বিজ্ঞান · নবম-দশম · অধ্যায় ১ · ১.১ খাদ্য ও পুষ্টি
খাদ্য ও পুষ্টি।
বইয়ের সংজ্ঞাটা এক বাক্যে চারটে কাজ গুঁজে দেয়: যেসব আহার্য বস্তু পুষ্টির দ্বারা জীবদেহের বৃদ্ধি, শক্তি উৎপাদন, রোগ প্রতিরোধ ও ক্ষয়পূরণ করে তাদের খাদ্য বলে। বৃদ্ধি, শক্তি, রোগ প্রতিরোধ, ক্ষয়পূরণ; এই চারটে কথা গোটা অধ্যায়ে বারবার ফিরে আসবে।
১. খাদ্য, পরিপোষক, পুষ্টি
তিনটে শব্দ কাছাকাছি শোনায়, কিন্তু এক নয়। খাদ্য হলো যা আমরা প্লেটে নিই, গোটা জিনিসটা। পরিপোষক হলো খাদ্যের সেই জৈব বা অজৈব উপাদান যা জীবের জীবনীশক্তির জোগান দেয়। ভাত একটা খাদ্য; ভাতের ভিতরের স্টার্চ একটা পরিপোষক। এক খাদ্যে একাধিক পরিপোষক থাকতে পারে, আর সাধারণত থাকেও।
আর পুষ্টি একটা ঘটনা নয়, একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া: খাদ্য গ্রহণ, পরিপাক, পরিশোষণ ও আত্তীকরণের মধ্য দিয়ে দেহের চাহিদা মেটানো। অর্থাৎ খাওয়া শেষ হলেই পুষ্টি শেষ হয় না; আসল কাজটা তখন শুরু।
ধাপে ধাপেপরের ধাপে যাও
খাবার থেকে পুষ্টি
গ্রহণ। মুখে খাবার নেওয়া, চিবানো আর গেলা। এখানেই লালারসের কাজ শুরু; ভাতের স্টার্চের কিছুটা মুখেই ভাঙতে শুরু করে, তাই ভাত বেশিক্ষণ চিবালে একটু মিষ্টি লাগে।
পরিপাক। বড় অণুগুলোকে এত ছোট করে ফেলা যে সেগুলো রক্তে ঢুকতে পারে। স্টার্চ ভেঙে গ্লুকোজ, আমিষ ভেঙে অ্যামাইনো এসিড, আর স্নেহ ভেঙে ফ্যাটি এসিড ও গ্লিসারল।
পরিশোষণ। ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রাচীর দিয়ে ছোট অণুগুলো রক্তে ঢোকে। খাবার এই ধাপেই প্রথমবার সত্যিকারের অর্থে শরীরের ভিতরে গেল।
আত্তীকরণ। রক্ত অণুগুলোকে কোষে পৌঁছে দেয়, আর কোষ সেগুলো দিয়ে শক্তি বানায় বা নিজের ক্ষয় পূরণ করে। এই ধাপটাই আসল পুষ্টি; বাকি সব তার প্রস্তুতি।
বর্জ্য নিষ্কাশন। যেটুকু হজম হলো না, যেমন শাকের আঁশ, বৃহদন্ত্র হয়ে বেরিয়ে যায়। এই অপাচ্য অংশটাই রাফেজ, যার কথা পরে আসবে।
ভাত চিবালে মিষ্টি লাগার কথাটি পরিপাক-অধ্যায়ের প্রস্তুতি; এখানে কেবল ধাপটা চেনানোর জন্য।
২. ছয় উপাদান, দুই ভাগ
খাদ্যের উপাদান ছয়টি: শর্করা, আমিষ, স্নেহ, ভিটামিন, খনিজ লবণ আর পানি। ছয়টাকে আলাদা আলাদা মুখস্থ করার দরকার নেই, কারণ একটা প্রশ্নেই ভাগটা বসে যায়: এটা কি ক্যালরি দেয়? শর্করা, আমিষ ও স্নেহ দেয়; ভিটামিন, খনিজ ও পানি দেয় না, অথচ ছাড়া চলে না।
রাফেজ বা আঁশ খাদ্যের অংশ, কিন্তু পরিপোষক নয়, তাই ছয়ের তালিকার বাইরে। বই তাকে আলাদা অনুচ্ছেদে রেখেছে, আর এই নোটের গাছেও সে আলাদা ডালে।
শাখাশাখায় ট্যাপ করে খোলো
খাদ্যের উপাদান
খাদ্যের উপাদান
শক্তি ও গঠনকারী ক্যালরি দেয়
শর্করা প্রধান জ্বালানি, ৪ kcal/g
আমিষ দেহ গঠন ও ক্ষয়পূরণ, ৪ kcal/g
স্নেহ সঞ্চিত শক্তি, আর A, D, E, K শোষণ, ৯ kcal/g
সহায়ক বা রক্ষণকারী ক্যালরি দেয় না
ভিটামিন রাসায়নিক কাজ চালু রাখে, রোগ প্রতিরোধ
খনিজ লবণ হাড়, রক্ত, স্নায়ু ও পেশি
পানি দ্রাবক, বাহক ও তাপনিয়ন্ত্রক; দেহের ৬০ থেকে ৭৫%
তালিকার বাইরে খাদ্যের অংশ, কিন্তু পরিপোষক নয়
রাফেজ বা আঁশ পুষ্টি দেয় না, কিন্তু হজম চালু রাখে
শক্তির হিসাবউপাদানে ট্যাপ করো
১ গ্রামে কত কিলোক্যালরি
প্রায় ৪ kcal প্রতি গ্রামে। দেহের সবচেয়ে সহজলভ্য জ্বালানি; কোষ প্রথমেই এটাকে পোড়ায়। দৈনিক মোট ক্যালরির সবচেয়ে বড় ভাগটা এখান থেকেই আসে।
প্রায় ৪ kcal প্রতি গ্রামে। শক্তি দেয় ঠিকই, কিন্তু সেটা আমিষের আসল কাজ নয়; আসল কাজ দেহ গড়া ও ক্ষয় পূরণ। শরীর আমিষ পোড়ায় তখনই, যখন শর্করা ফুরিয়ে যায়।
প্রায় ৯ kcal প্রতি গ্রামে। সমান ওজনে শর্করার প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি। তাই দেহ বাড়তি শক্তি স্নেহ হিসেবেই জমিয়ে রাখে; কম জায়গায় বেশি শক্তি ধরে।
০ kcal। এক কণাও শক্তি দেয় না। তবু ছাড়া চলে না, কারণ শরীরের রাসায়নিক কাজগুলো ভিটামিন ছাড়া চলে না। সামান্য পরিমাণেই কাজ হয়।
০ kcal। হাড় গড়া, রক্ত তৈরি, স্নায়ু ও পেশির কাজ, সবই খনিজের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু জ্বালানি হিসেবে এর কোনো ভূমিকা নেই।
০ kcal। দেহের ৬০ থেকে ৭৫ ভাগই পানি। দ্রাবক, বাহক আর তাপনিয়ন্ত্রক, তিন কাজেই পানি; কিন্তু শক্তি নয়।
০ kcal। হজমই হয় না, তাই শক্তির প্রশ্নই ওঠে না। তবু খাদ্যতালিকায় রাখা হয়, কারণ এটি খাবারকে নাড়িয়ে চলতে সাহায্য করে।
সাতটির মধ্যে মাত্র তিনটি শক্তি দেয়, আর তিনটির মধ্যে স্নেহ একাই বাকি দুটির দ্বিগুণেরও বেশি। বাকি চারটি এক কণাও শক্তি দেয় না, অথচ দেহের চারটি কাজের তিনটির জন্যই সেগুলো লাগে।
প্রতি গ্রামে শক্তির এই মানগুলো গোল করে নেওয়া, আর পুরো অধ্যায়ে একই মান ব্যবহার করা হয়েছে।
৩. খাদ্য মানেই শক্তি নয়
যদি খাদ্যের একমাত্র কাজ শক্তি দেওয়া হতো, তাহলে শুধু ভাত আর তেল খেলেই চলত। কিন্তু সংজ্ঞার চারটি কাজের মধ্যে তিনটির জন্য, অর্থাৎ বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ও ক্ষয়পূরণের জন্য, শক্তিহীন উপাদানগুলোই দরকার। সেজন্যই অপুষ্টি মানে শুধু কম খাওয়া নয়; দরকারের চেয়ে কম, বেশি, বা ভুল অনুপাতে পাওয়া, তিনটিই অপুষ্টি।
আর কোন খাবারে কী প্রধান, সেটা জানা থাকলে পাতের হিসাব সহজ হয়। ভাত, আলু ও গুড়ে প্রধান শর্করা; ডাল, মাছ, ডিম ও দুধে আমিষ; তেল ও ঘিয়ে স্নেহ; শাক ও ফলে ভিটামিন, খনিজ ও আঁশ। কিন্তু খেয়াল রেখো, প্রায় কোনো খাবারেই একটিমাত্র উপাদান থাকে না।
ভাগ করোচিপে ট্যাপ করে বিনে পাঠাও
পাতের হিসাব
একটা চিপ ধরো, তারপর বিনে ছাড়ো। প্রশ্নটা হলো, এই খাবারে প্রধান উপাদান কোনটি।
ঠিক। পরেরটা।
এখানে না। ভাবো, এই খাবারটা মূলত কী দেয়: জ্বালানি, গড়ার কাঁচামাল, জমানো শক্তি, না রক্ষার উপাদান?
সব ঠিক। এখন একটা কথা মনে রেখো: দুধকে আমিষের ঘরে ফেলা হয়েছে, কিন্তু দুধে আমিষ, স্নেহ, শর্করা, ক্যালসিয়াম আর পানি, পাঁচটাই আছে। প্রধান উপাদান মানে একমাত্র উপাদান নয়। এই কথাটা পুরো অধ্যায়ে কাজে লাগবে।
মিলিয়ে দেখো
একটা প্রশ্ন
খাদ্য ও পরিপোষকের পার্থক্য কোনটি সঠিকভাবে বোঝায়?
উল্টো। প্লেটে যা নেওয়া হয় সেটাই খাদ্য, আর তার ভিতরের কার্যকর উপাদানটি পরিপোষক।
ঠিক। খাদ্য হলো আমরা যা প্লেটে নিই, গোটা জিনিসটা। পরিপোষক হলো তার ভিতরের যে উপাদানটি সত্যিকারের কাজ করে। এক খাদ্যে একাধিক পরিপোষক থাকতে পারে; দুধে আমিষ, স্নেহ, শর্করা, ক্যালসিয়াম ও পানি, পাঁচটিই।
এক নয়, আর এই পার্থক্যটাই প্রশ্নে আসে। একটি গোটা জিনিস, আরেকটি তার ভিতরের উপাদান।
সংজ্ঞাযেসব আহার্য বস্তু পুষ্টির দ্বারা জীবদেহের বৃদ্ধি, শক্তি উৎপাদন, রোগ প্রতিরোধ ও ক্ষয়পূরণ করে, তাদের খাদ্য বলে।
শব্দপরিপোষক
সংজ্ঞাখাদ্যের যেসব জৈব বা অজৈব উপাদান জীবের জীবনীশক্তির জোগান দেয়। ভাত খাদ্য, ভাতের স্টার্চ পরিপোষক।
শব্দপুষ্টি
সংজ্ঞাখাদ্য গ্রহণ, পরিপাক, পরিশোষণ ও আত্তীকরণের মাধ্যমে দেহের চাহিদা মেটানোর সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া। এটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, একক ঘটনা নয়।
শব্দক্যালরি
সংজ্ঞাশক্তির একক। পুষ্টিবিজ্ঞানে হিসাব হয় কিলোক্যালরিতে; ১ kcal = ১০০০ ক্যালরি। খাবারের গায়ে ক্যালরি লেখা থাকলে প্রায় সবসময়ই kcal বোঝানো হয়।
শব্দঅপুষ্টি
সংজ্ঞাদরকারের চেয়ে কম, বেশি বা ভুল অনুপাতে পরিপোষক পাওয়া। তিনটিই অপুষ্টি, তাই শুধু বেশি খেলেই পুষ্টি নিশ্চিত হয় না।
শব্দসুষম খাদ্য
সংজ্ঞাযে খাদ্যতালিকায় ছয়টি উপাদানই দেহের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক অনুপাতে থাকে। বিস্তারিত হিসাব আসছে ১.৩ অনুচ্ছেদে।
মিলিয়ে দেখো
আরেকটা প্রশ্ন
৫০ গ্রাম স্নেহ ও ৫০ গ্রাম শর্করা থেকে মোট কত কিলোক্যালরি শক্তি পাওয়া যাবে?
৪০০ পাওয়া যেত যদি দুটোই ৪ kcal/g হতো। কিন্তু স্নেহ ৯।
৪৫০ হলো শুধু স্নেহের অংশ। শর্করার ২০০ যোগ করতে হবে।
ঠিক। স্নেহ ৫০ × ৯ = ৪৫০ kcal, শর্করা ৫০ × ৪ = ২০০ kcal, যোগ করলে ৬৫০ kcal। লক্ষ করো, সমান ওজন হলেও স্নেহ থেকে শক্তি এসেছে প্রায় আড়াই গুণ বেশি। এই কারণেই দেহ বাড়তি শক্তি স্নেহ হিসেবে জমায়, শর্করা হিসেবে নয়।
৯০০ পাওয়া যেত যদি দুটোই ৯ kcal/g হতো। শর্করা ৪।
মিলিয়ে দেখো
শেষ প্রশ্ন
একজন শিক্ষার্থী প্রতিদিন প্রচুর ভাত খায়, কিন্তু শাকসবজি, ফল, ডাল বা মাছ প্রায় খায় না। তার অবস্থাকে কী বলা হবে?
পরিমাণ যথেষ্ট হলেও অনুপাত ঠিক না হলে অপুষ্টি হয়। বইয়ের সংজ্ঞায় তিনটি রূপই ধরা আছে।
ঠিক। অপুষ্টি মানে শুধু কম খাওয়া নয়; দরকারের চেয়ে কম, বেশি বা ভুল অনুপাতে পরিপোষক পাওয়া, তিনটিই অপুষ্টি। এখানে শর্করা যথেষ্ট, কিন্তু আমিষ, ভিটামিন, খনিজ ও আঁশ অনুপস্থিত। পেট ভরলেও দেহের চারটি কাজের তিনটি, বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ও ক্ষয়পূরণ, অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে।
ওজন দিয়ে অপুষ্টি মাপা হয় না; মাপা হয় পরিপোষক পাওয়া যাচ্ছে কি না তা দিয়ে।
ভাতে প্রধানত শর্করা। ছয়টি উপাদান একসঙ্গে কোনো একটি খাবারে পাওয়া যায় না।
এক নজরে
খাদ্যের চার কাজ। বৃদ্ধি, শক্তি উৎপাদন, রোগ প্রতিরোধ, ক্ষয়পূরণ।
তিনটি শব্দ। খাদ্য প্লেটের গোটা জিনিস; পরিপোষক তার ভিতরের কার্যকর উপাদান; পুষ্টি গোটা প্রক্রিয়াটা।
পাঁচ ধাপ। গ্রহণ, পরিপাক, পরিশোষণ, আত্তীকরণ, বর্জ্য নিষ্কাশন।
ছয় উপাদান। শর্করা, আমিষ ও স্নেহ ক্যালরি দেয়; ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি দেয় না। রাফেজ তালিকার বাইরে।
অপুষ্টি। কম, বেশি বা ভুল অনুপাতে পাওয়া; তিনটিই।
শরীর বা খাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে পরিবারের বড় কারও সঙ্গে বা স্কুলের শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলো; প্রয়োজন হলে তাঁরা চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাবেন।
সূত্র: বিজ্ঞান, নবম-দশম শ্রেণি (এনসিটিবি), অধ্যায় ১ “উন্নততর জীবনধারা”, অনুচ্ছেদ ১.১ “খাদ্য ও পুষ্টি”। প্রতি গ্রামে শক্তির মান গোল করে নেওয়া এবং পুরো অধ্যায়ে এক রাখা হয়েছে।