একটা গাছের নাম এক জেলায় এক, আরেক জেলায় আরেক। একই নাম আবার দুটো আলাদা জীবকেও বোঝাতে পারে। দুজন গবেষক তখন বুঝতেই পারবেন না তাঁরা একই জীব নিয়ে কথা বলছেন কি না। সমাধান একটাই: প্রতিটি জীবের জন্য একটা করে আন্তর্জাতিক, অদ্বিতীয় নাম। সেই নামের পদ্ধতিটার নাম দ্বিপদ নামকরণ, আর তার নিয়মগুলোই এই নোট।
১. নামটা কী দিয়ে তৈরি
বইয়ের কথায়, একটি জীবের বৈজ্ঞানিক নাম দুটি অংশ বা পদ নিয়ে গঠিত হয়; প্রথম অংশটি তার গণের নাম এবং দ্বিতীয় অংশটি তার প্রজাতির নাম। এই দুই পদে নামকরণের পদ্ধতিকে বলে দ্বিপদ নামকরণ। প্রবর্তক ক্যারোলাস লিনিয়াস, ১৭৫৩ সালে Species Plantarum গ্রন্থে।
খেয়াল করো, এই দুটো পদ নতুন কিছু নয়। আগের নোটের সাতটা ধাপের শেষ দুটো ধাপই এরা। আমের নাম Mangifera indica; এখানে Mangifera তার গণ আর indica তার প্রজাতি। নাম মানে তাই ঠিকানার শেষ দুই লাইন।
২. নাম গড়ো
নিয়মগুলো পড়ে সবাই মাথা নাড়ে, তারপর খাতায় লেখার সময় ঠিক সেগুলোই ভাঙে। তাই নিয়ম পড়ার আগে একবার ভুল করে দেখা ভালো। নিচে একটা জীব বেছে নাও, তারপর দুটো শব্দ ও একটা ভঙ্গি বেছে নাম গড়ো। ভুল হলে ঠিক কোন নিয়মটা ভাঙল, সেটা বলে দেওয়া হবে।
নাম গড়োশব্দ ও ভঙ্গি বেছে নাও
নাম গড়ো
৩. সাতটি নিয়ম
এবার নিয়মগুলো এক জায়গায়। প্রতিটির সঙ্গে একটা ভুল উদাহরণও আছে, কারণ ভুলটা দেখলে নিয়মটা বেশি মনে থাকে।
নিয়মচিপে ট্যাপ করো
সাতটি নিয়ম
নিয়ম ১। নামকরণ ল্যাটিন ভাষায় হবে, অথবা ল্যাটিন ভাষায় রূপান্তরিত হবে। ল্যাটিন এখন কোনো জাতির কথ্য ভাষা নয়, তাই এটি বদলায় না আর কোনো দেশের পক্ষপাতও করে না।
নিয়ম ২। নামটি দুটি পদে গঠিত: প্রথম পদ গণের নাম, দ্বিতীয় পদ প্রজাতির নাম। ক্রম উল্টানো চলবে না। ঠিক: Homo sapiens। ভুল: sapiens Homo।
নিয়ম ৩। গণ নামের প্রথম অক্ষর বড় হাতের, প্রজাতি নামের প্রথম অক্ষর ছোট হাতের। ঠিক: Oryza sativa। ভুল: oryza Sativa।
নিয়ম ৪। ছাপার সময় নামটি ইটালিক হরফে লিখতে হয়। হাতে লেখার সময় গণ ও প্রজাতি নামের নিচে আলাদা আলাদা দাগ দিতে হয়, একটানা একটি দাগ নয়।
নিয়ম ৫। প্রতিটি জীবের বৈজ্ঞানিক নাম হবে অদ্বিতীয়; একই নাম দুটি ভিন্ন প্রজাতির জন্য ব্যবহার করা যাবে না। এ কারণেই নামটি সারা পৃথিবীতে একটিমাত্র জীবকে বোঝায়।
নিয়ম ৬। নামের শেষে নামকরণকারী বিজ্ঞানীর নাম সংক্ষেপে যোগ করা যায়। যেমন Homo sapiens L., যেখানে L. মানে লিনিয়াস।
নিয়ম ৭। একই জীবের একাধিক নাম প্রস্তাব করা হলে সবার আগে প্রকাশিত নামটিই গৃহীত হবে। একে বলে অগ্রাধিকার বা পূর্বস্বত্বের নিয়ম।
সাতটিই দেখা হলো। এর মধ্যে খাতায় নম্বর কাটা যায় মূলত দুটিতে: নিয়ম ৩ আর নিয়ম ৪। গণ বড়, প্রজাতি ছোট; ছাপায় বাঁকা, খাতায় দুই দাগ।
৪. ছাপায় আর খাতায়
নিয়ম ৪ নিয়েই সবচেয়ে বেশি ভুল হয়, কারণ ছাপার বইয়ে যা দেখা যায় খাতায় তা করা যায় না। হাতল টেনে দুটো চেহারা পাশাপাশি দেখো।
দুই ভঙ্গিহাতল টানো
দুই ভঙ্গি, এক নিয়ম
Mangiferaindica
ছাপার বইয়ে
Mangiferaindica
খাতায় হাতে
নিয়মটা একটাই: নামটিকে বাকি লেখা থেকে আলাদা করে দেখাতে হবে। ছাপার যন্ত্রে সেটা করা হয় হরফ কাত করে, আর খাতায় করা হয় দাগ দিয়ে। কিন্তু দাগ দুটি, একটি নয়, কারণ পদও দুটি।
৫. ঠিক না ভুল
নিচের আটটি নামের প্রতিটিতে ঠিক একটি করে নিয়ম হয় মানা হয়েছে নয় ভাঙা হয়েছে। ভুল বাক্সে ফেলার আগে ভেবে নাও কোন নিয়মটা।
ভাগ করোচিপ, তারপর বাক্স
ঠিক না ভুল
চারটি ঠিক, চারটি ভুল। প্রতিটি ভুল আলাদা একটি নিয়ম ভাঙে।
ঠিক। পরেরটা।
আবার দেখো: ক্রম ঠিক আছে? অক্ষর বড়-ছোট ঠিক আছে? ইটালিক বা দাগ ঠিক আছে?
আটটিই ঠিক। ভুল চারটি ছিল: homo sapiens-এ গণ ছোট হাতের (নিয়ম ৩), Mangifera Indica-তে প্রজাতি বড় হাতের (নিয়ম ৩), Tenualosa ilisha সোজা হরফে ও দাগহীন (নিয়ম ৪), আর ilisha Tenualosa-তে ক্রম উল্টো (নিয়ম ২)। Allium cepa-র নিচে একটানা একটি দাগ, অথচ দাগ হওয়ার কথা দুটি (নিয়ম ৪)।
৬. কে নিয়ম দেখে, আর কেন এত কড়াকড়ি
নামকরণের নিয়ম দেখভাল করে দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। উদ্ভিদের নামকরণ নিয়ন্ত্রণ করে ICBN, অর্থাৎ International Code of Botanical Nomenclature; আর প্রাণীর নামকরণ নিয়ন্ত্রণ করে ICZN, অর্থাৎ International Code of Zoological Nomenclature। মাঝের অক্ষরটাই মনে রাখার চাবি: B মানে Botanical, Z মানে Zoological।
কড়াকড়ির কারণটাও সোজা। নাম এক থাকলে ভাষা ও অঞ্চল বদলালেও জীবটি বদলায় না; প্রজাতিটি অদ্বিতীয়ভাবে শনাক্ত হয়; নামের প্রথম পদেই তার নিকট আত্মীয়দের খবর পাওয়া যায়; আর পৃথিবীর যেকোনো দুই গবেষক নিশ্চিত হতে পারেন যে তাঁরা একই জীব নিয়ে কথা বলছেন।
জীব
বৈজ্ঞানিক নাম
মানুষ
Homo sapiens
ইলিশ
Tenualosa ilisha
রুই
Labeo rohita
আম
Mangifera indica
কাঁঠাল
Artocarpus heterophyllus
ধান
Oryza sativa
আলু
Solanum tuberosum
বাঘ
Panthera tigris
কার্ডকার্ড উল্টাও
নাম মনে রাখো
জীবমানুষ
নামHomo sapiens · Homo মানে মানুষ, sapiens মানে জ্ঞানী।
জীবইলিশ
নামTenualosa ilisha · আমাদের জাতীয় মাছ।
জীবরুই
নামLabeo rohita · একই গণে কালিবাউশের মতো আত্মীয়রাও আছে।
জীবআম
নামMangifera indica · indica মানে ভারতীয়।
জীবকাঁঠাল
নামArtocarpus heterophyllus · heterophyllus মানে ভিন্ন ভিন্ন আকারের পাতাযুক্ত।
জীবধান
নামOryza sativa · sativa মানে চাষকৃত।
জীবআলু
নামSolanum tuberosum · tuberosum মানে কন্দযুক্ত।
জীববাঘ
নামPanthera tigris · গণ Panthera-তে সিংহ ও চিতাও আছে।
প্রজাতি পদের অর্থগুলো (indica মানে ভারতীয়, sativa মানে চাষকৃত, sapiens মানে জ্ঞানী) ল্যাটিন শব্দের সাধারণ অর্থ, বইয়ের বক্তব্য নয়; নাম মনে রাখার সহায়ক হিসেবে যোগ করা হয়েছে।
মিলিয়ে দেখো
একটা প্রশ্ন
দ্বিপদ নামকরণ পদ্ধতির প্রবর্তক কে এবং কোন গ্রন্থে?
অ্যারিস্টটল লিনিয়াসেরও প্রায় দুই হাজার বছর আগের; তিনি জীববিজ্ঞানের জনক।
ঠিক। লিনিয়াস ১৭৫৩ সালে Species Plantarum গ্রন্থে দ্বিপদ নামকরণ প্রবর্তন করেন, আর এই কারণেই তাঁকে শ্রেণিবিন্যাসের জনক বলা হয়। হুইটেকার পাঁচ রাজ্যের প্রবর্তক, ১৯৬৯ সালে।
হুইটেকার পাঁচ রাজ্যের প্রবর্তক, নামকরণের নয়।
থিওফ্রাস্টাস উদ্ভিদবিজ্ঞানের জনক, আর তিনিও লিনিয়াসের বহু আগের।
মিলিয়ে দেখো
আরেকটা প্রশ্ন
নিচের কোন বৈজ্ঞানিক নামটি সম্পূর্ণ নিয়ম মেনে লেখা হয়েছে?
গণ ছোট হাতের আর প্রজাতি বড় হাতের, ঠিক উল্টো; নিয়ম ৩ ভাঙা।
অক্ষর ঠিক আছে, কিন্তু ইটালিকও নেই দাগও নেই; নিয়ম ৪ ভাঙা।
ঠিক। গণ Oryza বড় হাতের অক্ষরে, প্রজাতি sativa ছোট হাতের অক্ষরে, আর পুরোটা ইটালিক হরফে; তিনটি নিয়মই মানা হয়েছে।
গণ ও প্রজাতির ক্রম উল্টো; নিয়ম ২ ভাঙা।
মিলিয়ে দেখো
শেষ প্রশ্ন
একজন শিক্ষার্থী খাতায় হাতে লিখল Tenualosa ilisha, দুই শব্দের নিচে একটানা একটি দাগ দিয়ে। এখানে কোন নিয়মটি ভাঙা হয়েছে?
ঠিক। ক্রম ঠিক, অক্ষরও ঠিক; ভুলটি দাগে। হাতে লেখার সময় গণ ও প্রজাতি নামের নিচে আলাদা আলাদা দাগ দিতে হয়, একটানা একটি দাগ নয়। দুটি পদ আলাদা, তাই দাগও আলাদা।
নামটি অদ্বিতীয়ই আছে; সমস্যা লেখার ভঙ্গিতে।
এক নজরে
নামের গঠন। প্রথম পদ গণ, দ্বিতীয় পদ প্রজাতি; দুটোই শ্রেণিবিন্যাসের শেষ দুই ধাপ।
প্রবর্তক। ক্যারোলাস লিনিয়াস, ১৭৫৩, Species Plantarum।
চার শর্ত। গণ বড় হাতের, প্রজাতি ছোট হাতের, ছাপায় ইটালিক, খাতায় দুটি আলাদা দাগ।