জীববিজ্ঞানের বিষয়বস্তু এত বড় যে একজন মানুষের পক্ষে পুরোটা পড়া অসম্ভব। তাই একে ভাগ করা হয়েছে, আর ভাগটা দুই রকম। বিষয় অনুযায়ী ভাগ করলে পাওয়া যায় উদ্ভিদবিজ্ঞান আর প্রাণিবিজ্ঞান; সেটা আগের নোটে দেখা হয়েছে। উদ্দেশ্য অনুযায়ী ভাগ করলে পাওয়া যায় ভৌত আর ফলিত। এই নোটে দ্বিতীয় ভাগটা, আর তার নিচে প্রায় তিরিশটা নাম।
১. ভাগ করার একটাই প্রশ্ন
নামগুলো মুখস্থ করার আগে ভাগ করার নিয়মটা বুঝে নাও, কারণ নিয়মটা জানলে নাম না জানা শাখাকেও ঠিক জায়গায় বসানো যায়। প্রশ্নটা একটাই। শাখাটি যদি জীবের নিজের কোনো বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে, সেটি ভৌত জীববিজ্ঞান। আর শাখাটি যদি সেই জ্ঞান খাটিয়ে মানুষের কোনো প্রয়োজন মেটায়, সেটি ফলিত জীববিজ্ঞান।
একটা জোড়া দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যায়। বংশগতিবিদ্যা বলে জিন কীভাবে কাজ করে, অর্থাৎ জীবের একটা বৈশিষ্ট্য; সেটা ভৌত। জিনপ্রযুক্তি সেই জিন বদলে রোগ-প্রতিরোধী ফসল বানায়; সেটা ফলিত। বিষয় এক, উদ্দেশ্য আলাদা।
২. গোটা গাছটা
নিচের গাছটায় দুটো ডাল। ডালে ট্যাপ করলে তার নিচের শাখাগুলো খুলবে, আর প্রতিটি নামের পাশে ইংরেজি নাম ও এক লাইনে তার কাজ লেখা আছে। একসঙ্গে দুটো ডাল খুলে রেখো না; একটা একটা করে দেখো, নইলে তিরিশটা নাম একসঙ্গে চোখে পড়ে সব গুলিয়ে যাবে।
গাছট্যাপ করে খোলো
শাখা-বৃক্ষ
জীববিজ্ঞান
ভৌত জীববিজ্ঞান জীব কী ও কীভাবে
অঙ্গসংস্থানবিদ্যা বাইরের গঠন ও আকৃতি
শারীরস্থানবিদ্যা ব্যবচ্ছেদে ভেতরের গঠন
কোষবিদ্যা কোষের গঠন, কাজ ও বিভাজন
কলাতত্ত্ব কলা বা টিস্যুর বিন্যাস
শারীরবিদ্যা অঙ্গের জৈব-রাসায়নিক কাজ
ভ্রূণবিদ্যা জাইগোট থেকে ভ্রূণের বিকাশ
বংশগতিবিদ্যা জিন ও বৈশিষ্ট্যের সঞ্চার
বিবর্তনবিদ্যা জীবের উদ্ভব ও ক্রমপরিবর্তন
শ্রেণিবিন্যাসবিদ্যা শনাক্তকরণ, নামকরণ ও বিন্যাস
বাস্তুবিদ্যা পরিবেশের সঙ্গে আন্তঃসম্পর্ক
এন্ডোক্রাইনোলজি হরমোন ও তার কাজ
জীবভূগোল অঞ্চলভেদে জীবের বিস্তার
ফলিত জীববিজ্ঞান এই জ্ঞান দিয়ে কী করা যায়
কৃষিবিজ্ঞান ফসল উৎপাদন ও জাত উন্নয়ন
মৎস্যবিজ্ঞান মাছের উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা
কীটতত্ত্ব কীটপতঙ্গ ও তাদের দমন
পরজীবীবিদ্যা পরজীবী ও তাদের রোগ
অণুজীববিজ্ঞান ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক
চিকিৎসাবিজ্ঞান রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা
প্রাণরসায়ন জীবদেহের রাসায়নিক প্রক্রিয়া
জীবাশ্মবিজ্ঞান প্রাগৈতিহাসিক জীব ও জীবাশ্ম
জীবপরিসংখ্যানবিদ্যা জীবতথ্যের পরিসংখ্যান
বনবিজ্ঞান বনসম্পদ রক্ষা ও ব্যবস্থাপনা
সামুদ্রিক জীববিজ্ঞান সমুদ্রের জীব
বন্যপ্রাণিবিদ্যা বন্য প্রাণী ও তাদের সংরক্ষণ
জিনপ্রযুক্তি জিন বদলে নতুন বৈশিষ্ট্য
জীবপ্রযুক্তি জীব ব্যবহার করে পণ্য ও সেবা
ঔষধবিদ্যা ওষুধ প্রস্তুত ও প্রযুক্তি
পরিবেশবিজ্ঞান পরিবেশ ও দূষণ
বায়োইনফরমেটিক্স কম্পিউটারে জীবতথ্য বিশ্লেষণ
কিছু বইয়ে অণুজীববিজ্ঞান ও পরিবেশবিজ্ঞানকে ভৌত তালিকায় রাখা হয়; পরীক্ষায় তোমার বইয়ের তালিকাই চূড়ান্ত।
৩. একই পাতা, দুই শাখার চোখ
শাখা জিনিসটা আসলে কী? আলাদা আলাদা প্রশ্নের নাম। একই আমপাতা নিয়ে দুটো শাখা বসলে তারা দুই রকম প্রশ্ন করে। অঙ্গসংস্থানবিদ্যা জিজ্ঞেস করে, বাইরে থেকে কেমন দেখায়। শারীরস্থানবিদ্যা পাতাটা কেটে জিজ্ঞেস করে, ভেতরে কী আছে। হাতল টেনে দুটো দৃষ্টি পাশাপাশি দেখো।
দুই চোখহাতল টানো
বাইরে থেকে, আর কেটে
অঙ্গসংস্থান
শারীরস্থান
একই বস্তু, শুধু প্রশ্নটা আলাদা: বাইরে থেকে কেমন দেখায়, না ভেতরে কী আছে। বাঁ দিকের ছবিতে পাতার আকার, বোঁটা, মধ্যশিরা ও শিরাবিন্যাস; ডান দিকের ছবিতে সেই পাতারই প্রস্থচ্ছেদ, যেখানে উপরের ত্বক, প্যালিসেড কলা, স্পঞ্জি কলা, পরিবহন কলাগুচ্ছ আর নিচের ত্বকে একটি পত্ররন্ধ্র দেখা যাচ্ছে। শাখা মানে আসলে আলাদা আলাদা প্রশ্ন।
৪. এবার নিজে ভাগ করো
প্রতিবার একটাই প্রশ্ন করো: এটা কি জীবের কোনো বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করছে, না মানুষের কোনো প্রয়োজন মেটাচ্ছে?
ভাগ করোচিপ, তারপর বাক্স
ভৌত না ফলিত
একটা চিপ ধরো, তারপর বাক্সে ছাড়ো। জিনপ্রযুক্তি আর বংশগতিবিদ্যা পাশাপাশি আছে; ওই জোড়াটাই আসল পরীক্ষা।
ঠিক। পরেরটা।
এখানে না। প্রশ্নটা আবার করো: জীবের বৈশিষ্ট্য, না মানুষের প্রয়োজন?
বারোটিই ঠিক। খেয়াল করো, ভৌত শাখাগুলো সবই বর্ণনা করে, আর ফলিত শাখাগুলো সবই কিছু একটা করে: মাছ ফলায়, পোকা দমন করে, জাত বানায়, রোগ সারায়। আর ফলিত শাখা কখনো একা দাঁড়াতে পারে না; মৎস্যবিজ্ঞান চালাতে গেলে মাছের শারীরবিদ্যা, ভ্রূণবিদ্যা ও বাস্তুবিদ্যা জানতেই হবে।
৫. ফলিত শাখা কোথায় কাজে লাগে
ফলিত শাখার নামগুলো শুকনো শোনায়, যতক্ষণ না দেখা যায় সেগুলো আসলে কোথায় খাটে। চিপে ট্যাপ করো, আর প্রতিটির পেছনে কোন ভৌত শাখা দাঁড়িয়ে আছে সেটাও খুঁজে বের করার চেষ্টা করো।
ফলিতচিপে ট্যাপ করো
কোথায় কাজে লাগে
মাছের উৎপাদন, কৃত্রিম প্রজনন ও মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা। পুকুরে রুই ও কাতলার কৃত্রিম প্রজনন, হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন, নদীতে ইলিশের প্রজনন মৌসুম নির্ধারণ, সবই এই শাখার কাজ। পেছনে দাঁড়িয়ে আছে শারীরবিদ্যা ও ভ্রূণবিদ্যা।
ফসলের উৎপাদন বাড়ানো, মাটির উর্বরতা রক্ষা, নতুন জাত উদ্ভাবন। লবণাক্ততা বা বন্যা সহ্য করতে পারে এমন ধানের জাত উদ্ভাবন এই শাখার সবচেয়ে বড় অবদান।
কীটপতঙ্গের জীবনচক্র, উপকার ও অপকার এবং দমন-পদ্ধতি। ফসলের পোকা দমন যেমন এর কাজ, মৌমাছি ও রেশম পোকার চাষও তাই।
ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকসহ অণুবীক্ষণিক জীব নিয়ে কাজ। রোগজীবাণু শনাক্তকরণ, দই ও পনির তৈরি, পানির বিশুদ্ধতা পরীক্ষা, সবখানে লাগে।
পরজীবী জীব, তাদের জীবনযাপন ও সৃষ্ট রোগ নিয়ে আলোচনা। ম্যালেরিয়ার পরজীবী বা কৃমির জীবনচক্র বোঝা গেলে তবেই প্রতিরোধের উপায় ঠিক করা যায়।
মানবদেহ, রোগ ও তার চিকিৎসা। রোগ নির্ণয়ের প্রতিটি পরীক্ষা কোনো না কোনো ভৌত শাখার জ্ঞানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেমন শারীরবিদ্যা বা প্রাণরসায়ন।
জীবদেহের ভেতরের রাসায়নিক বিক্রিয়া। রক্তে গ্লুকোজ বা কোলেস্টেরলের মাত্রা মাপা এই শাখার সরাসরি প্রয়োগ।
এক জীবের কাঙ্ক্ষিত জিন অন্য জীবে স্থানান্তর করে নতুন বৈশিষ্ট্য আনা। রোগ-প্রতিরোধী ফসল বা ইনসুলিন উৎপাদন এর উদাহরণ। খেয়াল করো, এর ভিত্তি ভৌত শাখা বংশগতিবিদ্যা।
বনসম্পদের সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও বনায়ন। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ রক্ষা বা উপকূলে বনায়নের পরিকল্পনা এই শাখার কাজ।
কম্পিউটার ব্যবহার করে বিপুল জীববৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ, যেমন জিনোমের ক্রম মেলানো বা ক্যান্সার গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ। জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে নতুন শাখাগুলোর একটি।
দশটিই দেখা হলো। প্রতিটির পেছনে অন্তত একটি ভৌত শাখা দাঁড়িয়ে আছে; ফলিত শাখা জ্ঞান তৈরি করে না, জ্ঞান খাটায়।
হ্যাচারির পোনা, লবণাক্ততা-সহিষ্ণু জাত ও সুন্দরবনের বনায়নের উদাহরণগুলো বইয়ের নয়; শাখাগুলো কোথায় কাজে লাগে তা বোঝাতে যোগ করা হয়েছে।
কার্ডকার্ড উল্টাও
ভৌত শাখা ঝালাই
শাখাঅঙ্গসংস্থানবিদ্যা
কাজবাইরের গঠন ও আকৃতির বর্ণনা। যেমন পাতার আকার ও শিরাবিন্যাস দেখে গাছ চেনা।
শাখাশারীরস্থানবিদ্যা
কাজব্যবচ্ছেদ করে ভেতরের গঠন জানা। যেমন কাণ্ডের প্রস্থচ্ছেদে পরিবহন কলাগুচ্ছ দেখা।
শাখাকোষবিদ্যা
কাজকোষের গঠন, কাজ ও বিভাজন। যেমন পেঁয়াজের মূলে মাইটোসিস পর্যবেক্ষণ।
শাখাকলাতত্ত্ব
কাজকলা বা টিস্যুর গঠন ও বিন্যাস। যেমন পাতার মেসোফিল কলার সাজ।
শাখাশারীরবিদ্যা
কাজঅঙ্গের জৈব-রাসায়নিক কাজ। যেমন সালোকসংশ্লেষণ ও শ্বসন কীভাবে ঘটে।
শাখাভ্রূণবিদ্যা
কাজজনন কোষ থেকে জাইগোট, আর জাইগোট থেকে ভ্রূণের বিকাশ।
শাখাবংশগতিবিদ্যা
কাজজিন ও বৈশিষ্ট্যের বংশানুক্রমিক সঞ্চার। যেমন বাবা-মায়ের রক্তের গ্রুপ থেকে সন্তানের সম্ভাব্য গ্রুপ।
শাখাবাস্তুবিদ্যা
কাজপরিবেশের সঙ্গে জীবের আন্তঃসম্পর্ক। যেমন একটি পুকুরের খাদ্যশৃঙ্খল।
মিলিয়ে দেখো
একটা প্রশ্ন
নিচের কোনটি ভৌত জীববিজ্ঞানের শাখা?
জিনপ্রযুক্তি জিন বদলে নতুন জাত বানায়; সেটা প্রয়োগ, তাই ফলিত।
মৎস্যবিজ্ঞান মাছ উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনার কাজ করে, তাই ফলিত।
ঠিক। কলাতত্ত্ব কলার গঠন ও বিন্যাস বর্ণনা করে; এটি জীবের নিজের বৈশিষ্ট্য নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা, তাই ভৌত। বাকি তিনটিই জীববৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে মানুষের প্রয়োজনে খাটায়, তাই ফলিত।
বায়োইনফরমেটিক্স তথ্য বিশ্লেষণ করে কাজে লাগায়, তাই ফলিত।
মিলিয়ে দেখো
আরেকটা প্রশ্ন
একজন গবেষক এক জাতের ধানের রোগ-প্রতিরোধী জিন অন্য একটি উচ্চফলনশীল জাতে স্থানান্তর করলেন। তিনি মূলত কোন শাখায় কাজ করছেন?
জিন কীভাবে বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে, সেটি বংশগতিবিদ্যার বিষয়; এখানে কাজটা জিন স্থানান্তরের।
ঠিক। জিন কীভাবে বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে, সেটি বংশগতিবিদ্যার বিষয়, আর সেটি ভৌত। কিন্তু সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে জিন স্থানান্তর করে নতুন জাত বানানো ফলিত শাখা জিনপ্রযুক্তির কাজ। দুটি শাখা একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু এক নয়।
অঙ্গসংস্থানবিদ্যা বাইরের আকৃতির বর্ণনা দেয়।
জীবভূগোল কোথায় কোন জীব ছড়িয়ে আছে তা নিয়ে কাজ করে।
মিলিয়ে দেখো
শেষ প্রশ্ন
সুন্দরবনের কোন অংশে কোন গাছ কত ঘনত্বে জন্মায় তা মানচিত্রে চিহ্নিত করা হলো। এটি প্রধানত কোন শাখার কাজ?
এন্ডোক্রাইনোলজি হরমোন ও তার কাজ নিয়ে।
ঠিক। জীবভূগোল ভৌগোলিক অঞ্চলভেদে জীবের বিস্তার ও অবস্থান নিয়ে কাজ করে: কোথায় কোন প্রজাতি আছে, কত ঘনত্বে।
ভ্রূণবিদ্যা ভ্রূণের বিকাশ নিয়ে।
প্রাণরসায়ন দেহের ভেতরের রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ে।
এক নজরে
দুই ভাগ। বিষয় অনুযায়ী উদ্ভিদ ও প্রাণিবিজ্ঞান; উদ্দেশ্য অনুযায়ী ভৌত ও ফলিত।
নিয়ম। জীবের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করলে ভৌত, মানুষের প্রয়োজন মেটালে ফলিত।
নির্ভরতা। ফলিত শাখা ভৌত শাখা ছাড়া চলতে পারে না; জ্ঞান আগে, প্রয়োগ পরে।
সেতু। এই শাখাগুলোর একটি, শ্রেণিবিন্যাসবিদ্যা, এতটাই মৌলিক যে বাকি সবই তার ওপর দাঁড়িয়ে; কোন জীব নিয়ে কথা বলছি তা আগে ঠিক না হলে কোনো গবেষণাই দাঁড়ায় না।