পদার্থবিজ্ঞান · নবম-দশম · অধ্যায় ১ · ভৌত রাশি ও পরিমাপ
মাত্রা।
আগের নোটে গুনে দেখেছিলে কোন লব্ধ রাশিতে দৈর্ঘ্য, ভর আর সময় কতবার লাগে। ওই ঘাতগুলোরই একটা নাম আছে, মাত্রা। নামটা জানার পর একটা নতুন ক্ষমতা পাওয়া যায়: একটাও সংখ্যা না বসিয়ে বলে দেওয়া যায় কোনো সূত্র ভুল।
১. সংজ্ঞা ও প্রতীক
কোনো ভৌত রাশিতে উপস্থিত মৌলিক রাশিগুলোর সূচক বা ঘাতকে ওই রাশিটির মাত্রা বলে। মাত্রা লেখা হয় তৃতীয় বন্ধনীর ভেতরে। দৈর্ঘ্যের মাত্রা [L], ভরের [M], সময়ের [T], তড়িৎ প্রবাহের [I], তাপমাত্রার [θ]। নবম-দশমের প্রায় সব কাজ M, L আর T দিয়েই হয়ে যায়।
একটা পার্থক্য গোড়াতেই পরিষ্কার করে নাও: মাত্রা আর একক এক জিনিস নয়। ২ m, ২০০ cm আর ৭.৮ ফুট, তিনটার একক তিন রকম, কিন্তু মাত্রা একটাই, [L]। মাত্রা বলে দেয় রাশিটা কী ধরনের, আর একক বলে দেয় কোন মাপকাঠিতে মাপা হয়েছে।
বের করার পদ্ধতিটাও সোজা। রাশিটার সংজ্ঞার সূত্রটা লেখো, তারপর প্রতিটা রাশির জায়গায় তার মাত্রা বসিয়ে দাও। বেগ = সরণ ÷ সময়, তাই [v] = [L] ÷ [T] = [LT⁻¹]। মুখস্থ করার কিছু নেই, প্রতিবার বানিয়ে নেওয়া যায়।
২. চেনা টেবিলটা, এবার নাম নিয়ে
নিচের ছকটা আগের নোটে একবার দেখেছ। তখন সেটা ছিল শুধু গোনার কাজ: কোন মৌলিক রাশি কতবার লাগছে। এখন সেই একই সংখ্যাগুলোর নাম আছে, মাত্রা। নতুন কিছু শিখতে হচ্ছে না, শুধু চেনা জিনিসটা তার নামে ডাকা হচ্ছে।
ছকসারিতে ট্যাপ করো
মাত্রার টেবিল
রাশি
[M]
[L]
[T]
ক্ষেত্রফল
০
২
০
আয়তন
০
৩
০
বেগ
০
১
−১
ত্বরণ
০
১
−২
বল
১
১
−২
ভরবেগ
১
১
−১
কাজ
১
২
−২
ক্ষমতা
১
২
−৩
চাপ
১
−১
−২
ঘনত্ব
১
−৩
০
ক্ষেত্রফল = দৈর্ঘ্য × প্রস্থ, তাই [L][L] = [L²]।
আয়তন = দৈর্ঘ্য × প্রস্থ × উচ্চতা, তাই [L³]।
বেগ = সরণ ÷ সময়, তাই [L] ÷ [T] = [LT⁻¹]।
ত্বরণ = বেগের পরিবর্তন ÷ সময়, তাই [LT⁻¹] ÷ [T] = [LT⁻²]।
বল = ভর × ত্বরণ, তাই [M][LT⁻²] = [MLT⁻²]।
ভরবেগ = ভর × বেগ, তাই [M][LT⁻¹] = [MLT⁻¹]। বলের চেয়ে T-এর ঘাত এক কম।
কাজ = বল × সরণ, তাই [MLT⁻²][L] = [ML²T⁻²]।
ক্ষমতা = কাজ ÷ সময়, তাই [ML²T⁻²] ÷ [T] = [ML²T⁻³]।
চাপ = বল ÷ ক্ষেত্রফল, তাই [MLT⁻²] ÷ [L²] = [ML⁻¹T⁻²]। খেয়াল করো L-এর ঘাত ১ − ২ = −১ হয়ে গেল।
ঘনত্ব = ভর ÷ আয়তন, তাই [M] ÷ [L³] = [ML⁻³]।
টেবিলটা মুখস্থ করার দরকার নেই, কারণ প্রতিটা সারি সংজ্ঞার সূত্র থেকে দুই ধাপে বের করা যায়। নিচে ক্ষমতার মাত্রা চার ধাপে বের করে দেখানো হলো, আর খেয়াল করো কাজটা কোন দিক থেকে হচ্ছে।
ধাপে ধাপেধাপে ধাপে এগোও
ক্ষমতার মাত্রা চার ধাপে
ধাপ ১। সংজ্ঞা দিয়ে শুরু করো: ক্ষমতা = কাজ ÷ সময়। অর্থাৎ ক্ষমতার মাত্রা জানতে হলে আগে কাজের মাত্রা লাগবে।
ধাপ ২। কাজ = বল × সরণ, তাই আগে বলের মাত্রা দরকার। বল = ভর × ত্বরণ, আর ত্বরণ [LT⁻²]। তাই [F] = [M][LT⁻²] = [MLT⁻²]।
ধাপ ৩। এবার কাজ: [W] = [MLT⁻²] × [L] = [ML²T⁻²]। দৈর্ঘ্যের ঘাত এক বেড়ে ২ হলো।
ধাপ ৪। শেষে সময় দিয়ে ভাগ: [P] = [ML²T⁻²] ÷ [T] = [ML²T⁻³]। এটাই ক্ষমতার মাত্রা।
লক্ষ করো কাজটা একদিক থেকে হয়নি, উল্টো দিক থেকে হয়েছে। ক্ষমতা জানতে কাজ লাগল, কাজ জানতে বল লাগল, বল জানতে ত্বরণ লাগল। যেকোনো লব্ধ রাশির মাত্রা বের করার কায়দা এটাই: যতক্ষণ না মৌলিক রাশিতে পৌঁছাও, ভাঙতে থাকো।
উল্টো দিক থেকেও পড়া যায়: মাত্রা তিনটা ঠিক করে দিলে কোন রাশি বেরোয়? নিচের ঘরগুলোয় M, L আর T-এর ঘাত বদলে দেখো। কিছু সমন্বয়ে চেনা রাশি বেরিয়ে আসবে, কিছুতে কিছুই না, আর সেটাও একটা উত্তর।
উল্টো দিক থেকেঘাত বদলাও
মাত্রা বানাও
৩. একই মাত্রা মানে একই জাত
দুটো রাশির নাম আলাদা হলেও মাত্রা এক হতে পারে, আর তখন বুঝতে হবে দুটো আসলে একই জাতের জিনিস। ওজন একটা বল, তারের টানও একটা বল, ঘর্ষণও একটা বল, তাই তিনটারই মাত্রা [MLT⁻²]। একইভাবে কাজ, শক্তি আর তাপ তিনটারই মাত্রা [ML²T⁻²], আর এটাই বলে দেয় তিনটা আসলে শক্তিরই তিন চেহারা।
ভাগ করোচিপ, তারপর বাক্স
একই মাত্রার রাশি এক ঘরে
একটা রাশি ধরো, তারপর তার মাত্রার বাক্সে ছাড়ো।
ঠিক। পরেরটা।
এটা এখানে না। ভাবো রাশিটা আসলে কী: একটা বল, একটা শক্তি, না একটা দ্রুতি?
নাম আলাদা হলেও মাত্রা এক হলে রাশিগুলো একই জাতের। ওজন আসলে একটা বল, টানও একটা বল, তাই দুটোই [MLT⁻²]। তবে সাবধান: মাত্রা এক হওয়া মানেই রাশি এক হওয়া নয়। কাজ আর তাপের মাত্রা এক, কিন্তু কাজ তাপ নয়।
মিলিয়ে দেখোএকটা উত্তর বেছে নাও
কোন দুটোর মাত্রা এক
কোন দুটি রাশির মাত্রা একই?
ঠিক। কাজ, শক্তি আর তাপ, তিনটারই মাত্রা [ML²T⁻²], কারণ তিনটাই আসলে শক্তির ভিন্ন ভিন্ন চেহারা।
চাপ = বল ÷ ক্ষেত্রফল, তাই চাপে L-এর ঘাত বলের চেয়ে ২ কম। বল [MLT⁻²], চাপ [ML⁻¹T⁻²]।
এই দুটো গুলিয়ে ফেলাই সবচেয়ে সাধারণ ভুল। ভর একটা মৌলিক রাশি, মাত্রা [M]। ওজন একটা বল, মাত্রা [MLT⁻²]।
ত্বরণে সময়ের ঘাত বেগের চেয়ে এক বেশি। বেগ [LT⁻¹], ত্বরণ [LT⁻²]।
৪. যাদের কোনো মাত্রা নেই
সংখ্যার কোনো মাত্রা নেই। ২, π, ½, যেকোনো ধ্রুবক সংখ্যা, এদের মাত্রা [M⁰L⁰T⁰]। তাই s = ut + ½at² সূত্রে ½ থাকলেও মাত্রার হিসাবে সেটা একেবারে বাদ পড়ে যায়। একই কারণে কিছু রাশিরও মাত্রা থাকে না, আর তাদের মধ্যে একটা প্যাটার্ন আছে: এরা প্রায় সবাই একই জাতের দুটো জিনিসের অনুপাত।
আছে না নেইচিপে ট্যাপ করো
এর মাত্রা আছে কি?
মাত্রাহীন। কোণ = চাপ ÷ ব্যাসার্ধ = [L] ÷ [L] = [M⁰L⁰T⁰]। রেডিয়ান আসলে একটা অনুপাত, তাই একক থাকলেও মাত্রা নেই।
মাত্রাহীন। μ = ঘর্ষণ বল ÷ অভিলম্ব বল, অর্থাৎ বল ÷ বল। উপরে-নিচে একই জিনিস, তাই সব কেটে যায়।
মাত্রাহীন। বস্তুর ঘনত্ব ÷ পানির ঘনত্ব। আবার সেই একই জাতের দুটো জিনিসের অনুপাত।
মাত্রাহীন। দুই মাধ্যমে আলোর দ্রুতির অনুপাত, তাই [LT⁻¹] ÷ [LT⁻¹]।
মাত্রাহীন। এটা তো শুধু একটা সংখ্যা। যেকোনো ধ্রুবক সংখ্যার মাত্রা [M⁰L⁰T⁰], আর ঠিক এই কারণেই মাত্রা দিয়ে ½ বা ২π ধরা যায় না।
মাত্রাহীন। বিকৃতি = দৈর্ঘ্যের পরিবর্তন ÷ মূল দৈর্ঘ্য = [L] ÷ [L]।
মাত্রা আছে: [ML²T⁻²]। কাজ = বল × সরণ, আর দুটোরই মাত্রা আছে, তাই গুণফলেরও আছে।
মাত্রা আছে: [T⁻¹]। প্রতি সেকেন্ডে কতবার, তাই সময়ের ঘাত −১। উপরে কিছুই নেই বলে M আর L-এর ঘাত ০।
মাত্রা আছে: [ML⁻³]। ভর ÷ আয়তন। উপরে ভর, নিচে দৈর্ঘ্যের ঘন, দুটো আলাদা জাতের জিনিস, তাই কাটাকাটি হয় না।
মাত্রা আছে: [LT⁻²]। এখানেই ফাঁদটা। g একটা ধ্রুবক বলে অনেকে ভাবে এর মাত্রা নেই, কিন্তু g একটা ত্বরণ, আর ত্বরণের মাত্রা [LT⁻²]। ধ্রুবক হওয়া আর মাত্রাহীন হওয়া এক কথা নয়।
দশটাই দেখা হলো। প্যাটার্নটা ধরতে পেরেছ? যে রাশিটা একই জাতের দুটো জিনিসের অনুপাত, সেটাই মাত্রাহীন।
৫. আসল কাজ: ভুল ধরা
মাত্রার সবচেয়ে কাজের ব্যবহারটা হলো সূত্র যাচাই করা, আর নিয়মটা একটাই: কোনো সঠিক ভৌত সমীকরণের দুই পাশের মাত্রা সমান হতেই হবে। সেই সঙ্গে যোগ-বিয়োগ কেবল একই মাত্রার রাশির মধ্যেই সম্ভব। বেগের সঙ্গে সময় যোগ করা যায় না, ঠিক যেমন ৫ টাকা আর ৫ কেজি যোগ করা যায় না। এই নিয়মটার নাম সমমাত্রিকতার নীতি (principle of homogeneity)।
নিচে আটটা সূত্র আছে, কয়েকটা ঠিক আর কয়েকটা ভুল। একটায় ট্যাপ করলে দুই পাশের মাত্রা ভেঙে দেখানো হবে। ভুল হলে যে পদটা বেমানান সেটা লাল হয়ে ধরা পড়বে।
পাস না ফেলএকটা সূত্রে ট্যাপ করো
মাত্রা পরীক্ষা
দোলকের সূত্রটা তুমি পরে পড়বে, এখানে শুধু মাত্রা যাচাইয়ের উদাহরণ হিসেবে আছে। খেয়াল করো, সূত্রটা মনে না থাকলেও মাত্রা দেখে বলে দেওয়া যায় ভেতরের ভাগটা উল্টো হয়ে গেছে কিনা। এটাই মাত্রার শক্তি: সূত্র মনে না থাকলেও ভুলটা ধরা যায়।
মিলিয়ে দেখোএকটা উত্তর বেছে নাও
সূত্রটা যাচাই করো
একজন শিক্ষার্থী লিখল s = vt²। মাত্রা পরীক্ষা করলে কী পাওয়া যাবে?
ঠিক। ডান পাশ = [LT⁻¹] × [T²] = [LT]। বাম পাশ [L]। সময়ের একটা বাড়তি ঘাত রয়ে গেছে, তাই সূত্রটা নিশ্চিতভাবে ভুল; সঠিকটা s = vt।
মেলে না। t² থেকে [T²] আসে, আর বেগের [T⁻¹]-এর সঙ্গে মিলে দাঁড়ায় [T¹], অথচ বাম পাশে সময় নেই।
[LT⁻¹] হলো শুধু v-এর মাত্রা। t²-এর [T²] গুণ করতে ভুলে গেলে এই উত্তরটাই আসে।
যাচাই করা যায়, আর ঠিক এই কাজটাই মাত্রার সবচেয়ে বড় ব্যবহার। একটাও সংখ্যা না বসিয়ে সূত্রটা বাতিল করা গেল।
৬. মাত্রা যা পারে না
মাত্রার তিনটে ব্যবহার আছে: সমীকরণ ঠিক কিনা যাচাই করা, এক পদ্ধতির একক থেকে আরেক পদ্ধতিতে রূপান্তর, আর রাশিগুলোর মধ্যে সম্পর্ক বের করা। কিন্তু একটা সীমাবদ্ধতা আছে, আর সেটা না জানলে বড় ভুল হয়।
s = ut + ½at² আর s = ut + at², দুটোরই মাত্রা হুবহু মেলে, কারণ ½-এর মাত্রা [M⁰L⁰T⁰]। অথচ সঠিক একটাই। অর্থাৎ মাত্রা দিয়ে একটা সূত্র বাতিল করা যায়, পাস করানো যায় না। মাত্রা না মিললে সূত্র নিশ্চিত ভুল; মিললে শুধু এটুকু বোঝা যায় যে সূত্রটা ভুল হওয়ার একটা সহজ কারণ অন্তত নেই।
মিলিয়ে দেখোএকটা উত্তর বেছে নাও
কেন সব সময় খাটে না
“মাত্রা মিলে গেলেই সূত্রটি সঠিক” কথাটি কেন সব সময় খাটে না?
ঠিক। s = ut + ½at² আর s = ut + at², দুটোরই মাত্রা হুবহু মেলে কারণ ½-এর মাত্রা [M⁰L⁰T⁰]। কিন্তু সঠিক একটাই।
মাত্রা সব রাশির ক্ষেত্রেই কাজ করে, শুধু দৈর্ঘ্যে নয়। M, L, T ছাড়াও I আর θ আছে।
কথাটা সত্যি, কিন্তু এটা সীমাবদ্ধতার কারণ নয়। মাত্রাহীন রাশি থাকাটা কোনো সমস্যা নয়; সমস্যা হলো সংখ্যাগত ধ্রুবক ধরা না পড়া।
এটা সরাসরি ভুল। একক বদলালে মাত্রা বদলায় না; m, cm আর ফুট, তিনটারই মাত্রা [L]।