চিরকুট। English

বাংলা ২য় পত্র · নবম-দশম · অধ্যায় ১ · ভাষা · প্রথম পরিচ্ছেদ

সাধু ও চলিত রীতি।

বাংলার লেখ্য রূপের দুটি রীতি, সাধু আর চলিত। প্রথম কথাটাই ভুল জানা থাকে: এ দুটো “শুদ্ধ বনাম অশুদ্ধ” নয়, “লেখা বনাম বলা”ও নয়। দুটোই লেখার রীতি। আর পরীক্ষায় যেটা সবচেয়ে বেশি চাওয়া হয়, সাধু থেকে চলিতে রূপান্তর, সেটা আসলে গোটা বাক্য নতুন করে লেখা নয়।

১. দুটোই লেখার রীতি

বইয়ের বাক্যটা সরাসরি: বাংলা ভাষার লৈখিক বা লেখ্য রূপেরও রয়েছে দুটি রীতি, একটি চলিত রীতি অপরটি সাধু রীতি। অর্থাৎ ভাগটা মুখের আর কাগজের মধ্যে নয়; কাগজের ভিতরেই দুটো পথ।

সাধু রীতি সম্পর্কে বই বলে, বাংলা লেখ্য সাধু রীতি সুনির্ধারিত ব্যাকরণের নিয়ম অনুসরণ করে চলে। এর মানে সাধুর রূপগুলো স্থির: ক্রিয়া ও সর্বনামের গঠন নির্দিষ্ট নিয়মে চলে, লেখকভেদে বদলায় না। আর চলিত রীতি সম্পর্কে বইয়ের বাক্য আরও ছোট, চলিত রীতি পরিবর্তনশীল। বই যোগ করে, একশ বছর আগে যে চলিত রীতি শিষ্ট ও ভদ্রজনের কথিত ভাষা হিসেবে প্রচলিত ছিল, কালের প্রবাহে বর্তমানে তা অনেকটা পরিবর্তিত রূপ পেয়েছে।

দুটো বাক্য পাশাপাশি রাখলে শেখার কথাটা বেরিয়ে আসে। সাধুর শক্তি তার স্থিরতায়, আর চলিতের শক্তি তার নমনীয়তায়। একটাকে অন্যটার চেয়ে ভালো বলার প্রশ্নই ওঠে না; বই নিজে কোথাও তা বলেনি।

২. একই অনুচ্ছেদ, দুই রীতি

বইয়ে সাধু রীতির যে নমুনাটি উদ্ধৃত, সেটি কাজী ইমদাদুল হকের লেখা থেকে নেওয়া। নিচে সেই বাক্যটি এক স্তরে, আর তার চলিত রূপ আরেক স্তরে, শব্দে-শব্দে ঠিক একই জায়গায় বসানো। হাতলটা টেনে দেখো কী হয়।

দুই স্তর হাতলটি ডানে-বাঁয়ে টানো

একই অনুচ্ছেদ, দুই রীতি

সাধু নমুনাটি বইয়ে উদ্ধৃত, লেখক কাজী ইমদাদুল হক। চলিত রূপটি বইয়ের নয়, এই নোটের রূপান্তর; অন্য রূপান্তরও সম্ভব।

বাক্যে শব্দ বাইশটি। হাতল টানলে নড়ে মাত্র সাতটি জায়গা, বাকি পনেরোটি শব্দ দুই রীতিতেই হুবহু এক। এটাই এই নোটের কেন্দ্রীয় কথা: রূপান্তর মানে পুরো বাক্য নতুন করে লেখা নয়। যে সাতটি বদলাল, তারা কোন নিয়মে বদলাল তা নিচের ছকে।

সাধুচলিতকোন নিয়ম
প্রাতেসকালেতৎসম শব্দের তদ্ভব প্রতিশব্দ
সহিতসঙ্গেঅনুসর্গের চলিত রূপ
করিবারকরারক্রিয়াপদ, ই লোপ ও সংক্ষেপ
পাইয়াছিলেনপেয়েছিলেনক্রিয়াপদ, ই লোপ, কাল অপরিবর্তিত
তাহারাতারাসর্বনাম, হ লোপ
পূর্বেইআগেইতদ্ভব প্রতিশব্দ, বিভক্তি ই অক্ষুণ্ন
হইলেনহলেনক্রিয়াপদ, ই লোপ, পুরুষ অপরিবর্তিত

যে পনেরোটি শব্দ বদলায়নি: পরদিন, হেডমাস্টার, সাহেবের (দুইবার), প্রস্তুত, লিস্ট, অনুসারে, যে, তিনজন, শিক্ষক, সাক্ষাৎ, অনুমতি, আটটার, ডাক-বাংলায়, উপস্থিত।

৩. কী বদলায়, কী বদলায় না

ছকটা মন দিয়ে দেখলে দেখা যায় বদলেছে মোটে তিন শ্রেণির শব্দ। সর্বনাম: তাহারা থেকে তারা, ইহা থেকে এটা, যাহা থেকে যা, কেহ থেকে কেউ। ক্রিয়াপদ: করিয়াছি থেকে করেছি, করিতেছি থেকে করছি, হইলেন থেকে হলেন। আর কিছু অনুসর্গ ও তৎসম অব্যয়: হইতে থেকে থেকে, সহিত থেকে সঙ্গে, নিমিত্ত থেকে জন্য, অদ্য থেকে আজ, কল্য থেকে কাল, প্রত্যহ থেকে প্রতিদিন, যদ্যপি থেকে যদিও।

বিশেষ্য আর বিশেষণ সাধারণত অপরিবর্তিত থাকে। এই “কী বদলায় না” অংশটাই শিক্ষার্থীরা জানে না, আর সেখানেই নম্বর কাটা যায়: ভয় পেয়ে সব শব্দ বদলে দিলে ওটা আর রূপান্তর থাকে না, অনুবাদ হয়ে যায়।

ভিতরের নিয়ম দুটো এক লাইনে বলা যায়। সাধু ক্রিয়ায় যে ই ধ্বনিটি থাকে, করিয়া, হইলেন, পাইয়াছিলেন, চলিতে তা লোপ পায় বা সংকুচিত হয়: করে, হলেন, পেয়েছিলেন। আর সাধু সর্বনামে যে হ ধ্বনিটি থাকে, চলিতে সেটি লোপ পায়: তাহারা থেকে তারা, ইহারা থেকে এরা, উহারা থেকে ওরা। কাল আর পুরুষ কখনও বদলাবে না; হইলেন থেকে হলেন হবে, হয়েছিলেন বা হলো নয়।

এবার নিজে করে দেখো। নিচের বাক্যটি ওই একই অনুচ্ছেদের শেষ অংশ, তাই শব্দগুলো তোমার চেনা। ছয়টি শব্দেই ট্যাপ করতে হবে, যেগুলো বদলায় না সেগুলোতেও, কারণ “বদলাবে না” বেছে নেওয়াও একটা উত্তর।

নিজে করো শব্দে ট্যাপ করে চলিত রূপ বেছে নাও

শব্দে ট্যাপ করে রূপান্তর

একটা প্রশ্ন দিয়ে এই অংশটা বাজিয়ে নেওয়া যাক।

মিলিয়ে দেখো

একটা প্রশ্ন

“পরদিন প্রাতে … তাহারা আটটার পূর্বেই ডাক-বাংলায় উপস্থিত হইলেন।” বাক্যটির চলিত রূপে নিচের কোন শব্দটি অপরিবর্তিত থাকবে?

৪. বইয়ের পার্থক্য-তালিকা

বই চারটি দিক ধরে দুই রীতির পার্থক্য দেখায়, আর পরীক্ষায় “পার্থক্য লেখো” বললে এই চারটিই লিখতে হয়। ব্যাকরণের নিয়মে সাধু সুনির্ধারিত নিয়ম মেনে চলে, চলিত পরিবর্তনশীল। শব্দে সাধু গুরুগম্ভীর ও তৎসম শব্দবহুল, চলিত তদ্ভব শব্দবহুল। প্রয়োগক্ষেত্রে সাধু নাটকের সংলাপ ও বক্তৃতার অনুপযোগী, আর চলিত বক্তৃতা, আলাপ-আলোচনা ও নাট্যসংলাপের উপযোগী। আর সর্বনাম ও ক্রিয়াপদে সাধু বিশেষ গঠনপদ্ধতি মেনে পূর্ণ ও দীর্ঘ রূপ নেয়, চলিত সংক্ষিপ্ত ও সহজতর রূপ পায়।

দশটি চিপ, দুটি বিন। চিপগুলো জোড়ায় জোড়ায় সাজানো, তবে এলোমেলো ক্রমে।

ভাগ করো চিপে ট্যাপ করে বিনে পাঠাও

বৈশিষ্ট্য কার

একটা চিপ ধরো, তারপর বিনে ছাড়ো। প্রতিটি বিনে ঠিক পাঁচটি করে যাবে।

৫. কোন রীতি কোথায় চলে

ব্যবহারক্ষেত্র নিয়ে বইয়ের দুটি বাক্য আছে, আর দুটিই পরীক্ষায় হুবহু লেখার মতো। চলিত রীতি সংক্ষিপ্ত ও সহজবোধ্য এবং বক্তৃতা, আলাপ-আলোচনা ও নাট্যসংলাপের জন্য বেশি উপযোগী। আর সাধু রীতি নাটকের সংলাপ ও বক্তৃতার অনুপযোগী। কারণটাও সহজ: সংলাপ ও বক্তৃতা মুখের ভাষার ভঙ্গি নকল করে, আর সাধুর কোনো মৌখিক রূপ নেই। কেউ “করিয়াছিলাম” বলে কথা বলে না।

ছক ঘরে বা সারির নামে ট্যাপ করো

কোন রীতি কোথায় চলে

রীতিপুরোনো সাহিত্যবক্তৃতাআলাপ-আলোচনানাট্যসংলাপ
সাধু রীতি✓✕✕✕
চলিত রীতি✓✓✓✓
আঞ্চলিক কথ্য রীতি✕✕✓✓
সাধুর সারিতে একটিমাত্র ✓। বই বলে সাধু রীতি নাটকের সংলাপ ও বক্তৃতার অনুপযোগী, আর তার কারণ সাধুর কোনো মৌখিক রূপ নেই।

আজ প্রায় সব গদ্য, পাঠ্যবই, সংবাদপত্র, চিঠি, দরখাস্ত, চলিত রীতিতে লেখা হয়। সাধু টিকে আছে মূলত পুরোনো সাহিত্যে। তাই শেখার দিকটা প্রায় সবসময় সাধু থেকে চলিত, উল্টোটা নয়।

মিলিয়ে দেখো

আরেকটা প্রশ্ন

বইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী সাধু রীতি কোন দুটি কাজের জন্য অনুপযোগী?

৬. দুই রীতি মিশিয়ে ফেলা

একই লেখায় সাধু ও চলিত মিশে গেলে ভাষা এলোমেলো হয়ে যায়। যেমন “তাহারা আটটার আগেই উপস্থিত হইলেন”, যেখানে সর্বনাম ও ক্রিয়া সাধু অথচ অব্যয়টি চলিত। ঠিক করতে হলে দুটো পথ, হয় গোটাটা সাধু, নয় গোটাটা চলিত; মাঝামাঝি কিছু নেই।

রায় দেওয়ার পদ্ধতিটা ছোট। গোটা বাক্যের ভাব দেখে অনুমান কোরো না; সর্বনাম আর ক্রিয়াপদ, এই দুটো দেখো।

রায় দাও বাক্যে ট্যাপ করে রায় ও কারণ দেখো

সাধু, চলিত, না মিশ্র

সাধু। সর্বনাম তাহারা, অব্যয় পূর্বেই আর ক্রিয়া হইলেন, তিনটিই সাধু রূপ। কোথাও চলিত রূপ ঢোকেনি।

মিশ্র রীতির এই দোষটিকে পরীক্ষায় প্রায়ই গুরুচণ্ডালী দোষ বলা হয়। পরিভাষাটি এই অধ্যায়ে নেই; এটি নিচের শ্রেণির বই ও প্রশ্নপত্রে ব্যবহৃত হয়।

মিলিয়ে দেখো

শেষ প্রশ্ন

“তিনি গৃহ থেকে নির্গত হইলেন।” বাক্যটি কোন রীতির, এবং কেন?

৭. জোড়াগুলো হাতে রাখা

আটটি কার্ড, সামনে সাধু রূপ আর পেছনে চলিত রূপের সঙ্গে নিয়মের নাম। আটটি জোড়া মুখস্থ করার দরকার নেই; চারটি নিয়ম মনে থাকলে অচেনা শব্দও রূপান্তর করা যায়।

কার্ড কার্ডে ট্যাপ করে উল্টাও

রূপান্তরের জোড়া-কার্ড

সাধুতাহারা
চলিততারা · সর্বনাম, হ লোপ পায়
সাধুযাহা
চলিতযা · সর্বনাম, হ লোপ পায়
সাধুকরিয়াছি
চলিতকরেছি · ক্রিয়াপদ, ই লোপ, কাল অপরিবর্তিত
সাধুকরিতেছি
চলিতকরছি · ক্রিয়াপদ, চলমান কাল, সংক্ষিপ্ত রূপ
সাধুহইতে
চলিতথেকে · অনুসর্গের তদ্ভব রূপ
সাধুসহিত
চলিতসঙ্গে · অনুসর্গের তদ্ভব রূপ
সাধুঅদ্য · কল্য · প্রত্যহ
চলিতআজ · কাল · প্রতিদিন · তৎসম শব্দের তদ্ভব প্রতিশব্দ
সাধুনিমিত্ত · অতঃপর · যদ্যপি
চলিতজন্য · এরপর · যদিও · তৎসম অব্যয়ের চলিত প্রতিশব্দ

খেয়াল করো, আটটি কার্ডে নিয়ম মাত্র চারটি: সর্বনামের হ, ক্রিয়ার ই, অনুসর্গের তদ্ভব রূপ, আর তৎসম শব্দের প্রতিশব্দ। এই চারটিই ঘুরেফিরে আসছে।

এক নজরে

দুটোই লেখ্য। সাধু সুনির্ধারিত ব্যাকরণের নিয়ম অনুসরণ করে চলে; চলিত রীতি পরিবর্তনশীল।

চার পার্থক্য। নিয়ম, শব্দ (তৎসম বনাম তদ্ভব), প্রয়োগক্ষেত্র, আর সর্বনাম-ক্রিয়াপদের গঠন।

চার নিয়ম। সর্বনামের হ লোপ, ক্রিয়ার ই লোপ, অনুসর্গের তদ্ভব রূপ, তৎসম শব্দের প্রতিশব্দ। কাল, পুরুষ, বচন ও বিভক্তি বদলায় না, আর বিশেষ্য-বিশেষণও নয়।

ব্যবহারক্ষেত্র। সাধু রীতি নাটকের সংলাপ ও বক্তৃতার অনুপযোগী; চলিত রীতি সংক্ষিপ্ত ও সহজবোধ্য এবং বক্তৃতা, আলাপ-আলোচনা ও নাট্যসংলাপের জন্য বেশি উপযোগী।

রায়। সর্বনাম আর ক্রিয়াপদ দেখো। দুটোই এক রীতির হলে সেই রীতি; একটা এদিক আর একটা ওদিক হলে মিশ্র।

এই অধ্যায়ের বোর্ড প্রশ্ন, উত্তর ও ব্যাখ্যা সহ →

সূত্র: বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতি, নবম-দশম শ্রেণি (এনসিটিবি), অধ্যায় ১ “ভাষা”, প্রথম পরিচ্ছেদের এই অংশটুকু: কথ্য, চলিত ও সাধু রীতি, সাধু ও চলিত রীতির পার্থক্য, এবং উদাহরণ।