তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি · নবম-দশম · অধ্যায় ১ · তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং আমাদের বাংলাদেশ
ই-লার্নিং ও বাংলাদেশ।
ভালো শিক্ষকের সংখ্যা সীমিত, আর দূরত্ব অনেক। এই দুটো বাক্যের ভিতরেই বাংলাদেশের শিক্ষার সবচেয়ে পুরোনো সমস্যাটা আছে। ই-লার্নিং সমস্যাটার সমাধান নয়, কিন্তু এটা এমন একটা জিনিস পারে যা আগে কেউ পারত না: একজন শিক্ষকের পাঠকে বহুদূরে, বহুবার পৌঁছে দিতে পারে।
১. ই-লার্নিং বলতে ঠিক কী বোঝায়
পাঠদান করার জন্য সিডি-রম, ইন্টারনেট, ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক কিংবা টেলিভিশন চ্যানেল ব্যবহার করার পদ্ধতিকে ই-লার্নিং বলে। পূর্ণরূপ Electronic Learning। সংজ্ঞাটা মনোযোগ দিয়ে পড়ো, কারণ এর ভিতরে চারটে মাধ্যমের নাম আছে, আর তার মধ্যে মাত্র একটা ইন্টারনেট।
এইখানেই সবচেয়ে সাধারণ ভুলটা হয়। শিক্ষার্থীরা ই-লার্নিং শুনলেই অনলাইন ক্লাস ভাবে, তাই “ইন্টারনেট না থাকলে ই-লার্নিং হয় না” বলে বসে। কথাটা সংজ্ঞার সঙ্গেই মেলে না। আর একটা কথা সংজ্ঞাটা বলে না, কিন্তু ভিতরে আছে: ই-লার্নিং শিক্ষককে সরিয়ে দেয় না। এটা শিক্ষকের পাঠটাকে দূরে পৌঁছে দেয়, আর বারবার দেখার সুযোগ করে দেয়।
শাখাশাখায় ট্যাপ করো
ই-লার্নিং-এর তিন মাধ্যম
ই-লার্নিং
ইন্টারনেট-ভিত্তিক ইন্টারনেট লাগে
লাইভ ক্লাস: শিক্ষক ও শিক্ষার্থী একই সময়ে
রেকর্ড করা ভিডিও পাঠ: যখন খুশি, যতবার খুশি
অনলাইন পাঠ্যবস্তু ও প্রশ্নব্যাংক
সম্প্রচার-ভিত্তিক শুধু টিভি বা রেডিও লাগে
শিক্ষামূলক টেলিভিশন চ্যানেলের ক্লাস
বেতারে পাঠ
নির্দিষ্ট সময়ে দেখতে হয়, ফিরিয়ে দেখা যায় না
অফলাইন মাধ্যম ইন্টারনেট ছাড়াই চলে
সিডি-রম ও ডিভিডিতে রাখা পাঠ
স্কুলের নিজস্ব নেটওয়ার্কে রাখা পাঠ্যবস্তু
কম্পিউটারে আগে থেকে নামিয়ে রাখা ভিডিও
লাইভ আর রেকর্ড করা পাঠের মধ্যেও একটা পার্থক্য আছে, আর দুটোরই দাম আছে। লাইভ ক্লাসে সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করা যায়, কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে হাজির থাকতে হয়। রেকর্ড করা পাঠ যখন খুশি দেখা যায়, বারবার দেখা যায়, কিন্তু প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে মেলে না। যে শিক্ষার্থী দিনে কাজ করে সন্ধ্যায় পড়ে, তার জন্য দ্বিতীয়টাই একমাত্র উপায়।
মিলিয়ে দেখো
একটা প্রশ্ন
সংজ্ঞা অনুযায়ী নিচের কোনটি ই-লার্নিং-এর মাধ্যম নয়?
সিডি-রম সংজ্ঞার প্রথম মাধ্যম। ইন্টারনেট ছাড়াই চলে বলে অনেকে ভুলে যায়।
ইন্টারনেট সংজ্ঞার দ্বিতীয় মাধ্যম, আর সবচেয়ে পরিচিতটাও।
ঠিক। সংজ্ঞায় আছে সিডি-রম, ইন্টারনেট, ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক ও টেলিভিশন চ্যানেল, চারটেই ইলেকট্রনিক মাধ্যম। ছাপা বই ইলেকট্রনিক নয়। তবে একই বইয়ের ডিজিটাল সংস্করণ পর্দায় পড়লে সেটা ই-লার্নিং।
টেলিভিশন চ্যানেল সংজ্ঞার চতুর্থ মাধ্যম। শিক্ষামূলক সম্প্রচার এর ভিতরেই পড়ে।
২. একটা অনলাইন ক্লাস যে পথে চলে
অনলাইন ক্লাস জিনিসটা অনেকের কাছে একরকম জাদু: শিক্ষক এক জায়গায়, শিক্ষার্থী আরেক জায়গায়, তবু কথা হচ্ছে। জাদু নেই, পাঁচটা ধাপ আছে। ধাপগুলো দেখলে একটা কথা ধরা পড়ে যেটা এই গোটা নোটের সবচেয়ে কাজের কথা।
ধাপে ধাপেধাপে ধাপে এগোও
একটা অনলাইন ক্লাস যেভাবে চলে
শিক্ষক। শিক্ষক কথা বলছেন। ক্যামেরা ছবি ধরছে, মাইক শব্দ ধরছে। এখানে সবটাই এখনো বাস্তব।
যন্ত্র। কম্পিউটার ছবি ও শব্দকে সংখ্যায় রূপান্তর করে ছোট ছোট প্যাকেটে ভাগ করে। এই রূপান্তর না হলে জিনিসটা তারে পাঠানোই যেত না।
সার্ভার। প্যাকেটগুলো নেটওয়ার্ক দিয়ে সার্ভারে যায়। এক শিক্ষার্থী বা এক হাজার, সার্ভারের কাছে কাজটা একই, শুধু কপি বাড়ে। এটাই ই-লার্নিং-এর আসল শক্তি।
টাওয়ার বা তার। মোবাইল টাওয়ার বা ব্রডব্যান্ডের তার প্যাকেটগুলো শিক্ষার্থীর এলাকা পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। এখানেই সবচেয়ে বেশি বাধা; সংযোগ দুর্বল হলে ছবি আটকে যায়।
পর্দা। শিক্ষার্থীর যন্ত্র সংখ্যাগুলোকে আবার ছবি ও শব্দে ফিরিয়ে আনে। পুরো পথটা লাগে সেকেন্ডের কয়েক ভগ্নাংশ, তাই সরাসরি কথা বলা সম্ভব হয়।
তৃতীয় ধাপটা আবার পড়ো। ক্লাসে একজন শিক্ষার্থী থাকুক বা এক হাজার, শিক্ষকের পরিশ্রম একই। একটা সাধারণ শ্রেণিকক্ষে ষাট জনের বেশি ঢোকে না, আর ঢুকলেও পিছনের সারি কিছু শোনে না। এই এক জায়গাতেই ই-লার্নিং শ্রেণিকক্ষকে ছাড়িয়ে যায়, আর ঠিক এই কারণেই যে বিষয়ে এলাকায় একজনও শিক্ষক নেই, সেই বিষয়ও পড়া সম্ভব হয়।
৩. কী পারে, আর কী পারে না
“ই-লার্নিং সব সমস্যার সমাধান” আর “ই-লার্নিং আসলে কাজেরই না”, দুটোই ভুল কথা, আর দুটোই খুব সহজে বলা যায়। সত্যিটা মাঝামাঝি, কিন্তু মাঝামাঝি জায়গাটা কেউ বলে দিলে মনে থাকে না। নিচের বারোটা কাজ নিজে ভাগ করে দেখো।
ভাগ করোচিপে ট্যাপ, তারপর বিনে ট্যাপ
ই-লার্নিং পারে, পারে না
একটা চিপ ধরো, তারপর বিনে ছাড়ো।
ঠিক। পরেরটা।
এখানে না। ভাবো, এই কাজটা কি পর্দার এপাশে শরীর দিয়ে করতে হয়?
সব ঠিক জায়গায়। খেয়াল করো, ডান পাশের প্রায় সবগুলোই হয় শরীর, নয় সম্পর্ক, নয় সুযোগের ব্যাপার। এই কারণেই বাস্তবে শ্রেণিকক্ষ আর অনলাইন মিলিয়ে পড়ানোই সবচেয়ে কাজে দেয়।
তাই বাস্তবে যেটা সবচেয়ে কাজে দেয় সেটা কোনো একটা নয়, দুটোর মিশ্রণ। শ্রেণিকক্ষ ও অনলাইন মিলিয়ে পড়ানো, যেখানে ব্যবহারিক আর আলোচনা ক্লাসে হয়, আর তত্ত্ব ও পুনরাবৃত্তি অনলাইনে। একই কথা আরেকভাবে বলা যায়: কোন পাঠ কোন মাধ্যমে ভালো হয়, সেটা বিষয়ভেদে আলাদা।
পাঠের ধরনপাঠের ধরনে ট্যাপ করো
কোন পাঠ কোন মাধ্যমে ভালো
শ্রেণিকক্ষে। যন্ত্রপাতি ধরা, মাপা, ভুল করে আবার করা, এই অভিজ্ঞতা ভিডিওতে পাওয়া যায় না। তবে পরীক্ষার আগে পদ্ধতিটা ভিডিওতে দেখে নিলে ল্যাবের সময় কম নষ্ট হয়।
দুটো মিলিয়ে। নিয়ম বোঝার ভিডিও যতবার খুশি দেখা যায়, কিন্তু নিজের ভুলটা ঠিক কোথায় হচ্ছে তা ধরিয়ে দিতে একজন শিক্ষক দরকার।
অনলাইনে ভালো কাজ করে। সঠিক উচ্চারণ বারবার শোনা যায়, নিজেরটা রেকর্ড করে মিলিয়ে দেখা যায়। শ্রেণিকক্ষে এতবার শোনার সুযোগ হয় না।
অনলাইনে ভালো কাজ করে। মানচিত্রে ছোট করে বড় করে দেখা, স্তর বদলে দেখা, কাগজের মানচিত্রে এসব অসম্ভব।
শ্রেণিকক্ষে। কাজ ভাগ করা, তর্ক করা, একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া, এগুলো মানুষের সঙ্গে মানুষের কাজ। অনলাইনে হয়, কিন্তু অনেক কঠিন।
দুটো মিলিয়ে। অনুশীলন ভিডিওতে রেকর্ড করে নিজের ভুল ধরা যায়, কিন্তু আসল পরীক্ষা হলো সামনে মানুষ রেখে বলতে পারা।
অনলাইনে ভালো কাজ করে। সময়রেখা, মানচিত্র আর পুরোনো ছবি একসঙ্গে দেখানো যায়, বইয়ের পাতায় সেটা সম্ভব নয়।
সাতটাই দেখা হলো। তিনটে অনলাইনে, দুটো শ্রেণিকক্ষে, দুটো মিলিয়ে। এই ভাগটাই মিশ্র পদ্ধতির যুক্তি।
৪. সময়টা কোথায় যায়
“সময় বাঁচে” কথাটা সব জায়গায় লেখা থাকে, কিন্তু কতটা বাঁচে তা কেউ হিসাব করে না। নিচে নিজের বাস্তব দূরত্ব বসিয়ে দেখো। ধরো একটা অতিরিক্ত ক্লাসে যেতে হতো, এখন সেটা অনলাইনে হচ্ছে; শুধু যাতায়াত আর অপেক্ষার সময়টুকু হিসাব করা হচ্ছে।
হিসাব যন্ত্রমান বদলে দেখো
সময়ের হিসাব
হিসাবটা তোমার বসানো সংখ্যা থেকে, বইয়ের কোনো তথ্য নয়।
যা লিখছ তা কোথাও যাচ্ছে না। খাতাটা তোমার।
সংখ্যাটা দেখার পর একটা কথা যোগ করা দরকার, নাহলে হিসাবটা অসম্পূর্ণ থাকে: বাঁচানো সময়টা কাজে না লাগালে সেটা বাঁচানো নয়। যাতায়াতের ক্লান্তি যেমন সত্যি, তেমনি সত্যি হলো পর্দার সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকার ক্ষতি। ই-লার্নিং-এর সীমাবদ্ধতার তালিকায় এটাও একটা।
মিলিয়ে দেখো
আরেকটা প্রশ্ন
সোহাগের বাড়ি থেকে অতিরিক্ত ক্লাসে যেতে এক দিকে ২৫ মিনিট লাগত, আর প্রতিদিন অপেক্ষায় যেত ১০ মিনিট। সপ্তাহে ৫ দিন যেতে হতো। ক্লাসটি অনলাইনে হওয়ায় চার সপ্তাহে তার কত ঘণ্টা বাঁচল?
যাতায়াত দুই দিকেই হয়। এক দিকের ২৫ মিনিটকে ২ দিয়ে গুণ করতে ভুলো না।
ঠিক। দৈনিক বাঁচে (২ × ২৫) + ১০ = ৬০ মিনিট, অর্থাৎ ১ ঘণ্টা। সপ্তাহে ৫ দিন হলে ৫ ঘণ্টা, আর চার সপ্তাহে ৫ × ৪ = ২০ ঘণ্টা।
অপেক্ষার ১০ মিনিট দিনে একবারই, দুইবার নয়। দৈনিক মোট ৬০ মিনিট।
সপ্তাহে ৫ দিন, ৬ দিন নয়। ৫ ঘণ্টা করে চার সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা।
৫. বাংলাদেশে এটা কোথায় দাঁড়িয়েছে
বাংলাদেশে ই-লার্নিং কাগজের প্রস্তাব নয়। বহু বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ বসেছে, যেখানে পাঠ পর্দায় দেখিয়ে পড়ানো হয়। শিক্ষকদের জন্য একটা সরকারি অনলাইন বাতায়ন আছে, যেখানে শিক্ষকেরা নিজেরাই পাঠ্যবস্তু বানিয়ে একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নেন। শিক্ষামূলক টেলিভিশন সম্প্রচার হয়েছে, আর পাঠ্যবইয়ের ডিজিটাল সংস্করণও এখন পাওয়া যায়।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা হয়েছে তাদের জন্য, যাদের কথা তালিকায় শেষে আসে: দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থী, শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে যারা স্কুলে যেতে পারে না, আর যারা কাজের সঙ্গে পড়া চালিয়ে যাচ্ছে। এদের জন্য ই-লার্নিং সুবিধা নয়, একমাত্র দরজা। আর ঠিক এই কারণেই যাদের ডিভাইস নেই বা যেখানে বিদ্যুৎ অনিয়মিত, তাদের বাদ পড়াটা শুধু অসুবিধা নয়, ফাঁক।
মিলিয়ে দেখো
শেষ প্রশ্ন
একটি বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ থাকে, কম্পিউটার আছে, কিন্তু ইন্টারনেট সংযোগ নেই। তারা কোন উপায়ে ই-লার্নিং চালু করতে পারে?
সংজ্ঞাটা আবার পড়ো। সিডি-রম আর ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক, দুটোই সংজ্ঞার ভিতরে, আর দুটোই ইন্টারনেট ছাড়া চলে।
ঠিক। সংজ্ঞাতেই সিডি-রম ও ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক আছে, দুটোই ইন্টারনেট ছাড়া চলে। একবার পাঠ্যবস্তু কম্পিউটারে বা স্কুলের নেটওয়ার্কে তুলে রাখলে শিক্ষার্থীরা সেটা যতবার খুশি দেখতে পারে।
ছাপা নোট ইলেকট্রনিক মাধ্যম নয়, তাই এটা ই-লার্নিং নয়। কম্পিউটারগুলো তখন পড়েই থাকবে।
শিক্ষক বাড়ানো ভালো কথা, কিন্তু প্রশ্নটা ছিল বিদ্যমান কম্পিউটারগুলো দিয়ে ই-লার্নিং চালু করার উপায় নিয়ে।
নিচের কার্ডগুলো এই নোট থেকে কাটা।
নোট থেকে কাটাকার্ডে ট্যাপ করো
পাঁচটা কার্ড
প্রশ্নই-লার্নিং কাকে বলে?
উত্তরপাঠদানের জন্য সিডি-রম, ইন্টারনেট, ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক কিংবা টেলিভিশন চ্যানেল ব্যবহার করার পদ্ধতি।
প্রশ্নই-লার্নিং-এর পূর্ণরূপ কী?
উত্তরElectronic Learning।
প্রশ্নইন্টারনেট ছাড়া ই-লার্নিং হয়?
উত্তরহয়। সিডি-রম, ডিভিডি বা স্কুলের নিজস্ব নেটওয়ার্কে পাঠ রাখলেই চলে।
প্রশ্নই-লার্নিং-এর আসল শক্তি কোথায়?
উত্তরএক শিক্ষার্থী হোক বা হাজার, শিক্ষকের পরিশ্রম একই থাকে।
প্রশ্নই-লার্নিং একা কী পারে না?
উত্তরহাতে-কলমে ব্যবহারিক, দলগত কাজ, তদারকি; আর বিদ্যুৎ বা ডিভাইস না থাকলে কিছুই নয়।