বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় · নবম-দশম · অধ্যায় ১ · পরিচ্ছেদ ১.৩ (২য় অংশ)
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও সত্তরের নির্বাচন।
আগের অংশে দেখেছি ছয় দফা ও আগরতলা মামলা পর্যন্ত। এবার দেখব সেই মামলাই কীভাবে উল্টো ফল দিল। চৌদ্দ মাসের ভিতরে একজন শাসক ক্ষমতা ছাড়লেন, আর তেইশ বছরের একটা আন্দোলন গিয়ে দাঁড়াল একটা ভোটের ফলাফলে।
১. এগারো দফা: ছয় দফা সবার হয়ে যায়
১৯৬৮ সাল নাগাদ আইয়ুব খানের এক দশকের শাসনের বিরুদ্ধে পূর্ব ও পশ্চিম, দুই অংশেই অসন্তোষ জমে ওঠে। পূর্ব পাকিস্তানে তার সঙ্গে যুক্ত হয় ছয় দফার দাবি আর আগরতলা মামলার বিরুদ্ধে ক্ষোভ। ১৯৬৯ সালের জানুয়ারির শুরুতে ছাত্র সংগঠনগুলো মিলে গঠন করে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, আর ঘোষণা করে এগারো দফা কর্মসূচি।
এগারো দফায় ছয় দফার দাবিগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ছাত্র, শ্রমিক ও কৃষকের নিজস্ব দাবি: শিক্ষার ব্যয় কমানো, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, কৃষিঋণ, রাজবন্দিদের মুক্তি আর আগরতলা মামলা প্রত্যাহার। এই সংযোজনটাই আসল কথা। এগারো দফা ছয় দফাকে একটি দলের কর্মসূচি থেকে গণআন্দোলনের কর্মসূচিতে পরিণত করে।
মাইলফলকতারিখে ট্যাপ করো
ঊনসত্তর থেকে সত্তর: চৌদ্দ মাস
এগারো দফা ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ছাত্র সংগঠনগুলো মিলে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে এবং এগারো দফা ঘোষণা করে। ছয় দফার সঙ্গে ছাত্র, শ্রমিক ও কৃষকের দাবি যুক্ত হওয়ায় আন্দোলনের পরিধি বেড়ে যায়।
আসাদ নিহত হন। ছাত্রনেতা আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ঢাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তাঁর রক্তমাখা শার্ট আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
মতিউর রহমান মল্লিক নিহত হন। নবকুমার ইনস্টিটিউশনের নবম শ্রেণির ছাত্র। দিনটি বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান দিবস হিসেবে পালিত হয়।
সার্জেন্ট জহুরুল হক নিহত হন। আগরতলা মামলার অন্যতম আসামি, কুর্মিটোলা সেনানিবাসে বন্দি অবস্থায়। এরপর আন্দোলন আর নিয়ন্ত্রণে থাকেনি।
ড. মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা নিহত হন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, ছাত্রদের বাঁচাতে গিয়ে। আন্দোলনে নিহত প্রথম শিক্ষক।
আগরতলা মামলা প্রত্যাহার। চাপের মুখে সরকার মামলা প্রত্যাহার করে এবং শেখ মুজিবুর রহমানসহ আসামিরা মুক্তি পান। যে মামলা দিয়ে আন্দোলন থামানোর কথা ছিল, সেটিই আন্দোলনকে বাড়িয়ে দিল।
রেসকোর্স ময়দানে সংবর্ধনা। মুক্তির পরদিন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সংবর্ধনা সভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধি দেওয়া হয়।
আইয়ুব খানের পদত্যাগ। গোলটেবিল বৈঠক ব্যর্থ হলে আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন এবং সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা নিয়ে আবার সামরিক আইন জারি করেন।
জাতীয় পরিষদের নির্বাচন। পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম সাধারণ নির্বাচন, সব প্রাপ্তবয়স্কের সরাসরি ভোটে। এই নোটের বাকিটা এই একটা দিনের ফল নিয়ে।
২. চৌদ্দ মাসের ক্রম
ঘটনাগুলো এত দ্রুত ঘটে যে প্রবন্ধে পড়লে সব একসঙ্গে মিশে যায়, আর দুটো ভুল প্রায় সবাই করে। অনেকে ভাবে আইয়ুবের পদত্যাগের পরে মামলা প্রত্যাহার হয়েছিল, কিংবা সংবর্ধনা সভাটা আগে হয়েছিল। ক্রমটা নিজে সাজালে দুটো ভুলই একবারে ভাঙে।
ক্রমসময়ের ক্রমে ট্যাপ করো
ঊনসত্তরের ঘটনাক্রম সাজাও
জানুয়ারি ১৯৬৯ থেকে শুরু করো।
হ্যাঁ। এরপর কোনটা?
এখনো না। মনে রাখো, মামলা প্রত্যাহার শেষ ধাক্কা নয়।
ঠিক ক্রম: এগারো দফা (জানু) থেকে আসাদ (২০ জানু), মতিউর (২৪ জানু), জহুরুল হক (১৫ ফেব্রু), শামসুজ্জোহা (১৮ ফেব্রু), মামলা প্রত্যাহার (২২ ফেব্রু), সংবর্ধনা (২৩ ফেব্রু), আইয়ুবের পদত্যাগ (২৫ মার্চ)। খেয়াল করো, মামলা প্রত্যাহার শেষ ধাক্কা নয়, শুরুর দিকের ফল; পদত্যাগ আসে আরও এক মাস পরে।
এই পুরো পর্বটার তাৎপর্য চারটি কথায় ধরা যায়। ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক ও কর্মচারী, সব শ্রেণি একসঙ্গে রাস্তায় নামে। ছয় দফা একটি দলের দাবি থেকে সর্বজনীন দাবিতে পরিণত হয়। আন্দোলনের একটি একক কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তৈরি হয়। আর প্রমাণিত হয় যে সংগঠিত জনমতের সামনে সামরিক সরকারকেও পিছু হটতে হয়।
মিলিয়ে দেখো
একটা প্রশ্ন
১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি কী ঘটেছিল?
আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন আরও এক মাস পরে, ২৫ মার্চ ১৯৬৯-এ। মামলা প্রত্যাহার তার আগের ঘটনা।
ঠিক। গণঅভ্যুত্থানের চাপে সরকার ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯-এ আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে এবং আসামিরা মুক্তি পান।
সংবর্ধনা সভা হয় তার পরদিন, ২৩ ফেব্রুয়ারি। আগে মুক্তি, তারপর সংবর্ধনা।
নির্বাচন হয় প্রায় দুই বছর পরে, ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০-এ।
৩. নির্বাচনের পথ
এখানে একটা পার্থক্য পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার, কারণ এটাই সবচেয়ে বেশি গুলিয়ে যায়। গণঅভ্যুত্থান একজন শাসককে সরাতে পেরেছিল, সামরিক শাসনকে নয়। আইয়ুব খান গেলেন, কিন্তু ইয়াহিয়া খান এসে আবার সামরিক আইন জারি করলেন।
তবু ইয়াহিয়া খান ১৯৬৯ সালের শেষ দিকে দুটো সিদ্ধান্ত নেন যা ছবিটা বদলে দেয়। প্রথমত, এক ইউনিট বাতিল করা হয়, ফলে পশ্চিমের প্রদেশগুলো আলাদা অস্তিত্ব ফিরে পায়। দ্বিতীয়ত, জাতীয় পরিষদের আসন বণ্টন হয় জনসংখ্যার ভিত্তিতে, অর্থাৎ ১৯৫৬-র সংবিধানের “সমান আসন” নীতি বাতিল হয়। এই দ্বিতীয় সিদ্ধান্তের ফলেই জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তান প্রথমবার সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায়।
নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে, ১২ নভেম্বর ১৯৭০-এ, উপকূলীয় পূর্ব পাকিস্তানে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে বিপুল প্রাণহানি ঘটে। কেন্দ্রীয় সরকারের ত্রাণ-তৎপরতার ধীরগতি নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়, যা নির্বাচনী পরিবেশকে প্রভাবিত করে। কয়েকটি আসনে ভোট পিছিয়ে যায়।
ভোট হয় ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০-এ, জাতীয় পরিষদের জন্য। এটি পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম সাধারণ নির্বাচন, যা ধর্ম, বর্ণ ও লিঙ্গ নির্বিশেষে সব প্রাপ্তবয়স্কের সরাসরি ভোটে অনুষ্ঠিত হয়, অর্থাৎ এক মানুষ এক ভোট। প্রাদেশিক পরিষদের ভোট হয় ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭০-এ, আর ঘূর্ণিঝড়-কবলিত কয়েকটি আসনে ভোট হয় ১৭ জানুয়ারি ১৯৭১-এ।
৪. ফলাফল: সংখ্যাটাই গল্প
জাতীয় পরিষদের মোট আসন ছিল ৩১৩, যার মধ্যে ৩০০টি সাধারণ আর ১৩টি সংরক্ষিত মহিলা আসন। মহিলা আসনগুলো সরাসরি ভোটে নয়, পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হতো, তাই নিচের ছকে “মোট” আর “মহিলাসহ মোট” দুটো আলাদা কলাম। সাধারণ ৩০০-র মধ্যে ১৬২টি ছিল পূর্ব পাকিস্তানে আর ১৩৮টি পশ্চিমে। ছকে ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সবাইকে আলাদা করে দেখানো হয়নি, তাই দলের ঘরগুলো যোগ করলে ৩০০ হবে না।
ছকযেকোনো ঘরে ট্যাপ করো
১৯৭০-এর ফলাফল
দল
পূর্ব
পশ্চিম
মোট
মহিলাসহ
আওয়ামী লীগ
১৬০
০
১৬০
১৬৭
পাকিস্তান পিপলস পার্টি
০
৮১
৮১
৮৫
পিএমএল (কাইয়ুম)
০
৯
৯
১০
পিএমএল (কাউন্সিল)
০
৭
৭
৭
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম
০
৭
৭
৭
জমিয়তে উলামায়ে পাকিস্তান
০
৭
৭
৭
ন্যাপ (ওয়ালী)
০
৬
৬
৭
জামায়াতে ইসলামী
০
৪
৪
৪
পিএমএল (কনভেনশন)
০
২
২
২
মোট আসন
১৬২
১৩৮
৩০০
৩১৩
আওয়ামী লীগ পুরো প্রচারণা চালিয়েছিল ছয় দফাকে কেন্দ্র করে। তাই ফলটিকে ছয় দফার প্রতি জনসমর্থনের রায় হিসেবেই দেখা হয়।
পশ্চিম পাকিস্তানের বৃহত্তম দল, কিন্তু জাতীয় পরিষদে দ্বিতীয় স্থান।
পাকিস্তান মুসলিম লীগের একটি অংশ। দলটি তখন কয়েকটি ভাগে বিভক্ত ছিল, আর ছকের তিনটি সারিতেই সেই ভাগগুলো।
মুসলিম লীগের আরেকটি অংশ। তিনটি অংশ মিলে পেয়েছিল ১৮টি আসন, অর্থাৎ পিপলস পার্টির এক-চতুর্থাংশেরও কম।
পশ্চিম পাকিস্তানের একটি ধর্মভিত্তিক দল, সাতটি আসন।
পশ্চিম পাকিস্তানের আরেকটি ধর্মভিত্তিক দল, সাতটি আসন।
ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির একটি অংশ, ছয়টি আসন, সবগুলোই পশ্চিমে।
চারটি আসন, সবগুলোই পশ্চিম পাকিস্তানে।
মুসলিম লীগের যে অংশটি আইয়ুব খানের আমলে ক্ষমতায় ছিল, সেটি পেয়েছিল মাত্র দুটি আসন।
এই সারিটি কোনো দলের নয়, পুরো পরিষদের। ৩০০টি সাধারণ আসনের সঙ্গে ১৩টি সংরক্ষিত মহিলা আসন যোগ করলে ৩১৩।
পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টি সাধারণ আসনের মধ্যে ১৬০টি আওয়ামী লীগ পায়। অর্থাৎ নিজের ডানায় প্রায় কিছুই বাকি রাখেনি।
আওয়ামী লীগ পশ্চিম পাকিস্তানে একটিও আসন পায়নি। একইভাবে পিপলস পার্টি পূর্বে একটিও পায়নি। দুই বৃহত্তম দলের কেউই অন্য ডানায় নেই, আর এটাই ফলাফলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
৩০০টি সাধারণ আসনে সরকার গঠনের জন্য দরকার ছিল ১৫১টি। আওয়ামী লীগ একাই পেয়েছিল ১৬০টি, অর্থাৎ কোনো জোট ছাড়াই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা।
সাতটি সংরক্ষিত মহিলা আসন যোগ হয়ে ১৬৭। মহিলা আসনগুলো সরাসরি ভোটে নয়, পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হতো, তাই ১৬০ আর ১৬৭ দুটোই ঠিক, প্রশ্নে কোনটা চাওয়া হয়েছে সেটাই দেখার।
পিপলস পার্টি পূর্ব পাকিস্তানে একটিও আসন পায়নি। দুটো শূন্য পাশাপাশি রাখলে ফলাফলের আসল চেহারাটা দেখা যায়।
পশ্চিম পাকিস্তানের ১৩৮টি আসনের মধ্যে ৮১টি, অর্থাৎ সেখানে স্পষ্ট বৃহত্তম দল।
পশ্চিম পাকিস্তানের বৃহত্তম দল ছিল পাকিস্তান পিপলস পার্টি, ৮১টি সাধারণ আসন। কিন্তু জাতীয় পরিষদে সেটি দ্বিতীয় স্থান, আর ১৫১-র অনেক নিচে।
চারটি সংরক্ষিত মহিলা আসন যোগ হয়ে ৮৫।
এক ইউনিট বাতিল ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বণ্টনের ফলে পূর্ব পাকিস্তান প্রথমবার জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায়, ১৬২টি। ১৯৫৬-র সংবিধানে ভাগটা ছিল সমান, ১৫০ আর ১৫০।
পশ্চিম পাকিস্তানের ১৩৮টি আসন। এক ইউনিট বাতিল হওয়ায় এই আসনগুলো এখন চারটি আলাদা প্রদেশের।
সাধারণ আসন ৩০০, আর সরকার গঠনের জন্য দরকার এর অর্ধেকের বেশি, অর্থাৎ ১৫১।
৩০০ সাধারণ আসনের সঙ্গে ১৩টি সংরক্ষিত মহিলা আসন যোগ করে ৩১৩। মহিলা আসনের মধ্যে ৭টি পূর্ব পাকিস্তানের, ৬টি পশ্চিমের।
সূত্র: ১৯৭০ সালের পাকিস্তান সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল। কিছু ছোট দলের সংখ্যা সূত্রভেদে সামান্য ভিন্ন।
ছকের সংখ্যাগুলো পড়া এক জিনিস, আর সেগুলো কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা দেখা আরেক জিনিস। নিচে ৩০০টি আসনের একটা খালি বার আছে, আর তার উপরে দাগ কাটা আছে ১৫১-তে, অর্থাৎ সরকার গঠনের সীমায়। দলের নামে ট্যাপ করে বারটা ভরাও।
অঙ্কদলের নামে ট্যাপ করো
সংখ্যাগরিষ্ঠতার অঙ্ক
মিলিয়ে দেখো
আরেকটা প্রশ্ন
জাতীয় পরিষদের ৩০০টি সাধারণ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পায় ১৬০টি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম আসনের চেয়ে দলটি কতটি বেশি পেয়েছিল?
ন্যূনতম সংখ্যাটা ১৫৫ নয়। ৩০০-র অর্ধেকের বেশি মানে ১৫১।
ঠিক। ৩০০টি আসনের অর্ধেকের বেশি, অর্থাৎ ১৫১টি দরকার ছিল। ১৬০ থেকে ১৫১ বাদ দিলে ৯। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ কোনো জোট ছাড়াই, ৯টি আসন বেশি নিয়ে সরকার গঠনের অবস্থানে ছিল।
১৬০ থেকে ১৫০ বাদ দিলে ১০ হয়, ১৯ নয়। আর ন্যূনতম ১৫০ নয়, ১৫১, কারণ অর্ধেক হলেই হয় না, অর্ধেকের বেশি লাগে।
এই সংখ্যাটা কোনো হিসাবেই আসে না। ১৬০ − ১৫১ = ৯।
৫. ফলের তিনটি অর্থ
প্রথমত, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ৩০০টি সাধারণ আসনে সরকার গঠনের জন্য দরকার ছিল ১৫১টি, আর আওয়ামী লীগ একাই পেয়েছিল ১৬০টি, অর্থাৎ কোনো জোট ছাড়াই সরকার গঠনের অধিকার।
দ্বিতীয়ত, রায়টি ছিল ছয় দফার উপর গণভোটের মতো। আওয়ামী লীগ পুরো প্রচারণা চালিয়েছিল ছয় দফাকে কেন্দ্র করে, তাই ফলটিকে ছয় দফার প্রতি জনসমর্থনের রায় হিসেবেই দেখা হয়। আর তৃতীয়ত, ভৌগোলিক মেরুকরণ। দুই বৃহত্তম দলের কোনোটিই অন্য ডানায় একটিও আসন পায়নি, ফলে নির্বাচন দুই অংশের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতাকে সংখ্যায় দৃশ্যমান করে তোলে।
প্রাদেশিক পরিষদের ফলেও একই ছবি। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০টি সাধারণ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পায় ২৮৮টি, সঙ্গে ১০টি সংরক্ষিত মহিলা আসন। জাতীয় আর প্রাদেশিক ফল দুটো আলাদা, আর পরীক্ষায় এদের গুলিয়ে ফেলা খুব সাধারণ ভুল।
মিলিয়ে দেখো
শেষ প্রশ্ন
১৯৭০-এর নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে ১৬২টি এবং পশ্চিম পাকিস্তান ১৩৮টি সাধারণ আসন পায়। ১৯৫৬-র সংবিধানের তুলনায় এই পরিবর্তনের কারণ কী?
আয়তনে পূর্ব পাকিস্তান বরাবরই ছোট ছিল, আর আয়তন কখনো বাড়েনি। আসন বণ্টনের ভিত্তি ছিল জনসংখ্যা, আয়তন নয়।
ঠিক। ১৯৫৬-র সংবিধানে জাতীয় পরিষদের ৩০০ আসন দুই অংশে সমান ভাগ করা ছিল, ১৫০ আর ১৫০, যা জনসংখ্যার অনুপাতের সঙ্গে মিলত না। নির্বাচনের আগে এক ইউনিট বাতিল করে জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বণ্টন করা হয়, ফলে পূর্ব পাকিস্তান ১৬২টি আসন পায়।
মহিলা আসন ছিল ১৩টি, আর সেগুলো সাধারণ ৩০০-র বাইরে। ওই সংখ্যা বদলালে ১৬২ আর ১৩৮-এর ভাগ বদলাত না।
পশ্চিমের দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল; পিপলস পার্টি সেখানে ৮১টি আসন পায়। আর আসন বণ্টন ভোটের আগেই ঠিক হয়েছিল।
এক নজরে
এগারো দফা। জানুয়ারি ১৯৬৯, সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ছয় দফার সঙ্গে ছাত্র, শ্রমিক ও কৃষকের দাবি যুক্ত হয়।
চারটি মৃত্যু। আসাদ (২০ জানুয়ারি), মতিউর রহমান মল্লিক (২৪ জানুয়ারি), সার্জেন্ট জহুরুল হক (১৫ ফেব্রুয়ারি), ড. শামসুজ্জোহা (১৮ ফেব্রুয়ারি)।
ফল। ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ আগরতলা মামলা প্রত্যাহার, ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্সে সংবর্ধনা, ২৫ মার্চ আইয়ুবের পদত্যাগ ও ইয়াহিয়া খানের সামরিক আইন।
দুই সিদ্ধান্ত। ১৯৬৯-এর শেষ দিকে এক ইউনিট বাতিল, আর জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বণ্টন। এতেই জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তান প্রথমবার সংখ্যাগরিষ্ঠ।
নির্বাচন। ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ জাতীয় পরিষদ, ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদ, আর ঘূর্ণিঝড়-কবলিত কয়েকটি আসনে ১৭ জানুয়ারি ১৯৭১।
ফলাফল। জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ ১৬০ (মহিলা আসনসহ ১৬৭), পিপলস পার্টি ৮১ (৮৫)। প্রাদেশিক পরিষদে ৩০০-র মধ্যে ২৮৮। সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমা ১৫১।
১৯৭০-এর নির্বাচন প্রমাণ করে যে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া বাঙালি জাতীয়তাবাদ তেইশ বছরে একটি নির্বাচনী সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পরিণত হয়েছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়, সেটি পরের অধ্যায়ের বিষয়।
নোট থেকে কাটাকার্ডে ট্যাপ করে উল্টাও
নাম ও তারিখ
কীএগারো দফা
উত্তরসর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কর্মসূচি, জানুয়ারি ১৯৬৯। ছয় দফার সঙ্গে ছাত্র, শ্রমিক ও কৃষকের দাবি যুক্ত করে।
তারিখ২০ জানুয়ারি ১৯৬৯
উত্তরছাত্রনেতা আসাদ পুলিশের গুলিতে নিহত হন।
তারিখ২৪ জানুয়ারি ১৯৬৯
উত্তরমতিউর রহমান মল্লিক নিহত হন। দিনটি গণঅভ্যুত্থান দিবস।
কেড. মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা
উত্তররাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর; ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯-এ নিহত হন। আন্দোলনে নিহত প্রথম শিক্ষক।