চিরকুট। English

বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় · নবম-দশম · অধ্যায় ১ · পরিচ্ছেদ ১.৩ (১ম অংশ)

সামরিক শাসন, বৈষম্য ও ছয় দফা।

আগের নোটে দেখেছি ১৯৫৪-র নির্বাচন পর্যন্ত। এবার দশটা বছর, যার শুরুতে সংবিধান বাতিল হয় আর শেষে একটা মামলা বসে। মাঝখানে যা ঘটে তা সংখ্যায় মাপা যায়, আর ছয় দফার প্রতিটি দফা সেই সংখ্যাগুলোরই জবাব।

১. গণতন্ত্রের অবসান

১৯৫৬-র সংবিধান দুই বছরও টেকেনি। ৭ অক্টোবর ১৯৫৮-এ প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা সংবিধান বাতিল করে সামরিক আইন জারি করেন এবং সেনাপ্রধান আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত করেন। বিশ দিন পরে, ২৭ অক্টোবর ১৯৫৮-এ, আইয়ুব খান মির্জাকে সরিয়ে নিজেই প্রেসিডেন্ট হন। সব রাজনৈতিক দল ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়।

এরপর এল মৌলিক গণতন্ত্র। নামটা শুনে মনে হয় এটা গণতন্ত্রেরই একটা রূপ, আর সেখানেই ফাঁদ। মৌলিক গণতন্ত্র হলো এমন একটা পরোক্ষ ব্যবস্থা যেখানে জনগণ সরাসরি রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচন করে না; তারা একদল প্রতিনিধি নির্বাচন করে, আর সেই প্রতিনিধিরা রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচন করেন। ১৯৫৯-এর মৌলিক গণতন্ত্র আদেশ অনুযায়ী সারা পাকিস্তানে ৮০,০০০ জন, পরে ১,২০,০০০ জন, নির্বাচিত মৌলিক গণতন্ত্রী তৈরি হয়, পূর্ব ও পশ্চিমে সমান ভাগে।

ধাপে ধাপে ধাপে ধাপে দেখো

মৌলিক গণতন্ত্র: ভোটটা কার হাতে?

সাধারণ মানুষ। তারা ভোট দিত, কিন্তু প্রেসিডেন্টকে নয়। ভোট যেত স্থানীয় প্রতিনিধিদের, যাঁদের বলা হতো মৌলিক গণতন্ত্রী।

১৯৬২ সালে দেওয়া নতুন সংবিধানে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু হয়, ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় প্রেসিডেন্টের হাতে, আর জাতীয় পরিষদের ক্ষমতা সীমিত থাকে। বাংলা ও উর্দুর রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা অবশ্য বজায় থাকে। একই বছর শরীফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্র আন্দোলন হয়; অভিযোগ ছিল, রিপোর্টটি শিক্ষাকে ব্যয়বহুল ও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ঠেলে দেবে। সামরিক শাসনের মধ্যেও ছাত্ররাই প্রথম প্রতিবাদের জায়গাটা তৈরি করে।

মাইলফলক ঘটনায় ট্যাপ করো

সামরিক শাসনের দশ বছর

সামরিক আইন জারি। প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা ১৯৫৬-র সংবিধান বাতিল করে সামরিক আইন জারি করেন এবং আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক করেন। কেন গুরুত্বপূর্ণ: দুই বছরের পুরোনো সংবিধানটাই উঠে গেল, আর সব রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলো।

২. সংখ্যায় বৈষম্য

“বৈষম্য ছিল” কথাটা মুখস্থ করা সহজ, বিশ্বাস করা কঠিন। তাই নিচে চারটে আলাদা সূচক, আর চারটেতেই একই প্যাটার্ন। পূর্ব পাকিস্তান জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ ও রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস হয়েও উন্নয়ন ব্যয়, চাকরি আর প্রতিরক্ষায় অনেক কম পেত।

সূচক সূচক বেছে নাও

সংখ্যায় বৈষম্য

সব সংখ্যা তৎকালীন সরকারি ও গবেষণা-প্রতিবেদন থেকে; সূত্রভেদে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে। রেখার রং কেবল দুটো অংশ আলাদা করে চেনার জন্য।

দ্বিতীয় সূচকটা আলাদা করে খেয়াল করার মতো, কারণ ওখানে একটা কথা আছে যা বাকিগুলোতে নেই। ১৯৪৯-৫০-এ মাথাপিছু আয়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ২৪ রুপি। বিশ বছর পরে সেটা দাঁড়ায় ২০৬ রুপিতে। অর্থাৎ বৈষম্য শুরু থেকেই বিরাট ছিল না; এটা বেড়েছে। নিচে হাতল টেনে দুটো সময় পাশাপাশি দেখো।

আগে ও পরে হাতল টানো

ব্যবধানটা বেড়েছে

মাথাপিছু আয়, ১৯৫৯-৬০ সালের স্থির মূল্যে হিসাব করা।

এই সংখ্যাগুলোকে আরেকভাবে সাজালে যুক্তিটা আরও পরিষ্কার হয়: পূর্ব পাকিস্তান যা দিত, আর যা পেত। দুটো তালিকার সংখ্যা আলাদা ভিত্তিতে হিসাব করা, তাই এগুলো একে অন্যের সঙ্গে সরাসরি গুণ-ভাগ করার জিনিস নয়। কিন্তু সবগুলোই একই দিকে ইঙ্গিত করে, আর সেই ব্যবধানটাই ছয় দফার প্রেক্ষাপট।

দুই পাশ হাতল টানো

যে অংশ বেশি দিত, সে অংশ কম পেত

ভিত্তি: জনসংখ্যা ও রপ্তানি আয় পাকিস্তানের মোটের শতাংশ; উন্নয়ন ব্যয় দুই অংশের মোট ১,৫৯,২৭০ মিলিয়ন রুপির শতাংশ; গেজেটেড চাকরি দুই অংশের মোট ৫,০৪৬ জনের শতাংশ; সেনা কর্মকর্তার অংশ আনুমানিক।

মিলিয়ে দেখো

একটা প্রশ্ন

১৯৫০ থেকে ১৯৭০, চারটি পরিকল্পনা-পর্বে পশ্চিম পাকিস্তানে উন্নয়ন ব্যয় ছিল ১,১৩,৩৪০ মিলিয়ন রুপি আর পূর্ব পাকিস্তানে ৪৫,৯৩০ মিলিয়ন রুপি। পূর্ব পাকিস্তান পেয়েছিল পশ্চিমের প্রায় কত শতাংশ?

৩. ছয় দফা

১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা পেশ করেন। দফাগুলো সম্মেলনের বিষয়সূচিতে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় তিনি সম্মেলন ত্যাগ করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬-তে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটি দফাগুলো গ্রহণ করে, ১৮ মার্চ কাউন্সিল অধিবেশনে তা দলের কর্মসূচি হয়, আর ২৩ মার্চ “আমাদের বাঁচার দাবী: ৬-দফা কর্মসূচী” নামে পুস্তিকা প্রকাশিত হয়।

ছয় দফা মুখস্থ তালিকা নয়, আর ঠিক এ কারণেই ক্রম গুলিয়ে যায়। প্রতিটি দফা একটা নির্দিষ্ট সমস্যার জবাব, আর সেই সমস্যাগুলো উপরের সূচকগুলোতেই দেখা গেছে। দফার নম্বরে ট্যাপ করে দেখো কোনটা কোন বৈষম্যের জবাব।

ছয় দফা দফার নম্বরে ট্যাপ করো

কোন দফা কোন বৈষম্যের জবাব

দফা। লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে প্রকৃত ফেডারেল ব্যবস্থা; সার্বজনীন ভোটাধিকারে সরাসরি নির্বাচিত আইনসভার সার্বভৌমত্বসহ সংসদীয় সরকার। জবাব। ১৯৬২-র রাষ্ট্রপতিশাসিত সংবিধান ও মৌলিক গণতন্ত্রের পরোক্ষ ভোট। কেন। জনগণের সরাসরি ভোটই সরকার ঠিক করবে, পরোক্ষ নির্বাচকমণ্ডলী নয়।

ছয় দফা বিচ্ছিন্নতার দাবি নয়, স্বায়ত্তশাসনের দাবি; কিন্তু প্রতিটি দফা বৈষম্যের একটা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রকে সরাসরি লক্ষ্য করে। এ কারণেই একে বলা হয় বাঙালির “ম্যাগনা কার্টা” বা বাঁচার দাবি। ছয় দফার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রথমবার একটা সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক কর্মসূচি পায়।

মিলিয়ে দেখো

আরেকটা প্রশ্ন

ছয় দফার কোন দফাটি সরাসরি ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে এসেছিল?

৪. প্রতিক্রিয়া, আর একটা মামলা

সরকার ছয় দফাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যা দিয়ে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার শুরু করে। ৭ জুন ১৯৬৬-তে ছয় দফার সমর্থনে এবং নেতাদের মুক্তির দাবিতে সারা প্রদেশে হরতাল পালিত হয়; পুলিশের গুলিতে কয়েকজন নিহত হন। দিনটি “ছয় দফা দিবস” হিসেবে পালিত হয়।

এরপর ১৯৬৮ সালে সরকার ঘোষণা করে যে ভারতের সহায়তায় সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। মামলার সরকারি নাম ছিল “রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য”, আসামি ৩৫ জন, প্রধান আসামি শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৬৮ সালের জুনে ঢাকা সেনানিবাসে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হয়।

মামলার উদ্দেশ্য ছিল ছয় দফার নেতৃত্বকে রাজনৈতিকভাবে অকার্যকর করা। ফল হয় ঠিক উল্টো। মামলাটি শেখ মুজিবুর রহমানকে পূর্ব পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করে, আর প্রতিবাদ ছাত্র, শ্রমিক ও কর্মচারী সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এখান থেকেই ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সূচনা, আর সেটাই পরের নোটের বিষয়।

মিলিয়ে দেখো

শেষ প্রশ্ন

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি করেন কে?

এক নজরে

১৯৫৮। ৭ অক্টোবর ইস্কান্দার মির্জার সামরিক আইন; ২৭ অক্টোবর আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট।

১৯৫৯ ও ১৯৬২। মৌলিক গণতন্ত্র আদেশ, ৮০,০০০ পরে ১,২০,০০০ মৌলিক গণতন্ত্রী; আর ১৯৬২-তে রাষ্ট্রপতিশাসিত সংবিধান ও শিক্ষা কমিশন-বিরোধী ছাত্র আন্দোলন।

১৯৬৫। ২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, ফাতেমা জিন্নাহ পরাজিত; সেপ্টেম্বরে সতেরো দিনের পাক-ভারত যুদ্ধ, পূর্ব পাকিস্তান কার্যত প্রতিরক্ষাহীন।

বৈষম্যের সংখ্যা। উন্নয়ন ব্যয় ১,১৩,৩৪০ বনাম ৪৫,৯৩০ মিলিয়ন রুপি; মাথাপিছু আয়ের ব্যবধান ২৪ থেকে ২০৬ রুপি; রপ্তানি আয়ের প্রায় ৭০% পূর্ব থেকে; গেজেটেড কর্মকর্তা ৩,৭০৮ বনাম ১,৩৩৮।

১৯৬৬ ও ১৯৬৮। ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে ছয় দফা পেশ, ২৩ মার্চ পুস্তিকা, ৭ জুন হরতাল; আর ১৯৬৮-র জুনে ঢাকা সেনানিবাসে আগরতলা মামলার বিচার শুরু, আসামি ৩৫ জন।

সূত্র: বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, নবম-দশম শ্রেণি (এনসিটিবি), অধ্যায় ১, পরিচ্ছেদ ১.৩ “সামরিক শাসন ও পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ”, প্রথম অংশ।