খাবার নষ্ট হয় কারণ অণুজীব তাতে বংশবৃদ্ধি করে, আর খাবারের নিজের এনজাইমও তাকে ভাঙতে থাকে। অণুজীবের বাড়তে লাগে তিনটি জিনিস: পানি, উপযুক্ত তাপমাত্রা ও খাদ্য। সংরক্ষণের সব পদ্ধতি এই তিনটির কোনো একটিকে কেড়ে নেয়, ব্যস। এটুকু বুঝলে পদ্ধতিগুলো আর মুখস্থ করতে হয় না।
১. নষ্ট হয় কেন
বাতাসে, হাতে, বাসনে, সর্বত্রই ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও ইস্টের রেণু আছে। খাবার খোলা পড়ে থাকলে তারা এসে বসে, আর অবস্থা অনুকূল হলে বাড়তে শুরু করে।
ধাপে ধাপেপরে বোতাম চাপো
নষ্ট হয় কেন
অণুজীব সবখানেই আছে। বাতাসে, হাতে, বাসনে, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও ইস্টের রেণু সর্বত্র ভাসছে। খাবার খোলা রাখলে এরা এসে বসে। এখানে পর্যন্ত কিছুই নষ্ট হয়নি।
তিনটি জিনিস পেলেই শুরু। বাড়তে হলে অণুজীবের দরকার পানি, উপযুক্ত তাপমাত্রা ও খাদ্য। রুটিতে তিনটিই আছে, তাই কাজ শুরু হয়ে যায়। এই তিনটির নাম মনে রেখো, কারণ সংরক্ষণের প্রতিটি পদ্ধতি এর কোনো একটিকেই কেড়ে নেয়।
সংখ্যা দ্রুত বাড়ে। একটি ব্যাকটেরিয়া ভাগ হয়ে দুটি, দুটি থেকে চারটি; অনুকূল অবস্থায় এই গুণ হওয়া খুব দ্রুত ঘটে। তাই সকালে ঠিক থাকা খাবার সন্ধ্যায় নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
খাবার নষ্ট। অণুজীব খাবারের উপাদান ভেঙে ফেলে, আর ভাঙার উপজাত থেকেই গন্ধ, স্বাদের বদল ও রঙের পরিবর্তন আসে। খাবারের নিজের এনজাইমও এই ভাঙায় অংশ নেয়। এখন প্রশ্ন, চক্রটা কোথায় থামানো যায়? ধাপ দুইয়ে ফিরে যাও: পানি সরিয়ে দাও, তাপমাত্রা নামিয়ে দাও, বা রাসায়নিক দিয়ে অণুজীবকে বাঁচতেই দিয়ো না।
২. পদ্ধতিগুলো
বই পদ্ধতিগুলো এভাবে সাজায়। শুষ্ককরণ: খাদ্য থেকে আর্দ্রতা সরিয়ে দিলে জীবাণু বাড়তে পারে না, এনজাইমও কাজ করতে পারে না; শুঁটকি, শুকনা মরিচ, কিশমিশ, ডাল, শস্যদানা। রেফ্রিজারেশন: শীতল তাপমাত্রায় অণুজীবের বৃদ্ধির গতি কমে যায়, তাই কাঁচা সবজি, ফল ও রান্না করা খাবার স্বল্পমেয়াদে ভালো থাকে। ফ্রিজিং: শূন্য ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার নিচের তাপমাত্রায় রাখা হয়, দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের জন্য; পানি বরফ হয়ে গেলে অণুজীব তা কাজে লাগাতে পারে না। রাসায়নিক সংরক্ষক ও চিনি বা লবণের ঘন দ্রবণ, এই দুটির কথা একটু পরে।
ভাগ করোনীতি দেখে ভাগ করো
কোন পদ্ধতি কী কেড়ে নেয়
একটা চিপ ধরো, তারপর বিনে ছাড়ো। নামটা নয়, কাজের নীতিটা দেখো।
ঠিক। পরেরটা।
এখানে না। প্রশ্নটা হলো, এই পদ্ধতি অণুজীবের তিনটি শর্তের কোনটা কেড়ে নিচ্ছে?
নয়টিই ঠিক। লক্ষ করো, চিনি ও লবণের ঘন দ্রবণ রাসায়নিকের বিনে নয়, পানি সরিয়ে নেওয়ার বিনে। কারণ চিনি বা লবণ অণুজীবকে বিষ দিয়ে মারে না; ঘন দ্রবণে বহিঃঅভিস্রবণের কারণে অণুজীবের কোষ থেকে পানি বেরিয়ে যায় আর সে শুকিয়ে যায়। কাজটা শুঁটকির মতোই, শুধু পদ্ধতিটা আলাদা। আর রেফ্রিজারেশনে অণুজীব মরে না, শুধু ধীর হয়ে যায়; তাই ফ্রিজের খাবারও চিরকাল ভালো থাকে না।
অভিস্রবণ কথাটা এক লাইনে: পাতলা দ্রবণ থেকে ঘন দ্রবণের দিকে পানি চলে যাওয়া। অণুজীবের কোষের বাইরে যদি চিনির বা লবণের ঘন দ্রবণ থাকে, তবে কোষের ভেতরের পানি বাইরে বেরিয়ে আসে; একে বলে বহিঃঅভিস্রবণ। কোষটা শুকিয়ে যায়, আর বাঁচতে বা বাড়তে পারে না। জ্যাম, জেলি, মোরব্বা আর লবণে সংরক্ষিত মাছ এভাবেই টেকে।
আগে ও পরেহাতল টানো
শুষ্ককরণ: কী বদলায়
কাঁচা মাছ
শুঁটকি
শুকানোর সময় খাবার থেকে যায় কেবল পানি; আমিষ, খনিজ আর স্নেহ থেকে যায়। তাই একই ওজনের শুঁটকিতে কাঁচা মাছের চেয়ে বেশি আমিষ থাকে, কারণ পানিটুকু বাদ পড়ায় বাকি সব ঘনীভূত হয়ে গেছে। আর অণুজীব? পানি ছাড়া তারা বাড়তে পারে না, তাই খাবার টেকে। একই নীতিতে শুকনা মরিচ, ডাল ও শস্যদানাও মাসের পর মাস ভালো থাকে।
শুকানোর পর আমিষ ঘনীভূত হওয়ার যুক্তিটি সরল হিসাব থেকে আসে, বইয়ের বাক্য নয়।
৩. সংরক্ষক রাসায়নিক, আর ভেজাল
বইয়ের ১.৪.২ অনুচ্ছেদটি দুটো আলাদা জিনিস পাশাপাশি রাখে, আর সেগুলো গুলিয়ে ফেলাই এখানকার সবচেয়ে বড় ভুল। একদিকে সংরক্ষক রাসায়নিক, যেগুলো নির্দিষ্ট খাবারে নির্দিষ্ট মাত্রায় ব্যবহার করা হয়: ভিনেগার, সোডিয়াম বেনজোয়েট, সোডিয়াম বাইসালফাইট ও পটাশিয়াম মেটা-বাইসালফাইট, আর প্রোপিওনিক ও সরবিক এসিডের লবণ। অন্যদিকে ফরমালিনের মতো পদার্থ, যা বইয়ের ভাষায় খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণের জন্য নিষিদ্ধ। রাসায়নিক শুনলেই ক্ষতিকর নয়; ভিনেগার আর লবণও রাসায়নিক।
পদার্থপদার্থে ট্যাপ করো
কোনটা কী করে
সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়। অ্যাসেটিক এসিডের ৫% দ্রবণ। অম্লতা বাড়িয়ে দেয়, ফলে অণুজীব বাঁচতে পারে না। আচার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, আর এই কারণেই আচার অনেকদিন ভালো থাকে।
সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়। ছত্রাক ও ইস্টের বৃদ্ধি রোধ করে। প্রধানত ফলের রস সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়।
সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়। সালফেটের লবণ। ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীবের বৃদ্ধি প্রতিরোধ করে। সোডিয়াম বাইসালফাইটও একই কাজ করে।
সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়। প্রোপিওনিক এসিডের লবণের সঙ্গে একই দলে। দই, মিষ্টি, পনির ও বেকারির খাবারে ব্যবহৃত হয়।
পদ্ধতি, রাসায়নিক সংরক্ষক নয়। ঘন দ্রবণে বহিঃঅভিস্রবণের কারণে অণুজীবের কোষ থেকে পানি বেরিয়ে যায়, ফলে সে শুকিয়ে যায়। জ্যাম, জেলি ও মোরব্বা এভাবেই টেকে।
পদ্ধতি। খাবার থেকে আর্দ্রতা সরিয়ে দিলে অণুজীব বাড়তে পারে না, খাবারের নিজের এনজাইমও কাজ করতে পারে না। শুঁটকি, শুকনা মরিচ, ডাল, শস্যদানা।
খাদ্যে নিষিদ্ধ। বইয়ের ভাষায়, খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণের জন্য এর ব্যবহার নিষিদ্ধ। তবু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ব্যবহার করে। ফল: বদহজম, পেটের পীড়া, হাঁপানি, যকৃৎ ও বৃক্কের ক্ষতি, এমনকি ক্যান্সারের ঝুঁকি।
খাদ্যে নিষিদ্ধ। ফল কৃত্রিমভাবে দ্রুত পাকাতে ব্যবহৃত হয়, রাইপেন ও ইথিলিনের সঙ্গে একই উদ্দেশ্যে। ফল দেখতে পাকা লাগে, কিন্তু স্বাভাবিকভাবে পাকা নয়, আর এতে জটিল রোগ সৃষ্টি হতে পারে।
আটটিই দেখা হলো। ছয়টি খাবার টিকিয়ে রাখার স্বীকৃত উপায়, দুটি খাদ্যে নিষিদ্ধ। নামের কাঠিন্য কোনো ইঙ্গিত নয়; পটাশিয়াম মেটা-বাইসালফাইট নামটা কঠিন, কিন্তু সেটি সংরক্ষক, আর ফরমালিন নামটা চেনা, কিন্তু সেটি নিষিদ্ধ।
কার্ডকার্ডে ট্যাপ করো
নাম শুনে ভয় নয়
পদার্থফরমালিন
কী করেখাদ্যে নিষিদ্ধ। খাবার দীর্ঘদিন তাজা দেখাতে ব্যবহার করা হয়। ফল: বদহজম, পেটের পীড়া, হাঁপানি, যকৃৎ ও বৃক্কের ক্ষতি, ক্যান্সারের ঝুঁকি।
পদার্থক্যালসিয়াম কার্বাইড
কী করেনিষিদ্ধ। ফল কৃত্রিমভাবে দ্রুত পাকাতে ব্যবহৃত। ফল দেখতে পাকা, ভেতরে নয়, আর জটিল রোগ সৃষ্টি করতে পারে।
পদার্থরাইপেন ও ইথিলিন
কী করেফল দ্রুত পাকানোর রাসায়নিক। প্রাকৃতিকভাবে ফল পাকার সময়ও ইথিলিন তৈরি হয়, কিন্তু বাইরে থেকে অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় প্রয়োগ করলে ঝুঁকি তৈরি হয়।
পদার্থসোডিয়াম বেনজোয়েট
কী করেসংরক্ষক, ভেজাল নয়। ছত্রাক ও ইস্ট রোধ করে, ফলের রস সংরক্ষণে নির্দিষ্ট মাত্রায় ব্যবহৃত হয়।
পদার্থপটাশিয়াম মেটা-বাইসালফাইট
কী করেএটিও সংরক্ষক, ভেজাল নয়। সালফেটের লবণ, ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ঠেকায়।
ছয়টির মধ্যে তিনটি খাবার টিকিয়ে রাখার স্বীকৃত উপায়, তিনটি নয়। নামের কঠিন শোনাটা কোনো ইঙ্গিত নয়।
মিলিয়ে দেখো
একটা প্রশ্ন
জ্যাম ও জেলিতে ঘন চিনির দ্রবণ ব্যবহার করে খাবার সংরক্ষণ করা হয়। এটি কীভাবে কাজ করে?
চিনি বিষ নয়। কাজটা হয় পানি কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে।
ঠিক। বাইরের দ্রবণ ভেতরের চেয়ে ঘন হলে কোষের ভেতরের পানি বাইরে বেরিয়ে আসে; একেই বলে বহিঃঅভিস্রবণ। ফলে অণুজীবের কোষ শুকিয়ে যায় এবং সে বাঁচতে বা বাড়তে পারে না। অর্থাৎ চিনি বিষ হিসেবে নয়, পানি কেড়ে নেওয়ার উপায় হিসেবে কাজ করছে, ঠিক শুঁটকির মতোই, শুধু পদ্ধতিটা আলাদা। লবণের ঘন দ্রবণও একইভাবে কাজ করে।
তাপমাত্রার সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই; সেটা রেফ্রিজারেশন ও ফ্রিজিংয়ের কাজ।
উল্টো হলে তো খাবার আরও দ্রুত নষ্ট হতো। ঘন দ্রবণ পানি কেড়ে নেয়।
মিলিয়ে দেখো
আরেকটা প্রশ্ন
নিচের কোনটি খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণে ব্যবহারের জন্য নিষিদ্ধ?
এটি ফলের রস সংরক্ষণে ব্যবহৃত একটি সংরক্ষক।
ভিনেগার আচারে ব্যবহৃত হয়; অ্যাসেটিক এসিডের ৫% দ্রবণ।
ঠিক। বইয়ের ভাষায়, খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণের জন্য ফরমালিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ। এটি ব্যবহারে বদহজম, পেটের পীড়া, হাঁপানি, যকৃৎ ও বৃক্কের ক্ষতি, এমনকি ক্যান্সারও হতে পারে। বাকি তিনটি, সোডিয়াম বেনজোয়েট (ফলের রসে), ভিনেগার (আচারে) ও পটাশিয়াম মেটা-বাইসালফাইট, নির্দিষ্ট মাত্রায় ব্যবহারযোগ্য সংরক্ষক। মনে রেখো, নামটা কঠিন শোনালেই সেটি ক্ষতিকর নয়।
সালফেটের এই লবণটি ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ঠেকাতে ব্যবহৃত হয়।
মিলিয়ে দেখো
শেষ প্রশ্ন
রেফ্রিজারেটরে রাখা খাবারও কিছুদিন পর নষ্ট হয়ে যায় কেন?
উল্টো। ঠান্ডায় বৃদ্ধির গতি কমে, বাড়ে না।
ঠিক। রেফ্রিজারেশন অণুজীবকে মারে না; শীতল তাপমাত্রায় তাদের বংশবৃদ্ধি ধীর হয়ে যায়, তাই খাবার স্বল্পমেয়াদে ভালো থাকে। ধীরে হলেও বৃদ্ধি চলতেই থাকে, তাই যথেষ্ট সময় পেলে খাবার নষ্ট হবেই। দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের জন্য তাই ফ্রিজিং ব্যবহার করা হয়, শূন্য ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার নিচে, যেখানে পানি বরফ হয়ে যাওয়ায় অণুজীব সেটি কাজেই লাগাতে পারে না।
ঠান্ডা আমিষ ভাঙে না; ভাঙে অণুজীব ও এনজাইম।
নতুন করে তৈরি হয় না; যারা আগে থেকেই ছিল, তারাই ধীরে ধীরে বাড়ে।
এক নজরে
সূত্র। অণুজীবের দরকার পানি, উপযুক্ত তাপমাত্রা ও খাদ্য; প্রতিটি পদ্ধতি এর একটা কেড়ে নেয়।
পদ্ধতি। শুষ্ককরণ, রেফ্রিজারেশন, ফ্রিজিং (০ °F বা নিচে), রাসায়নিক সংরক্ষক, আর চিনি বা লবণের ঘন দ্রবণ।
ঘন দ্রবণ। বহিঃঅভিস্রবণে অণুজীবের কোষ থেকে পানি বেরিয়ে যায়, তাই সে শুকিয়ে যায়।
ভেজাল। ফরমালিন খাদ্যে নিষিদ্ধ; ক্যালসিয়াম কার্বাইড দিয়ে ফল পাকানোও নয়। কিন্তু রাসায়নিক মাত্রেই ক্ষতিকর নয়।
সূত্র: বিজ্ঞান, নবম-দশম শ্রেণি (এনসিটিবি), অধ্যায় ১ “উন্নততর জীবনধারা”, অনুচ্ছেদ ১.৪.১ ও ১.৪.২।