্ট করছে। দেয়: মাটি পরীক্ষা, সার, কীটনাশক, আর ফসল সংরক্ষণের রসায়ন।
চিকিৎসাবিজ্ঞান।পায়: রোগের প্রশ্নটা, দেহের কোন বিক্রিয়াটা ভুল পথে যাচ্ছে। দেয়: রোগ নির্ণয়ের রাসায়নিক পরীক্ষা, ওষুধ, জীবাণুনাশক, আর এক্স-রে ও রেডিওথেরাপির তেজস্ক্রিয় উৎস।
পরিবেশবিজ্ঞান।পায়: সমস্যার তালিকা, বায়ু ও পানিদূষণ, ওজোন ক্ষয়, গ্রিনহাউস প্রভাব। দেয়: কারণ আর প্রতিকার দুটোই; কোন দূষক কতটুকু আছে তা শনাক্ত করা আর পরিশোধনের উপায় বের করা রসায়নেরই কাজ।
পদার্থবিজ্ঞান।পায়: যন্ত্র আর তত্ত্ব, বর্ণালিবীক্ষণ থেকে X-ray আর কোয়ান্টাম বলবিদ্যা, যেগুলো দিয়ে পরমাণুর গঠন ব্যাখ্যা হয়। দেয়: উপাদান, সিলিকন চিপ, তামার তার, চুম্বকীয় সংকর ধাতু, ব্যাটারির রাসায়নিক। মিলনস্থল ভৌত রসায়ন।
সাতটাই দেখা হলো। খেয়াল করো, প্রতিটা তিরই দুদিকে যায়। রসায়ন কোনো শাখারই শুধু গ্রাহক নয়, আবার শুধু দাতাও নয়।
৩. সীমানায় দাঁড়ানো শাখাগুলোর নিজের নাম আছে
দুই শাখার সীমানা যেখানে যথেষ্ট চওড়া, সেখানে একটা আলাদা বিষয় জন্ম নেয় এবং তার নিজের নাম হয়। জীববিজ্ঞান আর রসায়নের সীমানায় প্রাণরসায়ন। পদার্থবিজ্ঞান আর রসায়নের সীমানায় ভৌত রসায়ন। পরিবেশবিজ্ঞান আর রসায়নের সীমানায় পরিবেশ রসায়ন। নামগুলো শুনলেই বোঝা যায় কোন দুই পাশ মিলেছে।
নিচের আটটা বাস্তব কাজ বা ঘটনায় ট্যাপ করে দেখো কোন দুই শাখা সেখানে একসাথে কাজ করছে।
মিলনস্থলট্যাপ করে দেখো কারা মিলেছে
দুই শাখার মিলনস্থল
জীববিজ্ঞান ও রসায়ন। সূর্যের আলোয় কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানি থেকে গ্লুকোজ তৈরি হয়। এটা একটা রাসায়নিক বিক্রিয়া, যা ঘটছে একটা জীবন্ত কোষে। মিলনস্থলের নাম প্রাণরসায়ন।
পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন। ব্যাটারির ভেতরে রাসায়নিক শক্তি বিদ্যুৎ শক্তিতে বদলে যাচ্ছে। এই সীমানার শাখাটার নাম তড়িৎ রসায়ন।
কৃষিবিজ্ঞান ও রসায়ন। মাটিতে কোন মৌলের ঘাটতি আছে, সেটা অনুমান করে বলা যায় না, বিশ্লেষণ করে বলতে হয়। কোন সার কতটুকু দিতে হবে তার উত্তর ওই বিশ্লেষণেই।
চিকিৎসাবিজ্ঞান ও রসায়ন। রক্তে কোন উপাদান কতটুকু আছে, সেটাই রোগের সূত্র। কাজটা বিশ্লেষণী রসায়নের, আর প্রশ্নটা চিকিৎসকের।
পরিবেশবিজ্ঞান ও রসায়ন। কোন গ্যাস ওজোন ভাঙছে আর কেন ভাঙছে, দুটোই রাসায়নিক প্রশ্ন। সমস্যাটা পরিবেশবিজ্ঞান দেখিয়েছে, কারণটা রসায়ন বের করেছে।
ভূবিজ্ঞান ও রসায়ন। খনিজটা কোথায় পাওয়া যাবে, সেটা ভূবিজ্ঞানের কথা। আকরিক থেকে ধাতুটা বের করে আনার উপায়টা রসায়নের।
পদার্থবিজ্ঞান, গণিত ও রসায়ন। এখানে তিনটে শাখা লাগে, দুটো নয়। কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ছাড়া পরমাণুর গঠনের ব্যাখ্যাটাই দাঁড়ায় না, আর কোয়ান্টাম বলবিদ্যা পুরোপুরি গাণিতিক।
জনস্বাস্থ্য ও রসায়ন। খাবারে কী মেশানো হয়েছে আর কতটুকু মেশানো হয়েছে, এটা বিশ্লেষণী রসায়নের সেই দুটো প্রশ্নই। ভেজাল ধরতে গেলেও রসায়ন জানতে হয়।
আটটাই দেখা হলো। খেয়াল করো, একটাতেও রসায়ন একা নেই, আবার একটাতেও রসায়ন অনুপস্থিত নয়।
মিলিয়ে দেখোএকটা উত্তর বেছে নাও
বাক্যটা কী বোঝাচ্ছে
“রসায়নের যন্ত্রপাতির নীতি পদার্থবিজ্ঞান থেকে আসে, আবার পদার্থবিজ্ঞানের যন্ত্র তৈরির উপাদান রসায়ন থেকে আসে”, এই বাক্যটি কী বোঝায়?
বাক্যটা কে বড় তা নিয়ে কিছুই বলছে না। বরং বলছে দুজনেই দুজনের ওপর নির্ভর করছে, আর সেটা বড়-ছোটর হিসাব নয়।
ঠিক। রসায়ন পদার্থবিজ্ঞান থেকে যন্ত্র আর তত্ত্ব নেয়, আর পদার্থবিজ্ঞানকে উপাদান দেয়। একেই বলে পরস্পরনির্ভরতা, আর এটাই বাক্যটার পুরো কথা।
যদি রসায়ন পদার্থবিজ্ঞানের ভেতরেই পড়ত, তাহলে দেওয়া-নেওয়ার প্রশ্নই উঠত না। বাক্যটায় দুটো আলাদা শাখার লেনদেনের কথা বলা হচ্ছে।
বাক্যটা ঠিক উল্টোটাই বলছে। এতে সম্পর্কের দুটো দিকই আলাদা করে লেখা আছে।
৪. তাই যে বিজ্ঞানই পড়ো
এই অংশটার আসল কাজ কোনো তালিকা মুখস্থ করানো নয়। কাজটা হলো একটা অভ্যাস তৈরি করা: যেকোনো বিষয়ে আটকে গেলে প্রশ্নটাকে রসায়নের দিকে ঘুরিয়ে দেখা। এটা কী দিয়ে তৈরি? আর কীভাবে বদলাচ্ছে? বহু ক্ষেত্রে ওখানেই উত্তরের সুতোটা ধরা পড়ে।
সেতুর ইস্পাতে লবণাক্ত বাতাসে মরিচা না ধরার সমস্যাটা প্রকৌশলীর, কিন্তু উত্তরটা রসায়নের: ক্রোমিয়াম আর নিকেল মিশিয়ে এমন সংকর ধাতু বানানো যাতে মরিচা ধরে না। ভার হিসাব করতে গণিত লাগবে ঠিকই, কিন্তু “মরিচা ধরবে না কেন” প্রশ্নটার মালিক রসায়ন।
মিলিয়ে দেখোএকটা উত্তর বেছে নাও
সেতুর ইস্পাত
একজন প্রকৌশলী সেতুর জন্য এমন ইস্পাত চান যাতে লবণাক্ত বাতাসেও মরিচা না ধরে। সমস্যাটা সমাধানে সরাসরি কোন বিজ্ঞানের সাহায্য লাগবে, আর কেন?
মরিচায় কোনো জীব জড়িত নেই। এটা লোহার সঙ্গে পানি ও বাতাসের অক্সিজেনের বিক্রিয়া, অর্থাৎ পুরোপুরি রাসায়নিক।
ঠিক। মরিচা লোহার সঙ্গে পানি ও অক্সিজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়া, আর সেটা ঠেকাতে ক্রোমিয়াম-নিকেল মিশিয়ে সংকর ধাতু বানানোও রাসায়নিক কাজ।
ভার হিসাব করতে গণিত অবশ্যই লাগবে, কিন্তু প্রশ্নটা ভার নিয়ে নয়, মরিচা নিয়ে। গণিত বলে দেবে সেতুটা ভাঙবে কি না, কিন্তু ইস্পাতটা ক্ষয়ে যাবে কি না তা নয়।
আকরিক কোথায় পাওয়া যাবে সেটা ভূবিজ্ঞানের প্রশ্ন। কিন্তু এখানে লোহা খুঁজে বের করার কথা হচ্ছে না, লোহাকে টিকিয়ে রাখার কথা হচ্ছে।