শব্দটা এসেছে গ্রিক থেকে। bios মানে জীবন, logos মানে জ্ঞান। দুটো জুড়ে দিলে যা দাঁড়ায়, তা-ই জীববিজ্ঞান: জীবন সম্পর্কিত জ্ঞান। কিন্তু জীবন জিনিসটা ঠিক কী, আর কোন লক্ষণ দেখে বোঝা যায় কিছু একটা জীবিত? এই নোটে সেটাই, আর সঙ্গে একটা প্রশ্ন যার উত্তর বাংলাদেশে বাস করা যেকোনো মানুষের কাজে লাগে: এই বিজ্ঞান পড়ে কী হয়।
১. সংজ্ঞাটা তিন টুকরোয়
বইয়ের সংজ্ঞাটি এই: বিজ্ঞানের যে শাখায় জীবের গঠন, জৈবনিক ক্রিয়া এবং জীবনধারণ সম্পর্কে সম্যক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান পাওয়া যায় তাকে জীববিজ্ঞান বলে। বাক্যটা লম্বা, কিন্তু ভেতরে তিনটে আলাদা জিনিস আছে। গঠন, অর্থাৎ জীবটা কী দিয়ে তৈরি ও কেমন করে সাজানো। জৈবনিক ক্রিয়া, অর্থাৎ তার ভেতরে কী কী ঘটে চলেছে। আর জীবনধারণ, অর্থাৎ সে কীভাবে বেঁচে থাকে, খায়, বাড়ে, বংশ রাখে।
এই তিনটে ভাগ মনে রাখলে পরের অনুচ্ছেদের শাখা-তালিকাও সহজ হয়ে যায়: প্রতিটি শাখা আসলে এই তিনটের কোনো একটাকে ধরে বসে আছে।
২. জীব না জড়
একটা পাথর আর একটা পিঁপড়ের মধ্যে পার্থক্য সবাই বোঝে, কিন্তু পার্থক্যটা লিখে বোঝানো কঠিন। বই তাই জীবনের কতগুলো লক্ষণের তালিকা দেয়। মজার ব্যাপার হলো, প্রায় প্রতিটি লক্ষণেরই একটা জড় নকলদার আছে। নিচের চিপগুলোয় ট্যাপ করে দেখো কোন লক্ষণটা কে নকল করতে পারে।
লক্ষণচিপে ট্যাপ করো
জীবনের লক্ষণ
প্রতিটি জীবদেহ এক বা একাধিক কোষ দিয়ে গড়া, আর প্রতিটি কোষে থাকে জীবন্ত প্রোটোপ্লাজম। এটিই একমাত্র লক্ষণ যার কোনো জড় বিকল্প নেই, তাই এটিই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য।
খাদ্য গ্রহণ করে শক্তিতে রূপান্তর করা। উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণে নিজেই খাদ্য বানায়, তাই স্বভোজী; প্রাণী অন্যের তৈরি খাদ্য নেয়, তাই পরভোজী।
খাদ্যকে ভেঙে শক্তি বের করা, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অক্সিজেন ব্যবহার করে। মোমবাতিও অক্সিজেন নিয়ে কার্বন ডাই অক্সাইড ছাড়ে, কিন্তু সেই শক্তিটা সে নিজের কোনো কাজে লাগায় না।
বিপাকের বর্জ্য, যেমন কার্বন ডাই অক্সাইড ও ইউরিয়া, দেহ থেকে বের করে দেওয়া। বর্জ্য জমতে থাকলে কোষ বিষাক্ত হয়ে পড়ে।
জীব ভেতর থেকে বাড়ে, নতুন কোষ তৈরি হয়ে। পাহাড়ের গায়ে স্ফটিকও বাড়ে, কিন্তু সেটা বাইরে থেকে পদার্থ জমে; ভেতরে নতুন কিছু তৈরি হয় না।
নিজের মতো নতুন জীব তৈরি করা। আগুন ছড়ায়, কিন্তু আগুন নতুন আগুনের জন্ম দেয় না; সে জ্বালানি পেলে কেবল বিস্তার পায়।
আলো, তাপ বা স্পর্শে প্রতিক্রিয়া দেখানো। লজ্জাবতীর পাতা ছুঁলে বুজে যায়, সূর্যমুখী আলোর দিকে ঘোরে।
পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া। মরুভূমির ক্যাকটাসের পাতা কাঁটা হয়ে গেছে পানি বাঁচাতে। প্রজন্মের পর প্রজন্মে এই পরিবর্তনই বিবর্তনের কাঁচামাল।
সব জীবেরই একদিন জৈবনিক ক্রিয়া থেমে যায়। জড়ের মৃত্যু নেই, কারণ তার জীবনই নেই। ভাঙা ঘড়ি মরে না, নষ্ট হয়।
নয়টিই দেখা হলো। খেয়াল করো, একটামাত্র লক্ষণ দেখে জীব চেনা যায় না; স্ফটিক বাড়ে, মোমবাতি অক্সিজেন নেয়, আগুন ছড়ায়। কেবল প্রোটোপ্লাজমসহ কোষটিই কোনো জড় বস্তু নকল করতে পারে না।
৩. পরিধিটা কত বড়
জীববিজ্ঞান মানে গাছ আর পশুপাখি, এই ধারণাটা খুব চেনা এবং খুব ছোট। এক ফোঁটা পুকুরের পানি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে রাখলে যা দেখা যায়, সেটাই পরিধির আসল মাপ।
এক ফোঁটানম্বরে ট্যাপ করো
এক ফোঁটা পুকুরের পানি
ব্যাকটেরিয়া। ছোট ছোট দণ্ড, খালি চোখে দেখাই যায় না। কোষে সুগঠিত নিউক্লিয়াস নেই, অর্থাৎ আদিকোষী। পরে দেখবে, এরা মনেরা রাজ্যের।
নীলাভ সবুজ শৈবাল। পুঁতির মালার মতো সারি। আদিকোষী হয়েও সালোকসংশ্লেষণ করে নিজের খাবার বানায়। তবু এরাও মনেরা, কারণ নিউক্লিয়াসের প্রশ্নটা আগে আসে।
অ্যামিবা। একটাই কোষ, কিন্তু নিউক্লিয়াস সুগঠিত। ছদ্মপদ বাড়িয়ে চলে আর খাবার গিলে নেয়। এরা প্রোটিস্টা রাজ্যের।
স্পাইরোগাইরা। সবুজ ফিতার মতো, ভেতরে প্যাঁচানো ক্লোরোপ্লাস্ট, তাই নিজেই খাদ্য তৈরি করে। কোষগুলো সারিবদ্ধ, তাই একে শৈবাল বলা হয়।
ছত্রাকের সুতো ও রেণু। সুতোর মতো হাইফা ছড়ায়, কোষপ্রাচীর কাইটিনের, আর খাবার শোষণ করে নেয়। এরা ফানজাই রাজ্যের।
এক ফোঁটা পানিতেই চারটি রাজ্যের প্রতিনিধি। জীববিজ্ঞানের পরিধি কতটা বড়, এটাই তার প্রমাণ। পাঁচটি রাজ্যের গল্প শুরু হবে ১.৩ অনুচ্ছেদে।
নস্টক, স্পাইরোগাইরা ও অ্যামিবা এই অনুচ্ছেদের উদাহরণ নয়; এগুলো সামনের ১.৩ অনুচ্ছেদের রাজ্য-উদাহরণ থেকে ধার করা, পরিধির মাপটা চোখে দেখানোর জন্য।
৪. দুই ভাগ, এক ভিত্তি
জীববিজ্ঞানের দুটি প্রধান ভাগ। উদ্ভিদবিজ্ঞান উদ্ভিদের গঠন, প্রকৃতি, বাসস্থান ও শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে কাজ করে; এর জনক থিওফ্রাস্টাস। প্রাণিবিজ্ঞান প্রাণীর গঠন, প্রকৃতি, শ্রেণিবিন্যাস ও জীবনচক্র নিয়ে; এর জনক অ্যারিস্টটল, যাঁকে জীববিজ্ঞানেরও জনক বলা হয়। কিন্তু দুটো ভাগ পুরোপুরি আলাদা নয়, আর সেটাই পরের অনুচ্ছেদের ভিত্তি।
ছেদঅংশ বেছে নাও
কোথায় আলাদা, কোথায় এক
সালোকসংশ্লেষণ, উদ্ভিদের কলা ও পরিবহন কলাগুচ্ছ, ফুল, ফল ও বীজের গঠন, শস্যের জাত উন্নয়ন। এই কাজগুলোর কোনোটিই প্রাণীর ক্ষেত্রে খাটে না। জনক থিওফ্রাস্টাস।
কোষবিদ্যা, বংশগতিবিদ্যা, বিবর্তনবিদ্যা, বাস্তুবিদ্যা ও শ্রেণিবিন্যাসবিদ্যা। কোষ, জিন আর পরিবেশের নিয়ম উদ্ভিদ ও প্রাণী দুইয়েরই এক, তাই এই শাখাগুলো ভাগ করা যায় না। পরের অনুচ্ছেদে এদেরই বলা হবে ভৌত জীববিজ্ঞান।
সংবহন, শ্বসন ও স্নায়ুতন্ত্র, চলন, প্রাণীর আচরণ, মৎস্যবিজ্ঞান ও কীটতত্ত্ব। জনক অ্যারিস্টটল, যাঁকে জীববিজ্ঞানেরও জনক বলা হয়।
৫. পড়ে কী হয়
প্রশ্নটা ন্যায্য, আর উত্তরটা তালিকা দিয়ে দেওয়ার চেয়ে একটা সমস্যা ধরে দেখানো ভালো। ধরা যাক একটা ধানক্ষেতে রোগ লেগেছে। সমাধানের পথটা চারটে ধাপে যায়, আর প্রতিটি ধাপ আলাদা একটা শাখার কাজ।
ধাপে ধাপেপরে বোতাম চাপো
একটা রোগ, চারটি শাখা
মাঠে কী দেখা যাচ্ছে। ধানের পাতায় বাদামি ছোপ, শিষ ভরছে না। প্রথম কাজ চোখে দেখা লক্ষণগুলো নিখুঁতভাবে লিপিবদ্ধ করা: ছোপের আকার, অবস্থান, কত দ্রুত ছড়াচ্ছে। এই কাজটা করে অঙ্গসংস্থানবিদ্যা।
দোষী কে। আক্রান্ত পাতার টুকরো অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখে বোঝা গেল কারণ একটি ছত্রাক। জীবাণুটি শনাক্ত না হলে ওষুধ বাছাই করা যায় না। এই কাজটা করে অণুজীববিজ্ঞান।
প্রতিরোধী জাত। যে ধানগাছগুলো আক্রান্ত হয়নি, তাদের মধ্যে প্রতিরোধের জিনটি খুঁজে বের করে ফলনশীল জাতে ঢোকানো হয়। এই কাজটা করে বংশগতিবিদ্যা ও জিনপ্রযুক্তি।
মাঠে ফেরত। নতুন জাত কৃষকের মাঠে পৌঁছানো, বীজ সরবরাহ, সঠিক সময়ে রোপণ। গবেষণা ফসলে পরিণত হয় এই ধাপে, আর এই কাজটা করে কৃষিবিজ্ঞান।
ধানের এই রোগটি বইয়ের কোনো নির্দিষ্ট উদাহরণ নয়; শাখাগুলো কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে তা দেখানোর জন্য সাজানো একটি দৃশ্যকল্প।
খাদ্য, চিকিৎসা ও পরিবেশ, এই তিন জায়গাতেই গল্পটা একই রকম। রোগজীবাণু শনাক্ত না করে টিকা বানানো যায় না; কোন প্রজাতি বিপন্ন তা না জেনে বন রক্ষা করা যায় না। আর এই কাজগুলোর প্রতিটির পেছনে আলাদা আলাদা শাখা আছে। সেই তালিকাটাই পরের অনুচ্ছেদ।
কার্ডকার্ড উল্টাও
শব্দ ও জনক
শব্দbios + logos
মানেগ্রিক bios মানে জীবন, logos মানে জ্ঞান। দুটি মিলে Biology, জীবন সম্পর্কিত জ্ঞান।
প্রশ্নজীববিজ্ঞানের জনক কে?
উত্তরঅ্যারিস্টটল। তিনি প্রাণিবিজ্ঞানেরও জনক।
প্রশ্নউদ্ভিদবিজ্ঞানের জনক কে?
উত্তরথিওফ্রাস্টাস।
প্রশ্নউদ্ভিদবিজ্ঞান কী পড়ে?
উত্তরউদ্ভিদের গঠন, প্রকৃতি, বাসস্থান, শ্রেণিবিন্যাস ও জীবনচক্র।
প্রশ্নপ্রাণিবিজ্ঞান কী পড়ে?
উত্তরপ্রাণীর গঠন, প্রকৃতি, শ্রেণিবিন্যাস, আচরণ ও জীবনচক্র।
প্রশ্নকোন লক্ষণটি জড় নকল করতে পারে না?
উত্তরপ্রোটোপ্লাজমযুক্ত কোষ দিয়ে গঠিত হওয়া।
মিলিয়ে দেখো
একটা প্রশ্ন
Biology শব্দের logos অংশটির অর্থ কী?
জীবন অর্থটি bios-এর, logos-এর নয়।
ঠিক। গ্রিক bios অর্থ জীবন আর logos অর্থ জ্ঞান। দুটি মিলেই Biology, অর্থাৎ জীবন সম্পর্কিত জ্ঞান।
গঠন সংজ্ঞার একটি অংশ, শব্দটির অর্থ নয়।
প্রকৃতি শব্দটি সংজ্ঞায় আসে, কিন্তু logos মানে জ্ঞান।
মিলিয়ে দেখো
আরেকটা প্রশ্ন
নিচের কোন লক্ষণটি জড় বস্তুতে কখনোই পাওয়া যায় না?
স্ফটিক বাইরে থেকে পদার্থ জমে বড় হয়; জীবের বৃদ্ধি ভেতর থেকে।
মোমবাতিও তা-ই করে, কিন্তু সে শক্তিটা কাজে লাগায় না।
ঠিক। স্ফটিক বাইরে থেকে পদার্থ জমে বড় হয়, মোমবাতি অক্সিজেন নিয়ে কার্বন ডাই অক্সাইড ছাড়ে, ধাতু তাপে বাঁকে; প্রতিটিই জীবনের কোনো না কোনো লক্ষণের নকল। কিন্তু জীবন্ত প্রোটোপ্লাজমসহ কোষ কেবল জীবেরই থাকে, তাই এটিই একমাত্র নিশ্চিত প্রমাণ।
এটি উদ্দীপনায় সাড়ার নকল, প্রাণের প্রমাণ নয়।
মিলিয়ে দেখো
শেষ প্রশ্ন
এক ফোঁটা পুকুরের পানিতে ব্যাকটেরিয়া, অ্যামিবা, স্পাইরোগাইরা ও মশার লার্ভা পাওয়া গেল। এই চারটির মধ্যে কোনটির কোষে সুগঠিত নিউক্লিয়াস নেই?
অ্যামিবা এককোষী, কিন্তু তার নিউক্লিয়াস সুগঠিত।
স্পাইরোগাইরার কোষে নিউক্লিয়াস ও ক্লোরোপ্লাস্ট দুটোই আছে।
ঠিক। ব্যাকটেরিয়া আদিকোষী; তার বংশগত বস্তু কোষের ভেতর ছড়ানো থাকে, নিউক্লিয়ার পর্দা দিয়ে ঘেরা নয়। বাকি তিনটিই সুগঠিত নিউক্লিয়াসযুক্ত। ১.৩ অনুচ্ছেদে দেখবে, ঠিক এই একটিমাত্র পার্থক্যেই ব্যাকটেরিয়া আলাদা একটি রাজ্যে পড়ে।
মশার লার্ভা বহুকোষী প্রাণী; প্রতিটি কোষেই সুগঠিত নিউক্লিয়াস।
এক নজরে
শব্দ। গ্রিক bios (জীবন) আর logos (জ্ঞান)।
সংজ্ঞা। জীবের গঠন, জৈবনিক ক্রিয়া ও জীবনধারণ সম্পর্কিত বিজ্ঞান।
লক্ষণ। নয়টি, আর তার মধ্যে কেবল প্রোটোপ্লাজমযুক্ত কোষটিই জড় নকল করতে পারে না।
দুই ভাগ। উদ্ভিদবিজ্ঞান (থিওফ্রাস্টাস) ও প্রাণিবিজ্ঞান (অ্যারিস্টটল), আর মাঝখানে দুইয়েরই সাধারণ শাখাগুলো।