চিরকুট। English

বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় · নবম-দশম · অধ্যায় ১ · পরিচ্ছেদ ১.৩ (২য় অংশ)

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও সত্তরের নির্বাচন।

আগের অংশে দেখেছি ছয় দফা ও আগরতলা মামলা পর্যন্ত। এবার দেখব সেই মামলাই কীভাবে উল্টো ফল দিল। চৌদ্দ মাসের ভিতরে একজন শাসক ক্ষমতা ছাড়লেন, আর তেইশ বছরের একটা আন্দোলন গিয়ে দাঁড়াল একটা ভোটের ফলাফলে।

১. এগারো দফা: ছয় দফা সবার হয়ে যায়

১৯৬৮ সাল নাগাদ আইয়ুব খানের এক দশকের শাসনের বিরুদ্ধে পূর্ব ও পশ্চিম, দুই অংশেই অসন্তোষ জমে ওঠে। পূর্ব পাকিস্তানে তার সঙ্গে যুক্ত হয় ছয় দফার দাবি আর আগরতলা মামলার বিরুদ্ধে ক্ষোভ। ১৯৬৯ সালের জানুয়ারির শুরুতে ছাত্র সংগঠনগুলো মিলে গঠন করে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, আর ঘোষণা করে এগারো দফা কর্মসূচি।

এগারো দফায় ছয় দফার দাবিগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ছাত্র, শ্রমিক ও কৃষকের নিজস্ব দাবি: শিক্ষার ব্যয় কমানো, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, কৃষিঋণ, রাজবন্দিদের মুক্তি আর আগরতলা মামলা প্রত্যাহার। এই সংযোজনটাই আসল কথা। এগারো দফা ছয় দফাকে একটি দলের কর্মসূচি থেকে গণআন্দোলনের কর্মসূচিতে পরিণত করে।

মাইলফলক তারিখে ট্যাপ করো

ঊনসত্তর থেকে সত্তর: চৌদ্দ মাস

এগারো দফা ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ছাত্র সংগঠনগুলো মিলে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে এবং এগারো দফা ঘোষণা করে। ছয় দফার সঙ্গে ছাত্র, শ্রমিক ও কৃষকের দাবি যুক্ত হওয়ায় আন্দোলনের পরিধি বেড়ে যায়।

২. চৌদ্দ মাসের ক্রম

ঘটনাগুলো এত দ্রুত ঘটে যে প্রবন্ধে পড়লে সব একসঙ্গে মিশে যায়, আর দুটো ভুল প্রায় সবাই করে। অনেকে ভাবে আইয়ুবের পদত্যাগের পরে মামলা প্রত্যাহার হয়েছিল, কিংবা সংবর্ধনা সভাটা আগে হয়েছিল। ক্রমটা নিজে সাজালে দুটো ভুলই একবারে ভাঙে।

ক্রম সময়ের ক্রমে ট্যাপ করো

ঊনসত্তরের ঘটনাক্রম সাজাও

জানুয়ারি ১৯৬৯ থেকে শুরু করো।

এই পুরো পর্বটার তাৎপর্য চারটি কথায় ধরা যায়। ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক ও কর্মচারী, সব শ্রেণি একসঙ্গে রাস্তায় নামে। ছয় দফা একটি দলের দাবি থেকে সর্বজনীন দাবিতে পরিণত হয়। আন্দোলনের একটি একক কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তৈরি হয়। আর প্রমাণিত হয় যে সংগঠিত জনমতের সামনে সামরিক সরকারকেও পিছু হটতে হয়।

মিলিয়ে দেখো

একটা প্রশ্ন

১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি কী ঘটেছিল?

৩. নির্বাচনের পথ

এখানে একটা পার্থক্য পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার, কারণ এটাই সবচেয়ে বেশি গুলিয়ে যায়। গণঅভ্যুত্থান একজন শাসককে সরাতে পেরেছিল, সামরিক শাসনকে নয়। আইয়ুব খান গেলেন, কিন্তু ইয়াহিয়া খান এসে আবার সামরিক আইন জারি করলেন।

তবু ইয়াহিয়া খান ১৯৬৯ সালের শেষ দিকে দুটো সিদ্ধান্ত নেন যা ছবিটা বদলে দেয়। প্রথমত, এক ইউনিট বাতিল করা হয়, ফলে পশ্চিমের প্রদেশগুলো আলাদা অস্তিত্ব ফিরে পায়। দ্বিতীয়ত, জাতীয় পরিষদের আসন বণ্টন হয় জনসংখ্যার ভিত্তিতে, অর্থাৎ ১৯৫৬-র সংবিধানের “সমান আসন” নীতি বাতিল হয়। এই দ্বিতীয় সিদ্ধান্তের ফলেই জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তান প্রথমবার সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায়।

নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে, ১২ নভেম্বর ১৯৭০-এ, উপকূলীয় পূর্ব পাকিস্তানে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে বিপুল প্রাণহানি ঘটে। কেন্দ্রীয় সরকারের ত্রাণ-তৎপরতার ধীরগতি নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়, যা নির্বাচনী পরিবেশকে প্রভাবিত করে। কয়েকটি আসনে ভোট পিছিয়ে যায়।

ভোট হয় ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০-এ, জাতীয় পরিষদের জন্য। এটি পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম সাধারণ নির্বাচন, যা ধর্ম, বর্ণ ও লিঙ্গ নির্বিশেষে সব প্রাপ্তবয়স্কের সরাসরি ভোটে অনুষ্ঠিত হয়, অর্থাৎ এক মানুষ এক ভোট। প্রাদেশিক পরিষদের ভোট হয় ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭০-এ, আর ঘূর্ণিঝড়-কবলিত কয়েকটি আসনে ভোট হয় ১৭ জানুয়ারি ১৯৭১-এ।

৪. ফলাফল: সংখ্যাটাই গল্প

জাতীয় পরিষদের মোট আসন ছিল ৩১৩, যার মধ্যে ৩০০টি সাধারণ আর ১৩টি সংরক্ষিত মহিলা আসন। মহিলা আসনগুলো সরাসরি ভোটে নয়, পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হতো, তাই নিচের ছকে “মোট” আর “মহিলাসহ মোট” দুটো আলাদা কলাম। সাধারণ ৩০০-র মধ্যে ১৬২টি ছিল পূর্ব পাকিস্তানে আর ১৩৮টি পশ্চিমে। ছকে ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সবাইকে আলাদা করে দেখানো হয়নি, তাই দলের ঘরগুলো যোগ করলে ৩০০ হবে না।

ছক যেকোনো ঘরে ট্যাপ করো

১৯৭০-এর ফলাফল

দলপূর্বপশ্চিমমোটমহিলাসহ
আওয়ামী লীগ১৬০০১৬০১৬৭
পাকিস্তান পিপলস পার্টি০৮১৮১৮৫
পিএমএল (কাইয়ুম)০৯৯১০
পিএমএল (কাউন্সিল)০৭৭৭
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম০৭৭৭
জমিয়তে উলামায়ে পাকিস্তান০৭৭৭
ন্যাপ (ওয়ালী)০৬৬৭
জামায়াতে ইসলামী০৪৪৪
পিএমএল (কনভেনশন)০২২২
মোট আসন১৬২১৩৮৩০০৩১৩
আওয়ামী লীগ পুরো প্রচারণা চালিয়েছিল ছয় দফাকে কেন্দ্র করে। তাই ফলটিকে ছয় দফার প্রতি জনসমর্থনের রায় হিসেবেই দেখা হয়।

সূত্র: ১৯৭০ সালের পাকিস্তান সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল। কিছু ছোট দলের সংখ্যা সূত্রভেদে সামান্য ভিন্ন।

ছকের সংখ্যাগুলো পড়া এক জিনিস, আর সেগুলো কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা দেখা আরেক জিনিস। নিচে ৩০০টি আসনের একটা খালি বার আছে, আর তার উপরে দাগ কাটা আছে ১৫১-তে, অর্থাৎ সরকার গঠনের সীমায়। দলের নামে ট্যাপ করে বারটা ভরাও।

অঙ্ক দলের নামে ট্যাপ করো

সংখ্যাগরিষ্ঠতার অঙ্ক

মিলিয়ে দেখো

আরেকটা প্রশ্ন

জাতীয় পরিষদের ৩০০টি সাধারণ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পায় ১৬০টি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম আসনের চেয়ে দলটি কতটি বেশি পেয়েছিল?

৫. ফলের তিনটি অর্থ

প্রথমত, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ৩০০টি সাধারণ আসনে সরকার গঠনের জন্য দরকার ছিল ১৫১টি, আর আওয়ামী লীগ একাই পেয়েছিল ১৬০টি, অর্থাৎ কোনো জোট ছাড়াই সরকার গঠনের অধিকার।

দ্বিতীয়ত, রায়টি ছিল ছয় দফার উপর গণভোটের মতো। আওয়ামী লীগ পুরো প্রচারণা চালিয়েছিল ছয় দফাকে কেন্দ্র করে, তাই ফলটিকে ছয় দফার প্রতি জনসমর্থনের রায় হিসেবেই দেখা হয়। আর তৃতীয়ত, ভৌগোলিক মেরুকরণ। দুই বৃহত্তম দলের কোনোটিই অন্য ডানায় একটিও আসন পায়নি, ফলে নির্বাচন দুই অংশের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতাকে সংখ্যায় দৃশ্যমান করে তোলে।

প্রাদেশিক পরিষদের ফলেও একই ছবি। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০টি সাধারণ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পায় ২৮৮টি, সঙ্গে ১০টি সংরক্ষিত মহিলা আসন। জাতীয় আর প্রাদেশিক ফল দুটো আলাদা, আর পরীক্ষায় এদের গুলিয়ে ফেলা খুব সাধারণ ভুল।

মিলিয়ে দেখো

শেষ প্রশ্ন

১৯৭০-এর নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে ১৬২টি এবং পশ্চিম পাকিস্তান ১৩৮টি সাধারণ আসন পায়। ১৯৫৬-র সংবিধানের তুলনায় এই পরিবর্তনের কারণ কী?

এক নজরে

এগারো দফা। জানুয়ারি ১৯৬৯, সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ছয় দফার সঙ্গে ছাত্র, শ্রমিক ও কৃষকের দাবি যুক্ত হয়।

চারটি মৃত্যু। আসাদ (২০ জানুয়ারি), মতিউর রহমান মল্লিক (২৪ জানুয়ারি), সার্জেন্ট জহুরুল হক (১৫ ফেব্রুয়ারি), ড. শামসুজ্জোহা (১৮ ফেব্রুয়ারি)।

ফল। ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ আগরতলা মামলা প্রত্যাহার, ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্সে সংবর্ধনা, ২৫ মার্চ আইয়ুবের পদত্যাগ ও ইয়াহিয়া খানের সামরিক আইন।

দুই সিদ্ধান্ত। ১৯৬৯-এর শেষ দিকে এক ইউনিট বাতিল, আর জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বণ্টন। এতেই জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তান প্রথমবার সংখ্যাগরিষ্ঠ।

নির্বাচন। ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ জাতীয় পরিষদ, ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদ, আর ঘূর্ণিঝড়-কবলিত কয়েকটি আসনে ১৭ জানুয়ারি ১৯৭১।

ফলাফল। জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ ১৬০ (মহিলা আসনসহ ১৬৭), পিপলস পার্টি ৮১ (৮৫)। প্রাদেশিক পরিষদে ৩০০-র মধ্যে ২৮৮। সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমা ১৫১।

১৯৭০-এর নির্বাচন প্রমাণ করে যে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া বাঙালি জাতীয়তাবাদ তেইশ বছরে একটি নির্বাচনী সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পরিণত হয়েছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়, সেটি পরের অধ্যায়ের বিষয়।

নোট থেকে কাটা কার্ডে ট্যাপ করে উল্টাও

নাম ও তারিখ

কীএগারো দফা
উত্তরসর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কর্মসূচি, জানুয়ারি ১৯৬৯। ছয় দফার সঙ্গে ছাত্র, শ্রমিক ও কৃষকের দাবি যুক্ত করে।
তারিখ২০ জানুয়ারি ১৯৬৯
উত্তরছাত্রনেতা আসাদ পুলিশের গুলিতে নিহত হন।
তারিখ২৪ জানুয়ারি ১৯৬৯
উত্তরমতিউর রহমান মল্লিক নিহত হন। দিনটি গণঅভ্যুত্থান দিবস।
কেড. মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা
উত্তররাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর; ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯-এ নিহত হন। আন্দোলনে নিহত প্রথম শিক্ষক।
তারিখ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯
উত্তরআগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার, আসামিদের মুক্তি।
তারিখ২৫ মার্চ ১৯৬৯
উত্তরআইয়ুব খানের পদত্যাগ; ইয়াহিয়া খানের ক্ষমতা গ্রহণ ও নতুন সামরিক আইন।
তারিখ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০
উত্তরজাতীয় পরিষদের নির্বাচন, পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন।
সংখ্যা২৮৮ / ৩০০
উত্তর১৭ ডিসেম্বর ১৯৭০-এর প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত আসন। জাতীয় পরিষদের ১৬০-র সঙ্গে গুলিয়ে ফেলো না।

সূত্র: বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, নবম-দশম শ্রেণি (এনসিটিবি), অধ্যায় ১, পরিচ্ছেদ ১.৩ “সামরিক শাসন ও পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ”, দ্বিতীয় অংশ।