চিরকুট। English

বাংলা ২য় পত্র · নবম-দশম · অধ্যায় ১ · ভাষা · প্রথম পরিচ্ছেদ

ভাষা।

বইয়ের প্রথম বাক্যটাই একটা সংজ্ঞা, আর সেটা হুবহু মুখস্থ করতে হয়। কিন্তু সংজ্ঞাটা শুকনো নয়; ভিতরে চারটি শর্ত লুকানো আছে, আর প্রতিটি শর্ত কোনো না কোনো জিনিসকে ভাষার বাইরে রাখার জন্যই বসানো। এই নোট সেই চারটি শর্ত, সাতটি বাক্‌-প্রত্যঙ্গ, আর ভাষার দুই রূপের ছক নিয়ে।

১. সংজ্ঞার চারটি শর্ত

বইয়ের সংজ্ঞা: বাগ্‌যন্ত্রের দ্বারা উচ্চারিত অর্থবোধক ধ্বনির সাহায্যে মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যমকে ভাষা বলে। বাক্যটা একবার পড়ে মনে হয় এক টানের কথা, কিন্তু ভিতরে চারটি আলাদা শর্ত আছে। এক, ধ্বনিটি বাগ্‌যন্ত্রে উচ্চারিত। দুই, সেটি ধ্বনি। তিন, সেটি অর্থবোধক। চার, সেটি মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যম।

চারটি শর্তের যেকোনো একটি না মিললে জিনিসটা আর ভাষা নয়। কাশির শব্দ বাগ্‌যন্ত্র থেকেই আসে আর ধ্বনিও বটে, কিন্তু অর্থবোধক নয়। হাততালির শব্দ আছে, কিন্তু সেটা বাগ্‌যন্ত্রে উচ্চারিত নয়। মাথা নেড়ে না বলা ভাব প্রকাশ করছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে ধ্বনি নেই। এই তুলনাগুলো মাথায় থাকলে পরীক্ষায় “ইশারা কি ভাষা?” ধরনের প্রশ্নে আটকাতে হয় না।

২. বাগ্‌যন্ত্র একটি অঙ্গ নয়

সংজ্ঞার প্রথম শব্দটাই বাগ্‌যন্ত্র, আর এখানেই প্রথম ভুলটা হয়: শিক্ষার্থী ভাবে বাগ্‌যন্ত্র বুঝি শরীরের কোনো একটি অঙ্গ। বই তালিকা দিয়ে দিয়েছে, গলনালি, মুখবিবর, কণ্ঠ, জিহ্বা, তালু, দাঁত, নাক ইত্যাদি বাক্‌-প্রত্যঙ্গ। এগুলোকে একসঙ্গেই বাগ্‌যন্ত্র বলে।

সাতটি অঙ্গ ছবির সংখ্যাগুলোতে ট্যাপ করো

বাগ্‌যন্ত্র: ধ্বনি কোথায় তৈরি হয়

গলনালি। ফুসফুস থেকে আসা বাতাস এই নালি দিয়েই উপরে ওঠে। বাতাস না উঠলে কোনো ধ্বনিই তৈরি হয় না, তাই এটিই ধ্বনির উৎস।

ছবিটি শৈলীকৃত, শারীরবৃত্তীয় মাপের নয়। ঘোষ, অঘোষ, নাসিক্য ও দন্ত্য ধ্বনির কথা এখানে কেবল চেনানোর জন্য; নিয়মগুলো দ্বিতীয় অধ্যায়ের বিষয়।

৩. কত ভাষা, আর বাংলা কোথায়

বইয়ের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে পৃথিবীতে সাড়ে তিন হাজারের বেশি ভাষা প্রচলিত আছে। এদেরই একটি বাংলা। বই আরও বলে, বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ত্রিশ কোটি লোকের মুখের ভাষা বাংলা, আর ভাষাভাষী জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলা পৃথিবীর চতুর্থ বৃহৎ মাতৃভাষা। পরীক্ষায় এই দুটো সংখ্যাই বইয়ের বয়ানে চাওয়া হয়।

সংখ্যা দুটি বইয়ের হিসাব, আর বইটি অনেক আগে লেখা। আজকের গণনায় সংখ্যা আলাদা হতে পারে, কিন্তু পরীক্ষার উত্তর বইয়ের সংখ্যাই।

ভাষা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। বইয়ের যুক্তিটা এক লাইনের: দেশ, কাল ও পরিবেশভেদে ভাষার পার্থক্য ও পরিবর্তন ঘটে। তিনটে চলক আলাদা করে ধরা যায়। দেশ মানে স্থান, আর স্থান বদলালে আসে উপভাষা। কাল মানে সময়, আর হাজার বছর আগের বাংলা আজকের বাংলা ছিল না। পরিবেশ মানে কার সঙ্গে কথা বলছ, আর ঘরের ভাষা আর সভার ভাষা এক নয়।

৪. ভাষার দুই রূপ, আর চারটি রীতি

এই নোটের মেরুদণ্ড এখানে। বাংলা ভাষার একটি মৌখিক রূপ আছে, যা মুখে বলা হয়, আর একটি লৈখিক বা লেখ্য রূপ আছে, যা লিখে প্রকাশ করা হয়। বই বলে, ভাষার মৌখিক রূপের আবার রয়েছে একাধিক রীতি; আর বাংলা ভাষার লৈখিক বা লেখ্য রূপেরও রয়েছে দুটি রীতি, একটি চলিত রীতি অপরটি সাধু রীতি। ছকটা গাছ হিসেবে খুলে দেখো।

শাখা শাখায় ট্যাপ করে খোলো

ভাষার রূপ ও রীতি

  • বাংলা ভাষা
    • মৌখিক রূপ, কথ্য রীতি মুখে বলা ভাষা
      • আদর্শ বা প্রমিত চলিত কথ্য রীতি বিভিন্ন অঞ্চলের কথ্য রীতির সমন্বয়ে শিক্ষিতজনের ব্যবহৃত ভাষা
      • আঞ্চলিক কথ্য রীতি, উপভাষা এক অঞ্চলের নিজস্ব মুখের ভাষা, যেমন চট্টগ্রামের কথ্য ভাষা
    • লৈখিক রূপ, লেখ্য রীতি লিখিত ভাষা
      • সাধু রীতি সুনির্ধারিত ব্যাকরণের নিয়ম অনুসরণ করে চলে; কেবল লেখায়, মুখে নয়
      • চলিত রীতি পরিবর্তনশীল; সংক্ষিপ্ত ও সহজবোধ্য

ছকটায় দুটো জিনিস লক্ষ করার মতো। প্রথমত, চলিত নামটা দুই জায়গায় আছে, মৌখিক দিকেও আর লৈখিক দিকেও। শিক্ষার্থী প্রায়ই ভাবে চলিত মানেই মুখের ভাষা; আসলে মুখের চলিতই লেখায় এসে লেখ্য চলিত রীতি হয়েছে, তাই নামটা এক। দ্বিতীয়ত, সাধু নামটা বাঁ দিকের শাখায় নেই। সাধু রীতির কোনো মৌখিক রূপ নেই; কেউ সাধু ভাষায় কথা বলে না। এই অসাম্যটাই পরীক্ষায় ধরা হয়, আর পরের নোটের ভিতও এটাই।

দুই রূপের তফাতটা কেবল নামের নয়, কাজেরও। মুখে বলার সময় সুর, জোর, থেমে যাওয়া, মুখভঙ্গি, সবই অর্থ তৈরি করে। লেখায় এদের কিছুই নেই; সেখানে কাজটা করতে হয় বিরামচিহ্ন, বাক্যগঠন আর শব্দচয়ন দিয়ে। তাই একই কথা মুখে আর লেখায় এক রকম দাঁড়ায় না, আর লিখতে গেলে বেশি শব্দ লাগে।

ভাগ করো চিপে ট্যাপ করে বিনে পাঠাও

মৌখিক না লৈখিক

একটা চিপ ধরো, তারপর বিনে ছাড়ো। প্রতিটি বিনে ঠিক পাঁচটি করে যাবে।

৫. সংজ্ঞাটা প্রয়োগ করে দেখা

সংজ্ঞা মুখস্থ করা আর সংজ্ঞা প্রয়োগ করা এক জিনিস নয়। আটটি ক্ষেত্রে চারটি শর্ত মিলিয়ে দেখো; দেখবে সংজ্ঞার প্রতিটি শব্দ কোনো না কোনো ক্ষেত্রকে বাদ দেওয়ার জন্যই বসানো।

রায় দাও যেকোনো চিপে ট্যাপ করো

এটা কি ভাষা

ভাষা। চারটি শর্তই মেলে: বাগ্‌যন্ত্রে উচ্চারিত, ধ্বনি, অর্থবোধক, আর ভাব প্রকাশ করছে।
মিলিয়ে দেখো

একটা প্রশ্ন

বইয়ের সংজ্ঞা অনুযায়ী নিচের কোনটি ভাষা নয়?

মিলিয়ে দেখো

আরেকটা প্রশ্ন

বইয়ের হিসাব অনুযায়ী ভাষাভাষী জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলা পৃথিবীর কততম বৃহৎ মাতৃভাষা, আর প্রায় কত লোকের মুখের ভাষা?

৬. বাংলা ভাষার বংশধারা

এই অংশটি এই অধ্যায়ের পাঠ্য নয়। নবম-দশমের ব্যাকরণ বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে ভাষার উৎপত্তি নিয়ে কিছু বলা নেই। আগের শ্রেণিতে পড়া ধারাটি এখানে শুধু মনে করিয়ে দেওয়া হলো, কারণ পরীক্ষায় প্রশ্ন আসে।

ক্রমে সাজাও প্রাচীন থেকে আধুনিক, ক্রমে ট্যাপ করো

বাংলা ভাষার বংশধারা

সবচেয়ে প্রাচীন ধাপটি থেকে শুরু করো।

৭. যা হুবহু মনে রাখতে হবে

ছয়টি কার্ড। এই নোটের যা কিছু বইয়ের ভাষায় মুখস্থ করতে হয়, সবই এখানে জড়ো করা।

কার্ড কার্ডে ট্যাপ করে উল্টাও

সংজ্ঞা-কার্ড

শব্দভাষা
সংজ্ঞাবাগ্‌যন্ত্রের দ্বারা উচ্চারিত অর্থবোধক ধ্বনির সাহায্যে মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যমকে ভাষা বলে।
শব্দবাগ্‌যন্ত্র
সংজ্ঞাগলনালি, মুখবিবর, কণ্ঠ, জিহ্বা, তালু, দাঁত, নাক; এই বাক্‌-প্রত্যঙ্গগুলোকে একসঙ্গে বাগ্‌যন্ত্র বলে।
শব্দমৌখিক রূপ
সংজ্ঞাভাষার মুখে-বলা রূপ। এর একাধিক রীতি: আদর্শ চলিত কথ্য রীতি ও আঞ্চলিক কথ্য রীতি।
শব্দলৈখিক রূপ
সংজ্ঞাভাষার লেখ্য রূপ। এর দুটি রীতি: সাধু ও চলিত।
শব্দভাষা বদলায় কেন
সংজ্ঞাদেশ, কাল ও পরিবেশভেদে ভাষার পার্থক্য ও পরিবর্তন ঘটে।
শব্দবাংলার অবস্থান
সংজ্ঞাবইয়ের হিসাবে সাড়ে তিন হাজারের বেশি ভাষার একটি বাংলা; প্রায় ত্রিশ কোটি মানুষের মুখের ভাষা, আর ভাষাভাষীর সংখ্যায় চতুর্থ বৃহৎ মাতৃভাষা।
মিলিয়ে দেখো

শেষ প্রশ্ন

“সাধু রীতির কোনো মৌখিক রূপ নেই।” এই কথাটির সবচেয়ে সঠিক ব্যাখ্যা কোনটি?

এক নজরে

সংজ্ঞা। বাগ্‌যন্ত্রের দ্বারা উচ্চারিত অর্থবোধক ধ্বনির সাহায্যে মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যমকে ভাষা বলে। চারটি শর্ত: বাগ্‌যন্ত্র, ধ্বনি, অর্থবোধক, ভাব প্রকাশ।

বাগ্‌যন্ত্র। গলনালি, মুখবিবর, কণ্ঠ, জিহ্বা, তালু, দাঁত, নাক ইত্যাদি বাক্‌-প্রত্যঙ্গ।

সংখ্যা। বইয়ের হিসাবে সাড়ে তিন হাজারের বেশি ভাষা; বাংলা প্রায় ত্রিশ কোটি লোকের মুখের ভাষা ও চতুর্থ বৃহৎ মাতৃভাষা।

পরিবর্তন। দেশ, কাল ও পরিবেশভেদে ভাষার পার্থক্য ও পরিবর্তন ঘটে।

ছক। মৌখিক রূপ: আদর্শ চলিত কথ্য ও আঞ্চলিক কথ্য। লৈখিক রূপ: সাধু ও চলিত। সাধুর কোনো মৌখিক রূপ নেই।

এই অধ্যায়ের বোর্ড প্রশ্ন, উত্তর ও ব্যাখ্যা সহ →

সূত্র: বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতি, নবম-দশম শ্রেণি (এনসিটিবি), অধ্যায় ১ “ভাষা”, প্রথম পরিচ্ছেদের এই অংশটুকু: ভাষার সংজ্ঞা ও বাংলা ভাষারীতির সূচনা।