তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি · নবম-দশম · অধ্যায় ১ · তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং আমাদের বাংলাদেশ
ই-কমার্স ও বাংলাদেশ।
দোকানে গিয়ে কিছু কেনার সময় একটা ব্যাপার এত স্বাভাবিক যে চোখেই পড়ে না: জিনিসটা হাতে নিয়ে দেখে তারপর টাকা দাও। অনলাইনে এই ক্রমটা প্রায়ই উল্টে যায়, আর ই-কমার্সের সব সুবিধা ও সব ঝুঁকি ওই একটা উল্টে যাওয়ার ভিতরে।
১. সংজ্ঞা, আর একটা অর্ডারের যাত্রা
কম্পিউটার বা ইন্টারনেট ব্যবহার করে পণ্য ও সেবা কেনাবেচা করার পদ্ধতিকে বলে ই-কমার্স। পূর্ণরূপ Electronic Commerce। সংজ্ঞাটায় দুটো শব্দ আছে যা প্রায়ই চোখ এড়িয়ে যায়: পণ্য আর সেবা। বই কেনা ই-কমার্স, আর ট্রেনের টিকিট কেনাও ই-কমার্স, যদিও টিকিট কোনো জিনিস নয়।
একটা অর্ডার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কয়েকটা ধাপ পেরোয়, আর ধাপগুলো নিজে সাজালে একটা জিনিস চোখে পড়ে যা পড়ে গেলে পড়ে না।
ক্রমসঠিক ক্রমে ট্যাপ করো
একটা অর্ডারের যাত্রা
সবচেয়ে প্রথম কাজটা থেকে শুরু করো।
হ্যাঁ। এরপর কী?
এখনো না। খেয়াল করো, বিক্রেতা নিশ্চিত করা আর পণ্য রওনা হওয়া এক জিনিস নয়।
ঠিক ক্রম। এবার একটা জিনিস খেয়াল করো: যাচাইয়ের ধাপটা সবার শেষে, অথচ পেমেন্টের ধাপটা তিন নম্বরে। এই ফাঁকটাই ই-কমার্সের ঝুঁকির জায়গা। আর ছয় ধাপের প্রতিটিতেই একটা করে রেকর্ড তৈরি হয়: অর্ডার নম্বর, পেমেন্টের প্রমাণ, ডেলিভারির তথ্য। সমস্যা হলে এই রেকর্ডগুলোই তোমার হাতিয়ার, তাই কোনোটা মুছে ফেলো না।
পেমেন্টের ধাপটায় কয়েকটা উপায় থাকে: ক্যাশ অন ডেলিভারি, অর্থাৎ পণ্য হাতে পেয়ে টাকা; মোবাইল ব্যাংকিং; কার্ড; আর ইন্টারনেট ব্যাংকিং। বাংলাদেশে প্রথমটাই সবচেয়ে প্রচলিত, আর তার কারণটা কারিগরি নয়। পণ্য হাতে পেয়ে টাকা দেওয়ার ব্যবস্থায় ক্রেতাকে বিক্রেতার উপর আগে থেকে ভরসা করতে হয় না, আর সেই ভরসার ঘাটতিটাই এই পদ্ধতিকে টিকিয়ে রেখেছে।
২. চারটে ভিত্তি
“ই-কমার্স মানে একটা ওয়েবসাইট”, এই ধারণাটা খুব সাধারণ আর খুব ভুল। ওয়েবসাইট থাকলেও পণ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা না থাকলে শহরের বাইরে বিক্রি হয় না, আর ভরসা না থাকলে একবার ঠকে যাওয়া ক্রেতা আর ফেরে না। সাধারণত চারটে ভিত্তির কথা বলা হয়, আর একটা কম পড়লেই ব্যবসাটা দাঁড়ায় না।
শাখাশাখায় ট্যাপ করো
ই-কমার্সের চার ভিত্তি
ই-কমার্স
পণ্যতালিকা কী বিক্রি হচ্ছে
ছবি ও পরিষ্কার বিবরণ
দাম, আর জিনিসটা আছে কিনা
আগের ক্রেতাদের মতামত
না থাকলে: ক্রেতা বুঝতেই পারে না কী কিনছে
পেমেন্ট ব্যবস্থা টাকা কীভাবে যাবে
ক্যাশ অন ডেলিভারি
মোবাইল ব্যাংকিং
কার্ড ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং
না থাকলে: লেনদেন আটকে যায়, দূরের ক্রেতা হারায়
ডেলিভারি নেটওয়ার্ক পণ্য কীভাবে পৌঁছাবে
কুরিয়ার ও ডাক ব্যবস্থা
ঠিকানা ও ফোন নম্বরের নির্ভুলতা
পথে খোঁজ রাখার ব্যবস্থা
না থাকলে: শহরের বাইরে বিক্রি অসম্ভব
বিশ্বাস ও নিরাপত্তা ভরসা কীভাবে আসবে
ফেরত দেওয়ার নিয়ম
অভিযোগ জানানোর জায়গা
তথ্য ও লেনদেনের নিরাপত্তা
না থাকলে: একবার ঠকলে ক্রেতা আর ফেরে না
চতুর্থ ভিত্তিটা লক্ষ করার মতো, কারণ বাকি তিনটে কারিগরি আর এটা নয়। ওয়েবসাইট বানানো যায়, কুরিয়ার ভাড়া করা যায়, পেমেন্টের ব্যবস্থা কেনা যায়। বিশ্বাস কেনা যায় না, সেটা সময় নিয়ে তৈরি হয় আর এক দিনে ভেঙে যায়।
মিলিয়ে দেখো
একটা প্রশ্ন
বাংলাদেশে “ক্যাশ অন ডেলিভারি” পদ্ধতি এত জনপ্রিয় হওয়ার প্রধান কারণ কী?
পেমেন্টের পদ্ধতি বদলালে জিনিসের দাম বদলায় না। দামের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই।
ডেলিভারির গতি নির্ভর করে কুরিয়ার ও দূরত্বের উপর, পেমেন্টের পদ্ধতির উপর নয়।
ঠিক। চতুর্থ ভিত্তি “বিশ্বাস ও নিরাপত্তা” যেখানে দুর্বল, সেখানে ক্রেতা অগ্রিম টাকা দিতে ভয় পায়। পণ্য হাতে পেয়ে টাকা দেওয়ার ব্যবস্থায় সেই ভরসার ঘাটতিটা পূরণ হয়ে যায়।
উল্টোটা। এই ব্যবস্থায় বিক্রেতার ঝুঁকি বাড়ে, কারণ পণ্য পাঠিয়েও টাকা না পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৩. কে কার কাছে বেচে
লেনদেনের দুই প্রান্তে কারা আছে, তার ভিত্তিতে ই-কমার্সকে সাধারণত কয়েক ভাগে ভাগ করা হয়। নামগুলো সংক্ষিপ্ত রূপে লেখা হয় বলে কঠিন শোনায়, কিন্তু নিয়মটা সহজ: B মানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, C মানে ভোক্তা বা ব্যক্তি, আর মাঝের 2 মানে “to”, অর্থাৎ তির কোন দিকে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারের কাছে হলে সেটা B2G, আর ই-টেন্ডারিং তার উদাহরণ।
ভাগ করোচিপে ট্যাপ, তারপর বিনে ট্যাপ
কে কার কাছে বেচে
একটা চিপ ধরো, তারপর বিনে ছাড়ো। তির কোথা থেকে শুরু, আর কোথায় শেষ?
ঠিক। পরেরটা।
এখানে না। দুই প্রান্তে কে আছে, প্রতিষ্ঠান না ব্যক্তি, সেটা আবার দেখো।
সব ঠিক জায়গায়। নাম তিনটে কঠিন শোনায়, কিন্তু নিয়মটা সহজ: তির যেখান থেকে শুরু আর যেখানে শেষ, সেই দুজন কে। B মানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, C মানে ভোক্তা বা ব্যক্তি।
বাংলাদেশে শেষ ভাগটাই সবচেয়ে বেশি বদলেছে। মোবাইল আর্থিক সেবার বিস্তারে টাকা পাঠানো সহজ হয়ে যাওয়ায় অনলাইনে কেনাবেচা বেড়েছে, আর তার সঙ্গে বেড়েছে একটা নতুন জিনিস: গ্রামের হস্তশিল্প বা কৃষিপণ্য সরাসরি শহরের ক্রেতার কাছে যাচ্ছে, মাঝখানে কোনো দোকান ছাড়াই। অল্প পুঁজিতে শুরু করা যায় বলে তরুণ আর নারী উদ্যোক্তার সংখ্যাও বেড়েছে। পণ্য পৌঁছে দেওয়া আর ফেরত আনার কাজটা নিজেই একটা আলাদা শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৪. যেখানে থামতে হবে
সুবিধার তালিকাটা লম্বা, আর সেটা সত্যি। কিন্তু ঝুঁকির তালিকাটাও সত্যি, আর সেটা বাদ দিলে নোটটা মিথ্যে হয়ে যায়। ছবি আর বাস্তব পণ্যে অমিল হতে পারে, অগ্রিম টাকা দিয়ে পণ্য না-ও আসতে পারে, নকল বা মেয়াদোত্তীর্ণ জিনিস আসতে পারে, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হতে পারে, আর ফেরত দেওয়ার কোনো ব্যবস্থাই না থাকতে পারে।
ভালো খবরটা হলো, বেশিরভাগ প্রতারণা কয়েকটা চেনা সংকেত দিয়ে শুরু হয়। নিচের আটটা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, আর একটাও দেখলে থেমে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
লাল পতাকাপরিস্থিতিতে ট্যাপ করো
কোথায় থামতে হবে
পণ্য দেখার আগেই পুরো টাকা চাওয়া সবচেয়ে সাধারণ ফাঁদ। সম্ভব হলে পণ্য হাতে পেয়ে টাকা দাও; আগে দিতেই হলে বিক্রেতার পরিচয় ও ঠিকানা যাচাই করে নাও।
তাড়াহুড়ো করানো মানেই তোমাকে ভাবার সময় না দেওয়া। যে প্রস্তাব কাল সকালেও ভালো থাকবে না, সেটা আজও ভালো নয়।
ছবি যেকোনো জায়গা থেকে নেওয়া যায়। মাপ, উপাদান, ওজন বা মডেল লেখা না থাকলে হাতে পেয়ে অমিল হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
জিনিস না মিললে কী হবে, সেটা কেনার আগে লেখা থাকতে হবে। না থাকা মানে সমস্যা হলে তোমার হাতে কিছু থাকবে না।
কোনো সৎ বিক্রেতা বা প্রতিষ্ঠান কখনো তোমার ওটিপি বা পিন চাইবে না। এটা চাওয়া মানেই প্রতারণা, কথা এখানেই শেষ।
ফোন নম্বর, ঠিকানা বা অভিযোগের জায়গা না থাকলে বিক্রেতা জবাবদিহির বাইরে। সমস্যা হলে খুঁজে পাওয়াই যাবে না।
প্রতিষ্ঠানের নামে বিক্রি অথচ টাকা যাচ্ছে একজন ব্যক্তির হিসাবে, এই অমিলটা বড় সংকেত। প্রমাণ ছাড়া টাকা পাঠিও না।
সব মতামত যদি একই ধরনের বাক্যে আর প্রায় একই দিনে লেখা হয়, সেগুলো বানানো হতে পারে। ভালো-খারাপ মেশানো মতামতই বরং বিশ্বাসযোগ্য।
আটটাই দেখা হলো। খেয়াল করো, একটাও কারিগরি ব্যাপার নয়; সবগুলোই মনোযোগ দিয়ে পড়ার ব্যাপার। আর পঞ্চমটার কোনো ব্যতিক্রম নেই।
মিলিয়ে দেখো
আরেকটা প্রশ্ন
অনলাইনে কেনাকাটার সময় একটি বার্তায় তোমার কাছে ওটিপি চাওয়া হলো। সবচেয়ে সঠিক কাজ কোনটি?
সৎ বিক্রেতা কখনো ওটিপি চায় না, তাই যে চাইছে সে বিক্রেতা কিনা সেই প্রশ্নটাই অবান্তর হয়ে যায়।
ঠিক। ওটিপি হলো এককালীন গোপন সংখ্যা, যা শুধু তোমার হাতে আসে, যাতে অন্য কেউ তোমার নামে লেনদেন করতে না পারে। কেউ চাইলেই সেখানে থেমে যেতে হবে।
অর্ধেকও নয়। একটা সংখ্যার অংশও অন্যের কাছে গেলে বাকিটা অনুমান করা সহজ হয়ে যায়।
দিয়ে দেওয়ার পর পাসওয়ার্ড বদলেও লাভ নেই, কারণ লেনদেনটা ততক্ষণে হয়ে যাবে। ওটিপির কাজই তাৎক্ষণিক।
নিরাপদ থাকার নিয়মগুলো এক জায়গায় রাখা যাক, কারণ এগুলো পরীক্ষার চেয়েও বেশি কাজে লাগে। যাচাই না করে অগ্রিম টাকা নয়। সম্ভব হলে পণ্য হাতে পেয়ে টাকা। কেনার প্রমাণ ও কথোপকথন রেখে দাও। ঠিকানা ও ফোন ছাড়া বাড়তি ব্যক্তিগত তথ্য দিও না। আর ওটিপি বা পিন কখনো কাউকে বলো না।
মিলিয়ে দেখো
শেষ প্রশ্ন
একজন শিক্ষার্থী তার পুরোনো গাইড বই অনলাইনে আরেকজন শিক্ষার্থীর কাছে বিক্রি করল। এটি কোন ধরনের ই-কমার্স?
B2C হতো যদি বিক্রেতা একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হতো। এখানে বিক্রেতা একজন শিক্ষার্থী।
B2B হতো যদি দুই প্রান্তেই প্রতিষ্ঠান থাকত, যেমন কারখানা থেকে কারখানায় কাঁচামাল।
ঠিক। দুই প্রান্তেই ব্যক্তি, কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নেই, তাই C2C।
B2G হতো যদি এক প্রান্তে সরকার থাকত, যেমন ই-টেন্ডারিংয়ে।
নিচের কার্ডগুলো এই নোট থেকে কাটা।
নোট থেকে কাটাকার্ডে ট্যাপ করো
পাঁচটা কার্ড
প্রশ্নই-কমার্স কাকে বলে?
উত্তরকম্পিউটার বা ইন্টারনেট ব্যবহার করে পণ্য ও সেবা কেনাবেচার পদ্ধতি। পূর্ণরূপ Electronic Commerce।
প্রশ্নচার ভিত্তি কী কী?
উত্তরপণ্যতালিকা, পেমেন্ট ব্যবস্থা, ডেলিভারি নেটওয়ার্ক, আর বিশ্বাস ও নিরাপত্তা।
প্রশ্নB2C, B2B, C2C বলতে কী?
উত্তরপ্রতিষ্ঠান থেকে ক্রেতা, প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিষ্ঠান, আর ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি।
প্রশ্নক্যাশ অন ডেলিভারি এত প্রচলিত কেন?
উত্তরক্রেতাকে আগে থেকে বিক্রেতার উপর ভরসা করতে হয় না। ভরসার ঘাটতিটা এতে পূরণ হয়।
প্রশ্নকেউ ওটিপি চাইলে কী করবে?
উত্তরদেবে না, লেনদেন বন্ধ করবে। সৎ বিক্রেতা কখনো ওটিপি চায় না।