চিরকুট। English

বাংলা ২য় পত্র · নবম-দশম · অধ্যায় ১ · ভাষা · প্রথম পরিচ্ছেদ

আঞ্চলিক ও আদর্শ চলিত।

ভাষার মৌখিক রূপের ভিতরেও ভাগ আছে। এক অঞ্চলের মানুষ যেভাবে কথা বলে, আরেক অঞ্চলের মানুষ ঠিক সেভাবে বলে না; সেটাই আঞ্চলিক কথ্য রীতি বা উপভাষা। আর সেই উপভাষাগুলোর সমন্বয়েই দাঁড়িয়েছে আদর্শ চলিত রীতি, যা সারা দেশের শিক্ষিতজন ব্যবহার করেন।

১. উপভাষা তৈরি হয় কেন

বইয়ের যুক্তিটা আগের নোটেই এসেছে: দেশ, কাল ও পরিবেশভেদে ভাষার পার্থক্য ও পরিবর্তন ঘটে। এখানে কাজ করছে প্রথমটি, দেশ, অর্থাৎ স্থান। নদী, দূরত্ব, যাতায়াতের অসুবিধা, এসবের কারণে একই ভাষার মানুষ আলাদা আলাদা উচ্চারণ আর আলাদা শব্দ গড়ে তোলে। যত দূর, তত তফাত।

বই এই কথাটা একটি বাক্যে দেখিয়েছে, আর ওই এক বাক্যেই পুরো অধ্যায়ের একমাত্র আঞ্চলিক উদাহরণটি আছে: চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাধারণের কথ্য ভাষা দিনাজপুর বা রংপুরের লোকের পক্ষে খুব সহজবোধ্য নয়। বাক্যটা দুটো কথা বলছে। এক, পার্থক্য এতটাই হতে পারে যে বোঝা কঠিন হয়। দুই, তবু দুটোই বাংলা।

তিন অঞ্চল বিন্দুতে ট্যাপ করো

বইয়ে নাম-করা তিন অঞ্চল

বইয়ের একমাত্র নাম-করা উদাহরণ: চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাধারণের কথ্য ভাষা দিনাজপুর বা রংপুরের লোকের পক্ষে খুব সহজবোধ্য নয়। বই এটি বলে দেখায় যে দূরত্ব বাড়লে উপভাষার পার্থক্যও বাড়ে।

রূপরেখাটি শৈলীকৃত, মাপ-অনুপাতে নয়; কেবল আপেক্ষিক অবস্থান বোঝানোর জন্য। কোনো সীমান্তরেখা বা প্রশাসনিক দাবি এতে নেই।

২. আদর্শ চলিত রীতি কী

বইয়ের সংজ্ঞাবাক্যটি ছোট: বিভিন্ন অঞ্চলের উপভাষার কথ্য রীতি সমন্বয়ে শিক্ষিতজনের ব্যবহৃত এই ভাষাই আদর্শ চলিত ভাষা। তিনটি শব্দ আলাদা করে দেখো। সমন্বয়, অর্থাৎ কোনো একটি অঞ্চলের ভাষা নয়, মিলিত রূপ। শিক্ষিতজনের ব্যবহৃত। আর আদর্শ, অর্থাৎ মান হিসেবে গৃহীত।

এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটা ভেঙে ফেলা দরকার। আদর্শ চলিত রীতি কোনো একটি জেলার ভাষা নয়, আর কোনো উপভাষার চেয়ে ভালো ভাষাও নয়। এটি একটি মান, যাতে পুরো দেশের মানুষ একে অন্যকে বুঝতে পারে। ফলে একজন মানুষ ঘরে উপভাষা আর শ্রেণিকক্ষে আদর্শ চলিত, দুটোই ব্যবহার করতে পারে, আর সেটাই স্বাভাবিক।

কোথায় কোনটা, সেটাও সহজ। পাঠ্যবই, শ্রেণিকক্ষ, সংবাদপাঠ আর আনুষ্ঠানিক আলোচনায় আদর্শ চলিত। ঘরোয়া আলাপে, বন্ধুদের সঙ্গে, নিজের অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে আঞ্চলিক কথ্য। আর নাটক-গল্পে চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে আঞ্চলিক কথ্যই।

ছেদ বোতামে ট্যাপ করো

মেলে কোথায়, মেলে না কোথায়

মাঝের অংশটাই সবচেয়ে বড়, আর সেটাই আসল কথা। আদর্শ চলিত আকাশ থেকে পড়েনি; সে এই উপভাষাগুলোরই সমন্বয়। তাই একটিকে আরেকটির প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবার কিছু নেই।

৩. তফাত ধরা পড়ে তিন স্তরে

উপভাষার তফাত এলোমেলোভাবে ছড়ানো নয়; তিনটি জায়গায় ধরা পড়ে। উচ্চারণে, যেখানে একই শব্দ আলাদা শোনায়। শব্দে, যেখানে এক জিনিসের আলাদা নাম। আর ক্রিয়ার রূপে, যেখানে একই কালের ক্রিয়া অন্য গঠন নেয়। এই তিন স্তরে ভাগ করে ভাবতে শিখলে যেকোনো নমুনা দেখে বলা যায় তফাতটা কোথায়।

আর যা একই থাকে, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উপভাষা আর আদর্শ চলিতের মধ্যে বেশিরভাগ শব্দভাণ্ডার, বাক্যগঠনের মূল নিয়ম আর অর্থ অভিন্ন। সেজন্যই এগুলো আলাদা ভাষা নয়, একই ভাষার রীতি।

কোন স্তরে ট্যাপ করে দেখো

তফাতটা কোন স্তরে

উচ্চারণের স্তর। শব্দটি একই, অর্থও একই; কেবল ধ্বনি কোথাও লোপ পায়, কোথাও বদলে যায়, কোথাও টান আলাদা হয়। এ ধরনের পার্থক্য লিখলে ধরা পড়ে না, শুনলে পড়ে। সেজন্যই আঞ্চলিক রীতি মূলত মৌখিক।

বইয়ে কোনো উপভাষার নমুনা বাক্য ছাপা নেই; বই কেবল তিনটি জায়গার নাম করে একটি মন্তব্য করেছে। তাই এই নোটে কোনো অঞ্চলের নমুনা বাক্য বসানো হয়নি, কেবল তফাতটা কোন স্তরে তা দেখানো হয়েছে।

৪. চারটি রীতি গুলিয়ে না ফেলা

এই অধ্যায়ের সবচেয়ে সাধারণ ভুলটা এখানে। সাধু ও চলিত, এ দুটি লেখ্য রূপের রীতি। আদর্শ চলিত ও আঞ্চলিক, এ দুটি মৌখিক রূপের রীতি। চারটিকে এক সারিতে বসানো যায় না। চলিত নামটা দুই দিকেই আছে বলেই গোলমালটা হয়; মনে রেখো, বাঁ দিকে সাধু নেই, আর ডান দিকে আঞ্চলিক নেই।

মিলিয়ে দেখো

একটা প্রশ্ন

“আমি যাইতেছি।” বাক্যটি সম্পর্কে কোন কথাটি ঠিক?

৫. জোড়াগুলো হাতে রাখা

ছয়টি কার্ড। এই নোটের মুখস্থ-অংশ দুটি বাক্য আর একটি তিন-স্তরের কাঠামো, সবই এখানে।

কার্ড কার্ডে ট্যাপ করে উল্টাও

সংজ্ঞা-কার্ড

শব্দআঞ্চলিক কথ্য রীতি
সংজ্ঞাএকটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন মুখের ভাষা। এটি ভাষার মৌখিক রূপের একটি রীতি; একে উপভাষাও বলা হয়।
শব্দআদর্শ চলিত রীতি
সংজ্ঞাবিভিন্ন অঞ্চলের উপভাষার কথ্য রীতি সমন্বয়ে শিক্ষিতজনের ব্যবহৃত এই ভাষাই আদর্শ চলিত ভাষা।
শব্দবইয়ের উদাহরণ
সংজ্ঞাচট্টগ্রাম অঞ্চলের সাধারণের কথ্য ভাষা দিনাজপুর বা রংপুরের লোকের পক্ষে খুব সহজবোধ্য নয়।
শব্দউপভাষা তৈরি হয় কেন
সংজ্ঞাদেশ, কাল ও পরিবেশভেদে ভাষার পার্থক্য ও পরিবর্তন ঘটে; এখানে কাজ করে দেশ, অর্থাৎ স্থানের দূরত্ব।
শব্দতফাত কোন তিন স্তরে
সংজ্ঞাউচ্চারণে, শব্দে আর ক্রিয়ার গঠনে। অর্থ ও মূল বাক্যগঠন একই থাকে, তাই এগুলো আলাদা ভাষা নয়।
শব্দযে ভুলটা কোরো না
সংজ্ঞাসাধু ও চলিত লেখ্য রূপের দুই রীতি। আদর্শ চলিত ও আঞ্চলিক মৌখিক রূপের দুই রীতি। চারটিকে এক সারিতে বসিয়ো না।
মিলিয়ে দেখো

আরেকটা প্রশ্ন

বইয়ের সংজ্ঞা অনুযায়ী আদর্শ চলিত ভাষা কীভাবে গড়ে উঠেছে?

মিলিয়ে দেখো

শেষ প্রশ্ন

“চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাধারণের কথ্য ভাষা দিনাজপুর বা রংপুরের লোকের পক্ষে খুব সহজবোধ্য নয়।” বই এই বাক্য দিয়ে প্রধানত কী বোঝাতে চেয়েছে?

এক নজরে

কারণ। দেশ, কাল ও পরিবেশভেদে ভাষার পার্থক্য ও পরিবর্তন ঘটে; উপভাষার পিছনে কাজ করে দেশ, অর্থাৎ স্থান।

বইয়ের উদাহরণ। চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাধারণের কথ্য ভাষা দিনাজপুর বা রংপুরের লোকের পক্ষে খুব সহজবোধ্য নয়।

আদর্শ চলিত। বিভিন্ন অঞ্চলের উপভাষার কথ্য রীতি সমন্বয়ে শিক্ষিতজনের ব্যবহৃত এই ভাষাই আদর্শ চলিত ভাষা। কোনো একটি জেলার ভাষা নয়, একটি মান।

তিন স্তর। উচ্চারণ, শব্দ, ক্রিয়ার গঠন। অর্থ ও মূল বাক্যগঠন একই থাকে।

ভাগ। সাধু ও চলিত লেখ্য রূপের রীতি; আদর্শ চলিত ও আঞ্চলিক মৌখিক রূপের রীতি।

এই অধ্যায়ের বোর্ড প্রশ্ন, উত্তর ও ব্যাখ্যা সহ →

সূত্র: বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতি, নবম-দশম শ্রেণি (এনসিটিবি), অধ্যায় ১ “ভাষা”, প্রথম পরিচ্ছেদের এই অংশটুকু: আঞ্চলিক কথ্য রীতি ও আদর্শ চলিত রীতি।