ছয়টি উপাদানের মধ্যে তিনটি ক্যালরি দেয়: শর্করা, আমিষ ও স্নেহ। বই তিনটিকে পরপর তিনটি উপ-অনুচ্ছেদে রেখেছে, আর তিনটিরই কাঠামো এক: গঠন, প্রকার, উৎস, কাজ, তারপর অভাব বা আধিক্যে কী হয়। একসঙ্গে পড়লে তুলনাটাই আসল শিক্ষা।
১. একই ওজন, আলাদা শক্তি
শুরুতেই সবচেয়ে কাজের সংখ্যাটা। শর্করা আর আমিষ প্রতি গ্রামে প্রায় ৪ কিলোক্যালরি দেয়, আর স্নেহ প্রায় ৯। অর্থাৎ সমান ওজনে স্নেহ থেকে শক্তি আসে দ্বিগুণেরও বেশি। নিচের তিনটি হাতল নাড়িয়ে দেখো।
স্তম্ভতিনটি স্লাইডার নাড়াও
গ্রাম থেকে কিলোক্যালরি
২. শর্করা
শর্করা গঠিত কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন দিয়ে, আর তাতে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন থাকে পানির মতোই দুই অনুপাত এক হারে। নামটাও সেখান থেকেই: কার্বন আর পানি, কার্বোহাইড্রেট।
শ্রেণিবিভাগটা স্বাদ দিয়ে নয়, এককের সংখ্যা দিয়ে। এক এককের চিনি মনোস্যাকারাইড, দুই এককের ডাইস্যাকারাইড, আর বহু এককের পলিস্যাকারাইড। সেজন্যই স্টার্চ আর সেলুলোজ মোটেও মিষ্টি না হয়েও শর্করা।
ভাগ করোনাম দেখে নয়, একক গুনে ভাগ করো
শর্করার তিন শ্রেণি
একটা চিপ ধরো, তারপর বিনে ছাড়ো। প্রশ্নটা মিষ্টি কি না তা নয়, কয়টা একক তা।
ঠিক। পরেরটা।
এখানে না। মনে রাখো, রক্তে আর আঙুরে যেটা, সেটা এক এককের; আর ভাত-আলুর স্টার্চ বহু এককের।
নয়টিই ঠিক। সূত্রটা সহজ: নামের শেষে সবারই ওজ, আর ভাগটা হয় একক গুনে। আর একটা জিনিস খেয়াল করো, সেলুলোজও শর্করা, কিন্তু মানুষ সেটা হজম করতে পারে না; সেটাই পরে আসা রাফেজ।
শর্করার কাজ একটাই আর সেটাই সবচেয়ে বড়: দেহের প্রধান ও সবচেয়ে দ্রুত ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি। বাড়তি শর্করা যকৃৎ ও পেশিতে গ্লাইকোজেন হিসেবে জমা হয়, আর তারও বেশি হলে স্নেহে রূপান্তরিত হয়ে জমে।
৩. আমিষ
আমিষের গঠনে কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের সঙ্গে যোগ হয় নাইট্রোজেন, আর বইয়ের হিসাবে আমিষে প্রায় ১৬ শতাংশ নাইট্রোজেন থাকে। এই নাইট্রোজেনই আমিষকে বাকি দুটি থেকে আলাদা করে। গঠনের একক অ্যামাইনো এসিড।
কিছু অ্যামাইনো এসিড দেহ নিজে বানাতে পারে না, খাবার থেকেই নিতে হয়; এদের বলা হয় অপরিহার্য। এখান থেকেই সম্পূরক আমিষের ধারণাটা আসে, আর সেটাই এই অনুচ্ছেদের সবচেয়ে সুন্দর জিনিস।
ছেদতিনটি বোতাম চেপে দেখো
ভাত ও ডাল মিলে সম্পূর্ণ আমিষ
ভাতে: প্রচুর শর্করা, আর কিছু আমিষও আছে। তবে ভাতের আমিষে একটি অপরিহার্য অ্যামাইনো এসিড কম পড়ে যায়, তাই শুধু ভাত খেলে দেহ যত আমিষ পায় তার পুরোটা কাজে লাগাতে পারে না।
ডালে: ভালো পরিমাণ আমিষ, আর ভাতে যেটি কম পড়ে সেটি এখানে যথেষ্ট। কিন্তু ডালের আমিষে আবার অন্য একটি অপরিহার্য অ্যামাইনো এসিড কম।
একসঙ্গে খেলে: ভাতের ঘাটতি ডাল পূরণ করে, আর ডালের ঘাটতি ভাত। দুটো মিলে যে আমিষ পাওয়া যায়, তা প্রায় প্রাণিজ আমিষের সমান কাজের। একেই বলে সম্পূরক আমিষ, আর এই কারণেই ভাত-ডাল হাজার বছর ধরে এই অঞ্চলের প্রধান খাবার।
কোন দুটি অ্যামাইনো এসিড, তাদের নাম এই নোটে লেখা হয়নি; বইয়ে নাম দুটি আছে কি না এখানে যাচাই করা যায়নি। যুক্তিটা নাম ছাড়াই দাঁড়ায়।
এখান থেকেই আমিষের দুটো ভাগ। প্রাণিজ আমিষ, যেমন মাছ, মাংস, ডিম ও দুধ, সাধারণত সব অপরিহার্য অ্যামাইনো এসিড ধরে রাখে, তাই তাকে সম্পূর্ণ আমিষ বলা যায়। উদ্ভিজ্জ আমিষে সাধারণত কিছু বাদ পড়ে। কিন্তু মিলিয়ে খেলে উদ্ভিজ্জ উৎস থেকেও সম্পূর্ণ আমিষ পাওয়া সম্ভব, আর এই কথাটা জরুরি, কারণ অনেক পরিবারে প্রতিদিন প্রাণিজ আমিষ সম্ভব হয় না।
আমিষের কাজ শক্তি দেওয়া নয়, অন্তত প্রথমে নয়। আসল কাজ নতুন কোষ ও কলা গঠন, ক্ষয়পূরণ, বৃদ্ধি, এনজাইম ও হরমোন তৈরি, আর রোগ প্রতিরোধের অ্যান্টিবডি তৈরি। শরীর আমিষ পোড়ায় তখনই, যখন শর্করা ফুরিয়ে যায়।
ঠিকানাখাবারে ট্যাপ করো
আমিষের ঠিকানা
প্রাণিজ, সম্পূর্ণ আমিষ। অপরিহার্য অ্যামাইনো এসিডগুলো প্রায় সবই আছে, তাই একে প্রায়ই আমিষের মানদণ্ড ধরা হয়। কুসুমে স্নেহ আর ভিটামিন A ও D-ও আছে।
প্রাণিজ, সম্পূর্ণ আমিষ। সঙ্গে অসম্পৃক্ত স্নেহ; এই কারণেই ইলিশ তেলতেলে। আর ছোট মাছ গোটা খেলে কাঁটা থেকে ক্যালসিয়ামও মেলে।
প্রাণিজ, সম্পূর্ণ আমিষ। একই সঙ্গে ল্যাকটোজ, স্নেহ, ক্যালসিয়াম ও পানি; একটি খাবারে পাঁচটি উপাদান।
উদ্ভিজ্জ, অসম্পূর্ণ আমিষ। একটি অপরিহার্য অ্যামাইনো এসিড কম পড়ে। ভাত বা রুটির সঙ্গে খেলে ঘাটতিটা পূরণ হয়ে যায়; এটাই সম্পূরক আমিষ।
উদ্ভিজ্জ, তবে ব্যতিক্রম। উদ্ভিজ্জ উৎস হয়েও এতে অপরিহার্য অ্যামাইনো এসিড প্রায় সবগুলোই আছে, তাই একে সম্পূর্ণ আমিষের কাছাকাছি ধরা হয়।
উদ্ভিজ্জ, অসম্পূর্ণ আমিষ। আমিষের সঙ্গে প্রচুর স্নেহও আছে, তাই বাদাম থেকে ক্যালরিও ভালোই আসে।
প্রধানত শর্করা। তবে এতে অল্প আমিষও আছে, যাতে একটি অপরিহার্য অ্যামাইনো এসিড কম। ডালের সঙ্গে মিলে এই ঘাটতি পূরণ হয়।
প্রাণিজ, সম্পূর্ণ আমিষ, আর ঘনীভূত। পানি সরিয়ে দেওয়ার কারণে একই ওজনে কাঁচা মাছের চেয়ে বেশি আমিষ। সংরক্ষণের পদ্ধতিটা দেখবে খাদ্য সংরক্ষণের অনুচ্ছেদে।
আটটিই দেখা হলো। মনে রেখো, সম্পূর্ণ আমিষ মানে দামি আমিষ নয়; মানে সব অপরিহার্য অ্যামাইনো এসিড একসঙ্গে আছে। অসম্পূর্ণ উৎসও মিলিয়ে খেলে সম্পূর্ণ হয়ে যায়।
সয়াবিনকে উদ্ভিজ্জদের ব্যতিক্রম বলার কথাটি সাধারণ পুষ্টিবিজ্ঞানের, এই বইয়ের নয়। আর সম্পূর্ণ ও অসম্পূর্ণ আমিষ কথাটি এখানে বোঝানোর সুবিধার্থে ব্যবহৃত।
৪. স্নেহ
বইয়ের ভাষায়, ফ্যাটি এসিড এবং গ্লিসারলের সমন্বয়ে স্নেহ পদার্থ গঠিত হয়। খাবারে প্রায় কুড়ি ধরনের ফ্যাটি এসিড পাওয়া যায়, আর তাদের গড়নই ঠিক করে দেয় জিনিসটা ঘরের তাপমাত্রায় কঠিন থাকবে না তরল।
দুই স্তরহাতলটা টেনে দেখো
কঠিন না তরল, কেন
পার্থক্যটা একটাই: শৃঙ্খলে দ্বিবন্ধন আছে কি নেই। দ্বিবন্ধন শৃঙ্খলটাকে বাঁকিয়ে দেয়, আর বাঁকা শৃঙ্খলগুলো পরস্পরের গায়ে ঘন হয়ে বসতে পারে না, তাই পদার্থটা তরল থাকে। সোজা শৃঙ্খল ঘন হয়ে বসে, তাই কঠিন। সম্পৃক্ত ফ্যাট বা চর্বি মেলে মাছ ও মাংসের চর্বিতে, ঘিয়ে, মাখনে; অসম্পৃক্ত ফ্যাট বা তেল মেলে সরিষা, সয়াবিন ও তিলে। রান্নাঘরেই পরীক্ষাটা করা যায়: শীতের সকালে নারকেল তেলের বোতলটা কেমন থাকে দেখো।
স্নেহের কাজ চারটি, আর শেষেরটাই সবচেয়ে কম জানা। প্রতি গ্রামে প্রায় ৯ কিলোক্যালরি, অর্থাৎ সর্বোচ্চ তাপশক্তি। ত্বকের সজীবতা বজায় রাখা। চর্মরোগ প্রতিরোধ। আর ভিটামিন A, D, E ও K শোষণে সাহায্য করা; খাবারে একেবারে তেল না থাকলে এই চারটি ভিটামিন ঠিকমতো শোষিতই হয় না।
অভাবে একজিমা, শুষ্ক ত্বক ও ওজন হ্রাস হতে পারে; আধিক্যে রক্ত সঞ্চালনে বাধা ও রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বাড়ে। দুটোই তথ্য, আর দুটোই অনুপাতের কথা।
মিলিয়ে দেখো
একটা প্রশ্ন
আমিষকে অন্য দুটি শক্তিদায়ক উপাদান থেকে আলাদা করে কোন মৌলটি?
কার্বন তিনটিতেই আছে, তাই এটি আলাদা করে না।
অক্সিজেনও তিনটিতেই আছে।
ঠিক। শর্করা ও স্নেহ দুটোই কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন দিয়ে গড়া। আমিষে এই তিনটির সঙ্গে যোগ হয় নাইট্রোজেন, আর বইয়ের হিসাবে আমিষে প্রায় ১৬% নাইট্রোজেন থাকে। এই নাইট্রোজেনই অ্যামাইনো এসিডের অ্যামাইনো অংশ।
হাইড্রোজেনও তিনটিতেই আছে; শর্করায় তো সেটি অক্সিজেনের সঙ্গে দুই অনুপাত এক হারে।
মিলিয়ে দেখো
আরেকটা প্রশ্ন
মধুতে প্রধানত কোন শর্করাটি থাকে?
গ্লুকোজের ঠিকানা আঙুর আর রক্ত।
ঠিক। ফ্রুকটোজ মধু ও পাকা ফলের প্রধান শর্করা, আর এটি একটি মনোস্যাকারাইড, মাত্র এক একক। গ্লুকোজ থাকে আঙুরে ও রক্তে, সুক্রোজ আখ ও গুড়ে, আর ল্যাকটোজ কেবল দুধে।
সুক্রোজ আখ, চিনি ও গুড়ের শর্করা, আর সেটি দুই এককের।
ল্যাকটোজ কেবল দুধে মেলে।
মিলিয়ে দেখো
শেষ প্রশ্ন
কারও খাবারে একেবারেই কোনো তেল বা চর্বি নেই। শর্করা ও আমিষ যথেষ্ট আছে, শাকসবজিও আছে। তবু কোন সমস্যাটি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে?
শর্করার শোষণ স্নেহের উপর নির্ভর করে না।
ঠিক। এই চারটি ভিটামিন স্নেহে দ্রবণীয়, অর্থাৎ এরা স্নেহ পদার্থে গুলে তবেই অন্ত্র থেকে রক্তে ঢোকে। খাবারে স্নেহ না থাকলে শাকসবজিতে ভিটামিন A থাকা সত্ত্বেও দেহ তার পুরোটা কাজে লাগাতে পারে না। এই কারণেই শাক রান্নায় সামান্য তেল দেওয়া হয়, স্বাদের জন্য যতটা, শোষণের জন্যও ততটা।
আমিষ থেকে শক্তি আসে স্নেহ ছাড়াই, প্রতি গ্রামে প্রায় ৪ kcal।
পানির ঘাটতির সঙ্গে স্নেহের সম্পর্ক নেই।
এক নজরে
শর্করা। কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন; তিন শ্রেণি মনো, ডাই ও পলি; প্রধান জ্বালানি, প্রায় ৪ kcal/g। বাড়তি অংশ গ্লাইকোজেন হয়ে জমে।
আমিষ। সঙ্গে নাইট্রোজেন, প্রায় ১৬%; একক অ্যামাইনো এসিড; কাজ গঠন, ক্ষয়পূরণ, এনজাইম, হরমোন ও অ্যান্টিবডি। ভাত-ডাল মিলে সম্পূরক আমিষ।
স্নেহ। ফ্যাটি এসিড ও গ্লিসারল; সম্পৃক্ত কঠিন, অসম্পৃক্ত তরল; প্রায় ৯ kcal/g; আর A, D, E ও K শোষণে সাহায্য করে।
শরীর বা খাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে পরিবারের বড় কারও সঙ্গে বা স্কুলের শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলো; প্রয়োজন হলে তাঁরা চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাবেন।
সূত্র: বিজ্ঞান, নবম-দশম শ্রেণি (এনসিটিবি), অধ্যায় ১ “উন্নততর জীবনধারা”, অনুচ্ছেদ ১.১.১ থেকে ১.১.৩। প্রতি গ্রামে শক্তির মান গোল করে নেওয়া এবং পুরো অধ্যায়ে এক রাখা হয়েছে।