কৃষিশিক্ষা · নবম-দশম · অধ্যায় ১ · তৃতীয় পরিচ্ছেদ
ভূমিক্ষয় ও ক্ষয়রোধ।
প্রথম পরিচ্ছেদে দেখেছিলে, কৃষকের ভাষায় মাটি মানে উপরের ১৫ থেকে ১৮ সেন্টিমিটার। ভূমিক্ষয়ে ঠিক সেই স্তরটাই চলে যায়। এক ইঞ্চি মাটি তৈরি হতে বহু বছর লাগে, আর ভেসে যেতে একটা বর্ষা।
১. ভূমিক্ষয় কাকে বলে
একস্থানের মাটি ক্রমাগত সরে অন্যস্থানে চলে যাওয়াকেই বলে ভূমিক্ষয়। সংজ্ঞাটার ভিতরে “ক্রমাগত” শব্দটা আলাদা করে খেয়াল করো; এটা একবারের একটা ভাঙন নয়, একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, আর সেই কারণেই এটা থামানো যায়।
ভূমিক্ষয় দুই প্রকার, প্রাকৃতিক আর মনুষ্যসৃষ্ট। প্রাকৃতিক ভূমিক্ষয়কে আবার দুই শ্রেণিতে ভাগ করা যায়, বৃষ্টিপাতজনিত আর বায়ুপ্রবাহজনিত। বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে দেখা যায় বৃষ্টিপাতজনিত ভূমিক্ষয়, বায়ুপ্রবাহজনিত নয়; আমাদের দেশে বৃষ্টিই বেশি, আর মাটিও বেশিরভাগ সময় ভেজা।
বৃষ্টিপাতজনিত ক্ষয় একবারে হয় না, ধাপে ধাপে হয়, আর ধাপগুলো একই পানির চারটি পর্যায়। নিচে এক ফোঁটা বৃষ্টির সঙ্গে ঢাল বেয়ে নেমে দেখো।
পথ ধরোক্রমে বিন্দুতে ট্যাপ করো
এক ফোঁটা বৃষ্টি ঢাল বেয়ে নামছে
ফোঁটাটা পড়ল। এখন কোথায় পড়বে? যেখানে মাটি ঢাকা নেই, সেখানে ট্যাপ করো।
খালি মাটিতে ফোঁটার আঘাত সরাসরি লাগে, কণা ছিটকে যায়। পানি এখন ঢাল বেয়ে চাদরের মতো নামছে; প্রথম ধাপের ক্ষয়টা কোনটি?
আস্তরণ ভূমিক্ষয়। উপরের উর্বর নরম মাটির স্তর চাদরের মতো কেটে নিয়ে যাচ্ছে। পানি এবার জায়গায় জায়গায় জড়ো হয়ে সরু রেখা কাটছে; পরের ধাপ?
রিল ভূমিক্ষয়। আস্তরণ ক্ষয়ের দ্বিতীয় ধাপ, মাটিতে লম্বাকৃতির সরু রেখা। এই রেখাগুলো চওড়া ও গভীর হলে কী হয়?
গালি বা নালা ভূমিক্ষয়। রিল থেকেই এর উদ্ভব, আর বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে এটিই দেখা যায়। কাটা মাটি এবার কোথায় গিয়ে জমছে?
নদীতে। আর প্রবল স্রোতে নদীর পাশের জমি ভেঙে পড়ে, যাকে বলে নদীভাঙন।
সাতটি ধাপ। খেয়াল করো, প্রথম তিনটি ধাপ, আস্তরণ থেকে রিল থেকে গালি, একই প্রক্রিয়ার তিনটি পর্যায়, আলাদা তিনটা ঘটনা নয়। আর পুরোটার গতি ঠিক করে দেয় একটা জিনিস: ঢালটা ঢাকা ছিল, নাকি খালি।
এত তাড়াতাড়ি নদীতে নয়, মাঝখানের ধাপগুলো বাদ পড়ছে। ক্ষয় ধাপে ধাপে হয়: আস্তরণ, তারপর রিল, তারপর গালি।
গালি ক্ষয় হঠাৎ হয় না। রিল ভূমিক্ষয় থেকেই নালা বা গালি ক্ষয়ের উদ্ভব, তাই আগের ধাপটা খুঁজে বের করো।
এটা এখনকার ধাপ নয়। বৃষ্টির ফোঁটা অনুসরণ করো: উপর থেকে নিচে, চাদর থেকে রেখা, রেখা থেকে নালা।
নামগুলো আলাদা করে মুখস্থ করলে ক্রমটা উল্টে যায়। নিচে নাম নেই, কেবল বর্ণনা; বর্ণনা পড়ে ক্রমে সাজাও।
ক্রমক্রমে ট্যাপ করো
ক্ষয়ের ধাপ সাজাও
সবচেয়ে অগভীর ক্ষয়টা থেকে শুরু করো।
ঠিক। এরপর?
এখনো না। পানি চাদর থেকে রেখা হয়, রেখা থেকে নালা।
আস্তরণ, রিল, গালি, নদীভাঙন। রিল হলো আস্তরণের দ্বিতীয় ধাপ, আর গালির উদ্ভবই হয় রিল থেকে; এই দুটো বাক্য পরীক্ষায় সরাসরি আসে।
মিলিয়ে দেখো
একটা প্রশ্ন
কোন ভূমিক্ষয় থেকে নালা বা গালি ভূমিক্ষয়ের উদ্ভব হয়?
আস্তরণ ক্ষয় প্রথম ধাপ, কিন্তু গালির ঠিক আগের ধাপ নয়। মাঝখানে রিল আছে।
ঠিক। ক্রমটা হলো আস্তরণ, রিল, গালি। আস্তরণ ক্ষয়ে উপরের স্তর চাদরের মতো ওঠে, তারপর পানি জায়গায় জায়গায় জড়ো হয়ে সরু রেখা কাটে, সেটাই রিল, আস্তরণের দ্বিতীয় ধাপ। সেই রেখা চওড়া ও গভীর হলেই গালি।
বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে দেখা যায় বৃষ্টিপাতজনিত ক্ষয়, বায়ুপ্রবাহজনিত নয়। আর গালি বৃষ্টির পানির কাজ।
নদীভাঙন ক্রমের শেষ ধাপ, গালির পরে। উল্টো দিক থেকে ভাবছ।
২. আসল কারণটা কে
বইয়ের সবচেয়ে জোরালো বাক্যটা এখানে: ভূমিক্ষয়ের প্রকৃত কারণ মানুষ নিজে। খাদ্য উৎপাদনের জন্য মানুষ মাটিকে যথেচ্ছ ব্যবহার করছে; গাছ কাটছে, পাহাড় কাটছে, ঢালে উপর-নিচ বরাবর চাষ দিচ্ছে। প্রাকৃতিক কারণ ক্ষয়কে সম্ভব করে, আর মানুষ সেটাকে দ্রুত করে।
কোথায় কোনটা হয়, সেটাও মনে রাখার মতো। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে দেখা যায় গালি ভূমিক্ষয়; নদীভাঙন হয় নদীতীরবর্তী অঞ্চলে; আর পাহাড় ধস হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে। জুম চাষ পাহাড়ি এলাকার ফসল চাষ পদ্ধতি, আর ঢালের গাছপালা সরিয়ে চাষ করায় মাটি খালি হয়ে পড়ে।
কোথায় কোনটানম্বরে ট্যাপ করো
গ্রামের কোথায় কোন ক্ষয়
গাছ কেটে ফেলায় মাটি খালি। বৃষ্টির ফোঁটা সরাসরি আঘাত করে, আর আস্তরণ ভূমিক্ষয় শুরু এখান থেকেই। প্রতিকার: গাছ লাগানো, আর মাটি ঢেকে রাখে এমন ফসল।
জুম চাষ পাহাড়ি এলাকার ফসল চাষ পদ্ধতি, অর্থাৎ ঢালের গাছপালা সরিয়ে চাষ। মাটি খালি হয়ে যাওয়ায় ক্ষয় দ্রুত হয়। প্রতিকার: জুম নিয়ন্ত্রণ, আর ঢালে স্থায়ী ফসল।
উপর-নিচ বরাবর চাষ দিলে প্রতিটি দাগই পানির নালা হয়ে যায়, অর্থাৎ রিল ভূমিক্ষয়। প্রতিকার:কন্টোর চাষ, অর্থাৎ ঢালের আড়াআড়ি সমোন্নত লাইনে চাষ।
রিল চওড়া ও গভীর হয়ে গালি বা নালা ভূমিক্ষয়। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে এটিই দেখা যায়। এত দূর গড়ালে জমি আর চাষযোগ্য থাকে না।
নদীভাঙন, অর্থাৎ প্রবল স্রোতে নদীর পাশের জমি ভেঙে পড়া। বাড়ি, ঘর আর জমি একসঙ্গে যায়।
এখানে ক্ষয় নেই। চীনাবাদাম ও মাষকলাই মাটি ঢেকে রাখে আর শিকড় উপরের স্তর ধরে রাখে; বই এ দুটোরই নাম নেয়। সঙ্গে বেশি জৈব পদার্থ দিলে মাটির কণা জোড়া লেগে থাকে।
পাঁচ জায়গায় ক্ষয়, এক জায়গায় নয়। পার্থক্যটা একটাই, মাটি ঢাকা আছে কি না। বই তাই ক্ষয়রোধের প্রথম কথাই বলে ফসল আর গাছ দিয়ে মাটি ঢেকে রাখা।
ছবিটি শৈলীকৃত, কোনো নির্দিষ্ট জায়গার নয়।
৩. ঢালে চাষ: দুই রকম
কন্টোর চাষ কথাটা মুখস্থ করা সহজ, কিন্তু ছবিটা মাথায় না এলে পরীক্ষায় “পাহাড়ের শীর্ষে না ঢালে” প্রশ্নে ভুল হয়। কন্টোর চাষ মানে পাহাড়ের ঢালের আড়াআড়ি সমোন্নত লাইনে চাষ, আর কন্টোর চাষের প্রয়োজন হয় ঢালেই। হাতল টেনে দুটো দিক পাশাপাশি দেখো।
দুই রকমহাতল টেনে দেখো
উপর-নিচ বনাম কন্টোর
মিলিয়ে দেখো
আরেকটা প্রশ্ন
কন্টোর পদ্ধতিতে চাষাবাদের প্রয়োজন হয় কোথায়?
শীর্ষে ঢাল নেই, তাই পানি গড়িয়ে গতি পায় না। সমস্যাটা ঢালের।
ঠিক। কন্টোর চাষ মানে ঢালের আড়াআড়ি সমোন্নত লাইনে চাষ, আর প্রতিটি সারি ছোট বাঁধের মতো পানির গতি ভাঙে। সমস্যাটা ঢালের, তাই সমাধানটাও ঢালের।
পাদদেশে পলি জমে, ক্ষয় হয় না। সেখানে কন্টোরের দরকারই নেই।
চর সমতল, আর সেখানকার সমস্যা আলাদা, নদীভাঙন। কন্টোর তার সমাধান নয়।
৪. ক্ষয় ঠেকানোর উপায়
প্রতিকারগুলো একটা লম্বা তালিকা হিসেবে পড়লে মনে হয় সবগুলো সব জায়গায় খাটে। আসলে ঢালের সমাধান আর নদীতীরের সমাধান এক নয়। প্রতিটির সঙ্গে কোথায় প্রযোজ্য সেটাও দেখে নাও।
প্রতিকারউপায়ের নামে ট্যাপ করো
ক্ষয় ঠেকানোর ছয় উপায়
পাহাড়ের ঢালে, আড়াআড়ি সমোন্নত লাইনে চাষ। প্রতিটি সারি পানির গতি ভাঙে, তাই আস্তরণ ও রিল ক্ষয় দুটোই কমে। সমতল জমিতে এর দরকার নেই।
চীনাবাদাম ও মাষকলাই; বই এই দুটোর নাম নেয়, আর সাধারণভাবে ডাল ফসল ক্ষয় রোধে সাহায্য করে। নিচু, ছড়ানো গাছ মাটি ঢেকে রাখে, আর শিকড় উপরের স্তর ধরে রাখে।
মাটিতে বেশি পরিমাণে জৈব পদার্থ দিলে কণাগুলো জোড়া লেগে দলা বাঁধে। দলা বাঁধা মাটি সহজে ভেসে যায় না, আর পানিও বেশি ধরে রাখে।
গাছের পাতা বৃষ্টির আঘাত ভাঙে, আর শিকড় মাটি ধরে রাখে। পাহাড় কেটে ও গাছ কেটেই ক্ষয় ত্বরান্বিত হয়, আর সেজন্যই বই বলে ভূমিক্ষয়ের প্রকৃত কারণ মানুষ নিজে।
জুম পাহাড়ি এলাকার ফসল চাষ পদ্ধতি; ঢালের গাছপালা সরিয়ে চাষ করায় মাটি খালি হয়ে পড়ে। ঢালে স্থায়ী ফসল রাখলে মাটি ঢাকা থাকে, তাই ক্ষয় কমে।
প্রবল স্রোতে নদীর পাশের জমি ভাঙে, অর্থাৎ নদীভাঙন। তীরে বাঁধ, ব্লক ও গাছ দিয়ে স্রোতের আঘাত কমানো হয়। আর পার্বত্য চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে আলাদা একটা সমস্যা আছে, পাহাড় ধস।
ছয়টাই দেখা হলো। খেয়াল করো, সব উপায়ই ঘুরেফিরে একই দুটো কাজ করে: বৃষ্টির ফোঁটাকে সরাসরি মাটিতে পড়তে না দেওয়া, আর পানির গতি কমানো।
মিলিয়ে দেখো
শেষ প্রশ্ন
পাহাড়ি ঢালের একটি জমিতে প্রতি বর্ষায় মাটি ধুয়ে যাচ্ছে। বই অনুযায়ী কোন ফসল-জোড়া লাগালে ক্ষয় কমবে?
আখ লম্বা ফসল, মাটি ঢাকে না। বই ভূমিক্ষয়রোধী ফসল হিসেবে অন্য দুটোর নাম নেয়।
ঠিক। বই ভূমিক্ষয়রোধে এই দুটোরই নাম নেয়, আর সাধারণভাবে ডাল ফসল ক্ষয় রোধে সাহায্য করে। দুটোই নিচু, ছড়ানো গাছ, তাই মাটি ঢেকে রাখে বলে বৃষ্টির ফোঁটা সরাসরি আঘাত করতে পারে না, আর ছড়ানো শিকড় উপরের ১৫ থেকে ১৮ সেমি স্তরটাকে জালের মতো ধরে রাখে।
ধান ঢালের ফসল নয়, আর ভুট্টা লম্বা গাছ, মাটির অনেকটাই খালি থাকে।
পাট চায় নদীবাহিত গভীর পলিমাটি, আর গম শীতের সমতল জমির ফসল। ঢালের জন্য এ দুটো নয়।
এক নজরে
সংজ্ঞা। একস্থানের মাটি ক্রমাগত সরে অন্যস্থানে চলে যাওয়াই ভূমিক্ষয়।
প্রকারভেদ। প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট; প্রাকৃতিককে আবার বৃষ্টিপাতজনিত ও বায়ুপ্রবাহজনিত ভাগে। বাংলাদেশে ব্যাপক বৃষ্টিপাতজনিত ক্ষয়।
চার ধাপ। আস্তরণ, রিল, গালি বা নালা, নদীভাঙন। রিল আস্তরণের দ্বিতীয় ধাপ, আর গালির উদ্ভব রিল থেকেই। পার্বত্য অঞ্চলে গালি ক্ষয়।
কারণ। প্রকৃত কারণ মানুষ নিজে; খাদ্য উৎপাদনের জন্য মাটিকে যথেচ্ছ ব্যবহার। পাহাড় ধস হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে।
প্রতিকার। কন্টোর চাষ ঢালে; ভূমিক্ষয়রোধী ফসল, বিশেষ করে চীনাবাদাম ও মাষকলাই; মাটিতে বেশি জৈব পদার্থ; গাছ ও বন; জুম নিয়ন্ত্রণ; নদীতীর সংরক্ষণ।
সূত্র: কৃষিশিক্ষা, নবম-দশম শ্রেণি (এনসিটিবি), অধ্যায় ১ “কৃষি প্রযুক্তি”, তৃতীয় পরিচ্ছেদ “ভূমিক্ষয় ও ক্ষয়রোধ”।