পদার্থবিজ্ঞান · নবম-দশম · অধ্যায় ১ · ভৌত রাশি ও পরিমাপ
ত্রুটি, যথার্থতা ও নির্ভুলতা।
কোনো পরিমাপই একেবারে নিখুঁত নয়। যন্ত্রে ত্রুটি থাকে, চোখে ত্রুটি থাকে, পরিবেশও বদলায়। ভালো পরীক্ষক সেই ত্রুটিকে অস্বীকার করেন না: চিনে নেন, কমান, আর যতটুকু থেকে যায় সেটা জানিয়ে দেন। অধ্যায়ের শেষ অনুচ্ছেদটা আসলে এই অভ্যাসটার কথা।
১. দুটো শব্দ, যেগুলো এক নয়
যথার্থতা (accuracy) হলো পরিমাপলব্ধ মান প্রকৃত মানের কত কাছাকাছি, তার পরিমাপ। নির্ভুলতা (precision) হলো একই রাশি বারবার মাপলে পাঠগুলো পরস্পরের কত কাছাকাছি হয়, তার পরিমাপ। কথায় বললে দুটোই “ভালো মাপ” শোনায়, কিন্তু জিনিস দুটো আলাদা, আর একটা ছাড়া অন্যটা থাকতেই পারে।
পার্থক্যটা লক্ষ্যবস্তুতে গুলি ছোড়ার ছবিতে এক সেকেন্ডে ধরা পড়ে। চারটা বোর্ডে পাঁচটা করে দাগ। যেকোনো একটায় ট্যাপ করে দেখো কোনটা কী বলছে, আর পরিমাপের ভাষায় তার মানে কী।
যথার্থতা বনাম নির্ভুলতা
ছবিটা হাতে আঁকা মডেল, মাপা চিত্র নয়।
দ্বিতীয় বোর্ডটাই এই অধ্যায়ের সবচেয়ে দরকারি ছবি। পাঠগুলো প্রতিবার প্রায় একই আসছে, অর্থাৎ যন্ত্রটা নির্ভুল; কিন্তু সবগুলোই প্রকৃত মান থেকে একই দিকে সরে আছে, অর্থাৎ যথার্থ নয়। শূন্য ত্রুটিওয়ালা একটা যন্ত্রের চেহারা ঠিক এটাই, আর বারবার মেপে গড় নিলেও এটা যাবে না।
পাঁচটা পাঠ
একই রডের দৈর্ঘ্য পাঁচবার মেপে পাওয়া গেল ৪.৫৩, ৪.৫৩, ৪.৫৪, ৪.৫৩, ৪.৫৪ সেমি। রডটির প্রকৃত দৈর্ঘ্য ৪.৫০ সেমি। পরিমাপটি সম্পর্কে সঠিক মন্তব্য কোনটি?
২. ত্রুটি আসে কোথা থেকে
যান্ত্রিক ত্রুটি হলো সেই ত্রুটি যা দেখা দেয় পরিমাপে ব্যবহৃত যন্ত্র সঠিক বা সুবেদী না হলে। এর চেনা উপভেদ তিনটা: শূন্য ত্রুটি, যেখানে যন্ত্রের শূন্য দাগ মেলে না; পিছট ত্রুটি, যেখানে স্ক্রুর খাঁজে ক্ষয় ধরায় দিক উল্টালে ফাঁক থেকে যায়; আর লেভেল ত্রুটি, যেখানে যন্ত্রটা সমতলে বসানো নেই, যেমন হেলানো টেবিলে রাখা তুলা।
ব্যক্তিগত বা পর্যবেক্ষণজনিত ত্রুটি হলো পর্যবেক্ষকের ভুল পর্যবেক্ষণ বা সঠিক মূল্যায়নের অভাবে হওয়া ত্রুটি। এর মধ্যে সবচেয়ে চেনা লম্বন ত্রুটি, যেখানে চোখ দাগের ঠিক উপরে না থাকায় পাঠ সরে যায়। আর আছে প্রান্ত দাগ ত্রুটি, যেখানে স্কেলের শূন্য প্রান্ত ক্ষয়ে গেছে অথচ সেখান থেকেই মাপা হচ্ছে।
দৈব বা এলোমেলো ত্রুটি হলো সেই ত্রুটি যার জন্য একই বস্তু বারবার মাপলেও প্রতিবার একটু আলাদা মান আসে। তাপমাত্রা, বাতাস, হাতের চাপ, চোখের ক্লান্তি, সবই একটু করে বদলায়। এর প্রতিকার একটাই: বহুবার মেপে গড় নেওয়া।
বারোটা পরিস্থিতি নিচে। কোনটা কার দোষে, নিজে ভাগ করো।
ত্রুটিটা কার দোষে?
এই তিনটার আড়াআড়ি আরেকটা ভাগ আছে, আর পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি এটাই জিজ্ঞাসা করা হয়। নিয়মিত ত্রুটি সেটাই যেখানে পরিমাপলব্ধ মান প্রতিবারই প্রকৃত মানের চেয়ে বেশি, অথবা প্রতিবারই কম, অর্থাৎ একই দিকে। শূন্য ত্রুটি এর সবচেয়ে চেনা উদাহরণ। উল্টোদিকে দৈব ত্রুটি এলোমেলো, কখনো বেশি কখনো কম। পার্থক্যটা জরুরি, কারণ প্রতিকার দুরকম: দৈব ত্রুটি বহুবার মাপলে উপরে-নিচে কাটাকাটি হয়ে যায়, আর নিয়মিত ত্রুটি যতবারই মাপো, কাটাকাটি হয় না।
৩. লম্বন ত্রুটি
লম্বন ত্রুটি সেই একটা ত্রুটি যেটা প্রায় সবাই রোজ করে অথচ কখনো টের পায় না। বস্তুর প্রান্ত যদি স্কেলের গা থেকে সামান্য উঁচুতে থাকে আর তোমার চোখ থাকে তেরছা, তবে দৃষ্টিরেখাটা স্কেলের উপর অন্য জায়গায় গিয়ে পড়ে। বস্তুটা একটুও নড়েনি, তবু পাঠ বদলে গেছে। হাতল টেনে চোখ সরিয়ে দেখো।
চোখ কোথায়?
ছবিটা হাতে আঁকা মডেল, মাপা চিত্র নয়।
প্রতিকার সহজ, আর এটাই ব্যবহারিক খাতায় লিখতে হয়: চোখ সব সময় দাগের ঠিক উপরে, স্কেলের উপর লম্বভাবে রাখো। ভালো যন্ত্রে এজন্যই দাগের পাশে আয়না বসানো থাকে, যাতে চোখের প্রতিবিম্ব দাগের পেছনে ঢাকা পড়লে বুঝতে পারো দৃষ্টিরেখা ঠিক লম্ব হয়েছে।
৪. শূন্য ত্রুটি কেন গড়ে যায় না
আগের দুটো নোটে শূন্য ত্রুটির নিয়মটা এক লাইনে বলা হয়েছিল: ধনাত্মক হলে বিয়োগ, ঋণাত্মক হলে যোগ। এখন কারণটা দেখা যাক। হাতল টেনে দুটো অবস্থা পাশাপাশি রাখো: বাঁয়ে যন্ত্রটা বন্ধ, ডানে সেই একই যন্ত্রে বস্তু মাপা।
শূন্য ত্রুটি: বন্ধ আর মাপার সময়
ছবিটা হাতে আঁকা মডেল, মাপা চিত্র নয়।
কারণটা এখন পরিষ্কার। গড় নেওয়া কাজ করে তখনই, যখন ভুলগুলো কখনো এদিকে কখনো ওদিকে যায়, কারণ তখন যোগ করলে কাটাকাটি হয়ে যায়। কিন্তু শূন্য ত্রুটি প্রতিটা পাঠে একই পরিমাণে একই দিকে, তাই যোগ করলে কাটাকাটি নয়, জমা হয়। একশোটা পাঠের গড়েও ওই ০.৩ মিমি অবিকল থেকে যাবে।
কোনটা গড়ে যাবে না
নিচের কোন ত্রুটিটি বহুবার পরিমাপ করে গড় নিলেও দূর হবে না?
৫. ত্রুটিটা কত বড়
ত্রুটি আছে বললেই যথেষ্ট নয়, কত আছে সেটাও বলা দরকার, আর তার তিনটা মাপ আছে। পরম ত্রুটি = |পরিমাপলব্ধ মান − প্রকৃত মান|। আপেক্ষিক ত্রুটি = পরম ত্রুটি ÷ প্রকৃত মান। আর শতকরা ত্রুটি = আপেক্ষিক ত্রুটি × ১০০%।
কেন তিনটা লাগে? কারণ ৫০ সেমি-তে ১.২ সেমি ভুল আর ০.৫ সেমি-তে ১.২ সেমি ভুল মোটেও এক জিনিস নয়, অথচ দুটোর পরম ত্রুটি একই। ঘরগুলোয় মান বদলে দেখো।
পরম, আপেক্ষিক ও শতকরা ত্রুটি
আর একটা ব্যাপার জানা দরকার: একটা মাপের ত্রুটি সেখানেই থেমে থাকে না। সেই মাপ দিয়ে যা কিছু হিসাব করবে, সবেতেই ছড়িয়ে পড়ে, আর বেশিরভাগ সময় বড় হয়ে। নিচের ঘরে ট্যাপ করে দেখো।
ত্রুটি কীভাবে ছড়ায়
| দৈর্ঘ্যে ত্রুটি | দৈর্ঘ্য | ক্ষেত্রফল (L²) | আয়তন (L³) |
|---|---|---|---|
| ১% | ১% | ২% | ৩% |
| ২% | ২% | ৪% | ৬% |
| ৫% | ৫% | ১০% | ১৫% |
| ১০% | ১০% | ২০% | ৩০% |
এই গুণিতকের নিয়মটা আনুমানিক, ছোট ত্রুটির জন্য ভালো কাজ করে।
নিয়মটা সহজ: রাশিটার সূত্রে দৈর্ঘ্যের ঘাত যত, শতকরা ত্রুটিও তত গুণ। তাই ঘনক বা বেলনের আয়তন বের করার কাজে দৈর্ঘ্যটাই সবচেয়ে সূক্ষ্ম যন্ত্রে, সবচেয়ে বেশি যত্নে মাপতে হয়।
ঘনকের আয়তন
একটি ঘনকের বাহু মাপতে ৫% ত্রুটি হলে এর আয়তনে ত্রুটি প্রায় কত হবে?
৬. ত্রুটি কমানোর তালিকা
পুরো অধ্যায়ের ব্যবহারিক সারমর্ম ছয় লাইনে। শূন্য ত্রুটি আগে দেখে নাও আর সংশোধন বসাও। চোখ দাগের ঠিক লম্বভাবে রাখো। স্কেলের ক্ষয়া প্রান্ত বাদ দিয়ে ১ সেমি দাগ থেকে মেপে পরে বিয়োগ করে নাও। স্ক্রু সব সময় একই দিকে ঘুরিয়ে পাঠ নাও। কমপক্ষে তিনবার মেপে গড় নাও। আর কাজের উপযোগী সবচেয়ে সূক্ষ্ম যন্ত্রটাই বেছে নাও।
আর শেষ কথাটা এই অধ্যায়ের আসল শিক্ষা। কোনো পরিমাপই নিখুঁত নয়, তাই নিখুঁত হওয়ার ভান করাটাই সবচেয়ে বড় ভুল। যতটুকু ত্রুটি থেকে যায়, সেটা জানিয়ে দেওয়াই সততা, আর সেটাই বিজ্ঞান।
এই অধ্যায়ের বোর্ড প্রশ্ন, উত্তর ও ব্যাখ্যা সহ →
সূত্র: পদার্থবিজ্ঞান, নবম-দশম শ্রেণি (এনসিটিবি), অধ্যায় ১ “ভৌত রাশি ও পরিমাপ”, পরিমাপের ত্রুটি ও যথার্থতা অনুচ্ছেদ।