কৃষিশিক্ষা · নবম-দশম · অধ্যায় ১ · দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
ফসল উৎপাদনের জন্য জমি প্রস্তুতি।
ফসল বেছে নেওয়া হয়ে গেছে। এবার জমিটাকে সেই ফসলের উপযোগী করার পালা, আর এই কাজটার একটা ক্রম আছে যেটা ওলটপালট করা যায় না। পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি ভুল হয় ঠিক এই ক্রম নিয়ে: সার আগে না নালা আগে, বীজতলা আগে না চাষ আগে।
১. ভূমিকর্ষণ কাকে বলে
মাটি খুঁড়ে বা আঁচড়ে আগাছামুক্ত, নরম, আলগা ও ঝুরঝুরে করার প্রক্রিয়াই ভূমিকর্ষণ। সংকীর্ণ অর্থে ভূমিকর্ষণ বলতে বোঝায় যন্ত্রের সাহায্যে মাটি খোঁড়া। দুটো সংজ্ঞাই মনে রাখার মতো, কারণ প্রথমটা বলে কেন করা হয় আর দ্বিতীয়টা বলে কীভাবে।
জমি প্রস্তুতির প্রথম কাজটা জমি চাষ, অর্থাৎ ভূমিকর্ষণ। বেড তৈরি নয়, নালা কাটা নয়, সার প্রয়োগ নয়। মাটি আলগা না হলে সার মিশবে না, বেড বাঁধা যাবে না, আর নালা কাটলেও পরের চাষে ভেঙে যাবে।
চাষ করার আগে চারটে জিনিস দেখে নিতে হয়: ফসলের ধরন, মাটির প্রকৃতি, আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাত, আর জমির ঢাল ও পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা। এখন হাতল টেনে দেখো একই মাটি চাষের আগে আর পরে কেমন দেখায়।
চাষের আগে আর পরে
ভূমিকর্ষণ কেন করা হয়, তার কারণগুলো এখন ছবি থেকেই পড়ে নেওয়া যায়। মাটি আলগা ও ঝুরঝুরে হলে শিকড় সহজে ছড়ায়। বাতাস চলাচল বাড়ে, তাতে মাটির অণুজীবের কার্যকারিতা বাড়ে। মাটির পানি ধারণক্ষমতা বাড়ে। আগাছা দমন হয়। মাটির নিচের পোকামাকড়, যেমন উরচুঙ্গা, ধ্বংস হয়। আর সার ও জৈব পদার্থ মাটির সঙ্গে মিশে যায়।
একটা নিয়ম আলাদা করে মনে রাখার মতো, কারণ এটা বোঝা ছাড়া মুখস্থ করলে উল্টো মনে থাকে। বৃষ্টি কম হলে গভীর চাষ দেওয়া অনুচিত, কারণ গভীর চাষে মাটির আর্দ্রতা আরও কমে যায়; নিচের ভেজা স্তরটা উল্টে উপরে উঠে এসে রোদে শুকিয়ে যায়। আবার হালকা চাষ দিলেও উপরের স্তরে আর্দ্রতার অভাব ঘটে। আর শুকনো মাটিতে চাষের আগে সেচ দিতে হয়, নইলে বড় বড় ঢেলা তৈরি হয়।
একটা প্রশ্ন
কম বৃষ্টির মৌসুমে জমিতে গভীর চাষ দেওয়া কেন অনুচিত?
২. ছয়টা কাজ, একটা ক্রম
চাষ আর মই সবসময় জোড়ায় চলে। চাষে ভাঙা মাটির ঢেলা মই গুঁড়ো করে, জমি সমান করে, আর আর্দ্রতা আটকে রাখে; সেজন্যই বই বলে “চার থেকে পাঁচ বার চাষ ও মই”। ফসলভেদে সংখ্যাটা আলাদা: ধানের জন্য চারটি চাষ, রোপা আমনের জমিতে চার থেকে পাঁচ বার আড়াআড়ি চাষ ও মই, আর আলুর জন্য পাঁচ থেকে ছয় বার চাষ ও মই।
ব্যতিক্রমও আছে। বিনা চাষে বপনও বইয়ে আছে: আশ্বিন মাসে বিনা চাষে ডালের বীজ জমিতে বপন করা হয়, কারণ তখন মাটিতে যথেষ্ট রস থাকে। নিচের ছয়টা কাজ সঠিক ক্রমে সাজাও।
কোনটা আগে, কোনটা পরে
আরেকটা প্রশ্ন
জমি প্রস্তুতির একেবারে প্রথম কাজ কোনটি?
৩. ধাপগুলো একসঙ্গে
জমি তৈরি ফসল উৎপাদনের ধাপগুলোর একটা মাত্র ধাপ, তাই পুরো শৃঙ্খলটা একবার দেখে নেওয়া ভালো। নিচের নয় ধাপ জমি নির্বাচন থেকে শুরু করে সংরক্ষণ পর্যন্ত যায়, আর শেষ দুটো ধাপ এই অধ্যায়ের চতুর্থ ও পঞ্চম পরিচ্ছেদের বিষয়।
জমি তৈরি থেকে সংরক্ষণ
৪. যন্ত্র বদলায়, কাজ বদলায় না
অধ্যায়ের নামই কৃষি প্রযুক্তি, কিন্তু প্রযুক্তি বলতে অনেকে কেবল মেশিন বোঝে। আসলে কৃষি প্রযুক্তি মানে কৃষিকাজ করার প্রক্রিয়া, আর মেশিন তার একটা রূপ মাত্র। পুরোনো আর নতুন জিনিসগুলো পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, কাজটা একই থেকেছে; বদলেছে সময় আর শ্রম।
ঐতিহ্যবাহী না আধুনিক
৫. সংখ্যাগুলো হাতে নামানো
সার কেনা হয় কেজিতে, কিন্তু বইয়ের হার দেওয়া থাকে শতক প্রতি। রূপান্তরটাই আসল কাজ, আর সেখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল হয়। নিচের ধানের হারগুলো এই অধ্যায়ের নয়; এগুলো বইয়েরই “কৃষিজ উৎপাদন” অধ্যায়ের “ফসল চাষ পদ্ধতি” পরিচ্ছেদের শতক-প্রতি সারণি। অন্য ফসলের হার তোমার নিজের বই থেকে নিতে হবে।
সারের মাত্রা: শতক থেকে বিঘায়
১ বিঘা = ৩৩ শতক, ১ একর = ১০০ শতক, ১ হেক্টর প্রায় ২৪৭ শতক। এগুলো প্রচলিত ভূমি-পরিমাপ, পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা নয়, আর বিঘার মাপ অঞ্চলভেদে বদলায়।
যা লিখছ তা কোথাও যাচ্ছে না। খাতাটা তোমার।
শেষ প্রশ্ন
করিম সাহেবের ১ বিঘা, অর্থাৎ ৩৩ শতক ধানের জমি। সারণি অনুযায়ী শতক প্রতি টিএসপি ৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম হলে পুরো জমিতে টিএসপি লাগবে প্রায় কত?
একই রকম একটা হিসাব বীজতলার জন্যও করা যায়, আর এবার সংখ্যাটা এই পরিচ্ছেদেরই। বই বলে ২ হেক্টর জমির জন্য বীজতলা লাগে ১৪০ বর্গমিটার। রোপা আমনের বীজতলা হয় দুইভাবে, শুকনা আর কর্দম; কর্দম বীজতলা মানে রোপণের আগে কাদাময় জমিতে চারা উৎপাদন।
বীজতলা কত বড় লাগবে
ভিত্তি: বইয়ের ২ হেক্টরে ১৪০ বর্গমিটার। ভূমি-পরিমাপের রূপান্তর প্রচলিত মাপ, পাঠ্যবইয়ের নয়।
যা লিখছ তা কোথাও যাচ্ছে না। খাতাটা তোমার।
এক নজরে
ভূমিকর্ষণ। মাটি খুঁড়ে আগাছামুক্ত, নরম, আলগা ও ঝুরঝুরে করা; সংকীর্ণ অর্থে যন্ত্রের সাহায্যে মাটি খোঁড়া। জমি প্রস্তুতির প্রথম কাজ এটাই।
বিবেচ্য চারটি। ফসলের ধরন, মাটির প্রকৃতি, আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাত, আর জমির ঢাল ও পানিনিষ্কাশন।
চাষের সংখ্যা। ধান ৪টি চাষ; রোপা আমনের জমি ৪ থেকে ৫ বার আড়াআড়ি চাষ ও মই; আলু ৫ থেকে ৬ বার। আশ্বিনে ডাল বিনা চাষে বপন করা হয়।
মাপগুলো। নালা ২৫ সেমি চওড়া ও ১৫ সেমি গভীর; আলুর নালার দূরত্ব ৬০ সেমি; ২ হেক্টরের জন্য বীজতলা ১৪০ বর্গমিটার; চারার বয়স ২৫ থেকে ৩০ দিন।
সার। জমি তৈরির সময় জৈব সার মেশানো; জৈব পদার্থ কম হলে কম্পোস্ট; সবুজ সারে ধঞ্চে। রাসায়নিক সার শেষ চাষের আগে, আর মাত্রা এই পরিচ্ছেদে নেই।
সূত্র: কৃষিশিক্ষা, নবম-দশম শ্রেণি (এনসিটিবি), অধ্যায় ১ “কৃষি প্রযুক্তি”, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ “ফসল উৎপাদনের জন্য জমি প্রস্তুতি”। ধানের সার-সারণিটি একই বইয়ের “কৃষিজ উৎপাদন” অধ্যায়ের “ফসল চাষ পদ্ধতি” পরিচ্ছেদের।