রসায়ন · নবম-দশম · অধ্যায় ১ · রসায়নের ধারণা
রসায়ন কাকে বলে।
বইটা রসায়নকে বিষয়ের তালিকা দিয়ে চেনায় না, তিনটা প্রশ্ন দিয়ে চেনায়: জিনিসটা কী দিয়ে তৈরি, কেমন আচরণ করে, আর কীভাবে বদলে গিয়ে অন্য কিছু হয়ে যায়। এই তিনটা প্রশ্ন একবার হাতে এসে গেলে গোটা বইটা আর বিচ্ছিন্ন তথ্যের স্তূপ থাকে না।
১. ভেজা জানালায় একটা পেরেক
একটা লোহার পেরেক ভেজা জানালার কার্নিশে এক মাস ফেলে রাখো। ফিরে এসে দেখবে সেটা আর চকচকে নেই: বাদামি, খসখসে, জায়গায় জায়গায় খোসা উঠে আসছে। ঘরের আর কিছুই বদলায়নি, শুধু পেরেকটা বদলেছে। এই একটা ঘটনাকে ঘিরেই রসায়নের তিনটা প্রশ্ন করা যায়, আর সেটাই পুরো অধ্যায়ের কাজ।
হাতলটা টেনে দুই অবস্থা পাশাপাশি রাখো। ছবিটায় পেরেক ছাড়া আর যা যা আছে, দুই পাশেই হুবহু এক: একই কার্নিশ, একই পানির ফোঁটা, একই বাতাসের তির। শুধু পেরেকটাই আলাদা।
লোহা থেকে মরিচা
ছবিটা হাতে আঁকা মডেল, মাপা চিত্র নয়।
মরিচা ধরতে দুটোই লাগে, পানি আর বাতাসের অক্সিজেন। শুকনো বাতাসে লোহা বহুদিন চকচকে থাকে, আবার অক্সিজেন সরিয়ে নেওয়া পানিতেও মরিচা ধরে না। তাই ছবিতে পানির ফোঁটা আর বাতাসের তির দুটোই নীল কালিতে: এই দুটোই আসল কারণ।
২. বইয়ের সংজ্ঞা, তিনটা শব্দে
বইটা সংজ্ঞাটা এভাবে লেখে:
বিজ্ঞানের যে শাখায় পদার্থের গঠন, পদার্থের ধর্ম এবং পদার্থের পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করা হয় তাকে রসায়ন বলে।
বাক্যটা লম্বা, কিন্তু ভেতরে আসলে তিনটা শব্দ: গঠন, ধর্ম, পরিবর্তন। বাকিটা ব্যাকরণ। তিনটা শব্দ তিনটা আলাদা প্রশ্ন, আর প্রতিটার উত্তর আলাদা জায়গা থেকে আসে।
গঠন মানে জিনিসটা কী কী দিয়ে তৈরি। পানি হলো হাইড্রোজেন আর অক্সিজেনের যৌগ, সংকেত H₂O। ধর্ম মানে জিনিসটা কেমন আচরণ করে। পানি ০ °C-এ জমে যায়, ১০০ °C-এ ফোটে, আর লবণ তার ভেতরে গলে যায়। পরিবর্তন মানে জিনিসটা অন্য কিছু হয়ে যায় কি না। লোহা, পানি আর বাতাস মিলে মরিচা হয়, Fe₂O₃·nH₂O, আর সেই মরিচা আর লোহা নয়।
সংজ্ঞাটা মুখস্থ করে ফেলা সহজ, ব্যবহার করা কঠিন। নিচের বাক্যগুলোর প্রতিটাই কোনো না কোনো একটা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। ওপরের তিনটা ঘরে ট্যাপ করে দেখো কোন প্রশ্ন কী জানতে চায়, তারপর প্রতিটা বাক্যে ট্যাপ করে দেখো সেটা কোন ঘরে গিয়ে বসে।
রসায়নের তিনটা প্রশ্ন
সংজ্ঞার তিনটা শব্দ
রসায়নে মূলত পদার্থের কোন তিনটি দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়?
৩. যে শব্দটার ওপর গোটা বিষয়টা দাঁড়িয়ে
সংজ্ঞার তিনটা প্রশ্নেই একটা শব্দ বারবার ফিরে আসে: পদার্থ। পদার্থ হলো সেটাই, যার ভর আছে এবং যা জায়গা দখল করে। বাতাস চোখে দেখা যায় না, তবু তার ভর আছে আর সে জায়গা দখল করে, তাই বাতাসও পদার্থ। আলো বা শব্দের ভর নেই, জায়গাও দখল করে না, তাই ওরা পদার্থ নয়।
এটা নিছক সংজ্ঞা মুখস্থের ব্যাপার নয়। রসায়ন পদার্থ নিয়ে কাজ করে, তাই প্রশ্নটা যদি পদার্থ নিয়ে না হয়, উত্তরটাও রসায়নের ভেতর থেকে আসবে না। তোমার হাতের বই, হাতটা নিজে, ঘরের বাতাস, গ্লাসের পানি, সবই পদার্থ, আর সবগুলোরই গঠন আছে, ধর্ম আছে, আর সবগুলোই বদলাতে পারে।
৪. ভৌত পরিবর্তন আর রাসায়নিক পরিবর্তন
তৃতীয় প্রশ্নটা, পরিবর্তনের প্রশ্নটা, দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়, আর বইয়ের বাকি অধ্যায়গুলো এই ভাগটার ওপরেই দাঁড়ায়।
বরফ গলে পানি হয়। জিনিসটা কিন্তু H₂O-ই থেকে যায়, শুধু অবস্থা বদলেছে, আর ঠান্ডা করলে আবার বরফ পাওয়া যায়। এটা ভৌত পরিবর্তন: নতুন কোনো পদার্থ তৈরি হয়নি, আর সাধারণত ফিরিয়ে আনা যায়।
মোমবাতি পুড়ে যায়। পোড়া মোম আর মোম নয়, আর ছাই বা ধোঁয়া থেকে মোমবাতি ফিরিয়ে আনা যায় না। এটা রাসায়নিক পরিবর্তন: নতুন পদার্থ তৈরি হয়েছে, আর সহজে ফেরানো যায় না। বইয়ের মূল আগ্রহ এই দ্বিতীয় রকমটায়।
পার্থক্যটা চেনার জন্য একটাই প্রশ্ন লাগে: নতুন কোনো পদার্থ তৈরি হয়েছে কি? নিচের কার্ডগুলোর সামনের দিকে একটা করে ঘটনা। উল্টানোর আগে নিজে উত্তরটা ঠিক করে নাও, তারপর কার্ডে ট্যাপ করো।
ভৌত না রাসায়নিক
কার্ডগুলোর ভেতরে একটা ছন্দ আছে। গলা, ফোটা, ভাঙা, গোলা, বাঁকানো, এগুলোতে পদার্থ একই থাকে, তাই ভৌত। পোড়া, পচা, মরিচা ধরা, হজম হওয়া, পাকা, এগুলোতে প্রতিবার নতুন কিছু তৈরি হয়, তাই রাসায়নিক। রং বদলানো, গন্ধ বদলানো, গ্যাস বেরোনো, তাপ ওঠা বা নামা, এই চারটা প্রায়ই রাসায়নিক পরিবর্তনের চিহ্ন। তবে চিহ্ন প্রমাণ নয়; আসল প্রশ্নটা সবসময় একটাই, নতুন পদার্থ তৈরি হলো কি না।
কোনটায় নতুন পদার্থ
নিচের কোনটি রাসায়নিক পরিবর্তন?
৫. রসায়ন শুধু জানা নয়, কাজে লাগানো
সংজ্ঞাটা তিনটা প্রশ্নে থেমে গেলে রসায়ন হতো নিছক বর্ণনা। বইটা এর সঙ্গে আরেকটা কথা যোগ করে: রসায়ন প্রকৃতির পদার্থগুলোর ধর্ম জানে, আর সেই জানাটা মানুষ ও পরিবেশের কল্যাণে কাজে লাগায়।
এই বাড়তি অংশটুকুই অধ্যায়ের বাকিটা ব্যাখ্যা করে। ওষুধ, সার, কীটনাশক, সাবান, কাপড়ের রং, প্লাস্টিক, জ্বালানি, পানি বিশুদ্ধ করা, খাবার সংরক্ষণ, সবই এই একই কাজের ভিন্ন ভিন্ন চেহারা: একটা পদার্থের ধর্ম জেনে নিয়ে সেটাকে এমনভাবে বদলানো যাতে কাজে লাগে। আর ঠিক এই কারণেই অধ্যায়টা শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তার কথায় গিয়ে ঠেকে, কারণ যে জিনিস কাজে লাগে সেটা ভুলভাবে ব্যবহার করলে ক্ষতিও করে।
৬. শব্দটা এলো কোথা থেকে
ইংরেজি Chemistry শব্দটা এসেছে Chimia বা Alchemy থেকে, আর তার উৎস আরবি আল-কিমিয়া। মধ্যযুগীয় আরবে রসায়নচর্চাকে বলা হতো আলকেমি। সেই চর্চা কীভাবে আজকের রসায়ন হলো, সে গল্পটা অধ্যায়ের পরের অংশে।
৭. রসায়ন পরীক্ষাগারের বাইরেও
রসায়ন মানেই কাচের বোতল আর সাদা অ্যাপ্রন নয়। তুমি আজ সকালে যা যা করেছ, তার অনেকটাই রাসায়নিক পরিবর্তন। খাবার হজম হওয়া, শ্বাস নেওয়া, গাছের সালোকসংশ্লেষণ, চুলায় রান্না, ময়লার স্তূপে পচন, চুলার গ্যাস জ্বলা, সবই নতুন পদার্থ তৈরি হওয়ার ঘটনা।
এটা মাথায় রাখলে বিষয়টার ভার অনেকটা কমে যায়। ক্লাসে যা পড়ছ, সেটা নতুন কোনো জগতের নিয়ম নয়, বরং যে জগতে তুমি সারাদিন আছ তারই নিয়ম, শুধু নামধাম আর সংকেতসহ লেখা।
৮. এরপর অধ্যায়টা কোথায় যায়
রসায়ন যদি গঠন, ধর্ম আর পরিবর্তন হয়, তাহলে বাকি প্রশ্নগুলো নিজে থেকেই দাঁড়িয়ে যায়। এটার হাত কতদূর পৌঁছায়, অর্থাৎ পরিধি। এটা কোন কোন বিজ্ঞানের সঙ্গে কাজ করে। এটা পড়ে লাভ কী। নতুন রসায়ন খুঁজে বের করা হয় কীভাবে, অর্থাৎ অনুসন্ধানের ধাপগুলো। আর সবশেষে, এই কাজটা না ঠকে, না পুড়ে কীভাবে করা যায়। অধ্যায়ের বাকি অংশ ঠিক এই ক্রমেই এগোয়।
সেই পেরেকটা আবার
একটা লোহার পেরেক ভেজা জায়গায় রেখে দিলে এক মাস পরে বাদামি হয়ে যায়। ঘটনাটা রসায়নের কোন প্রশ্নের উদাহরণ, আর তৈরি হওয়া পদার্থটা কী?
এই অধ্যায়ের বোর্ড প্রশ্ন, উত্তর ও ব্যাখ্যা সহ →
সূত্র: রসায়ন, নবম-দশম শ্রেণি (এনসিটিবি), অধ্যায় ১ “রসায়নের ধারণা”, রসায়ন পরিচিতি অনুচ্ছেদ।