চিরকুট। English

বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় · নবম-দশম · অধ্যায় ১ · পরিচ্ছেদ ১.১

বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে ভাষা আন্দোলন।

পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। কিন্তু রাষ্ট্র গঠনের চার বছরের মধ্যেই দেখা গেল, ধর্ম এক হলেও ভাষা এক নয়, আর সেই একটা পার্থক্য থেকেই তেইশ বছরের একটা পথ শুরু হলো। এই নোট সেই পথের প্রথম ধাপটার।

১. শুরুর অঙ্কটা

১৪ আগস্ট ১৯৪৭-এ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হয় দুটি ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন অংশ নিয়ে: পূর্ব বাংলা আর পশ্চিম পাকিস্তান, মাঝে প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার ভারতীয় ভূখণ্ড। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৬ শতাংশ ছিল পূর্ব বাংলার বাঙালি, যাদের মাতৃভাষা বাংলা। অথচ রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব ওঠে উর্দুর, যা তখন পাকিস্তানের একটি ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু অংশের মাতৃভাষা।

এই অসামঞ্জস্যটাই আন্দোলনের যুক্তি, আর যুক্তিটা গোড়া থেকেই গণতান্ত্রিক: রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের ভাষাকে বাদ দিয়ে একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ভাষাকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা অযৌক্তিক। খেয়াল রেখো, আয়তনে পূর্ব বাংলা বরং অনেক ছোট ছিল; সংখ্যাটা জনসংখ্যার, জমির নয়।

মাইলফলক যেকোনো তারিখে ট্যাপ করো

ভাষা আন্দোলনের পাঁচ বছর

দেশভাগ ও পাকিস্তান। ব্রিটিশ ভারত ভাগ হয়ে দুই অংশ নিয়ে পাকিস্তান গঠিত হয়; পূর্ব বাংলা তার একটি প্রদেশ। কেন গুরুত্বপূর্ণ: জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পূর্বে, আর ক্ষমতার কেন্দ্র পশ্চিমে। এই অমিলই পরের সব দ্বন্দ্বের গোড়া।

২. একুশের ঢাকা

পাঠ্যবইয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি একটা বিমূর্ত দিন। আসলে এটা একটা ঘটনাস্থলও, আর পুরো ঘটনাটা ঘটেছিল ঢাকার রমনা এলাকার কয়েক শ গজের মধ্যে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেডিকেল কলেজ হোস্টেল কয়েক মিনিটের হাঁটা পথ।

এখানে একটা সংজ্ঞা দরকার। ১৪৪ ধারা হলো ফৌজদারি কার্যবিধির যে ধারায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কোনো এলাকায় জনসমাগম নিষিদ্ধ করতে পারেন। ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এক মাসের জন্য এটি জারি হয়, যাতে চার বা তার বেশি মানুষের জমায়েত, মিছিল ও সভা নিষিদ্ধ হয়ে যায়।

কোথায় কী সংখ্যাগুলোতে ট্যাপ করো

একুশের ঢাকা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আমতলা। ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে কলা ভবন প্রাঙ্গণে ছাত্রদের সভা, সভাপতি গাজীউল হক। দীর্ঘ বিতর্কের পর সিদ্ধান্ত: ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে, তবে ১০ জন করে ছোট দলে।

ছবিটি শৈলীকৃত, মাপ বা দিক অনুযায়ী নয়; জায়গাগুলোর আপেক্ষিক নৈকট্য বোঝানোই এর কাজ।

এবার সেই দিনটা ঘণ্টায় ঘণ্টায়। একটা কথা আগে বলে রাখা দরকার, কারণ এটাই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝা হয়। “১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল” শুনে অনেকে হাজার মানুষের একটা মিছিল কল্পনা করে। আসলে সিদ্ধান্তটা ছিল উল্টো, ঝুঁকি কমানোর সিদ্ধান্ত। সময়গুলো সূত্রভেদে সামান্য ভিন্ন, তাই নিচে আনুমানিক ধরে নাও।

ধাপে ধাপে পরের ধাপে যাও

একুশে ফেব্রুয়ারি: ঘণ্টায় ঘণ্টায়

সকাল, আনুমানিক ৮টা থেকে ৯টা। ১৪৪ ধারা জারি থাকা সত্ত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন প্রাঙ্গণে ছাত্র ও ছাত্রীরা জমায়েত হতে শুরু করে।

পরদিন, ২২ ফেব্রুয়ারি, শহিদদের গায়েবানা জানাজা ও মিছিলে আবার গুলি চলে; শহিদ হন শফিউর রহমানসহ আরও কয়েকজন। আন্দোলন তখন ঢাকা ছাড়িয়ে জেলা শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।

মিলিয়ে দেখো

একটা প্রশ্ন

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভাঙার জন্য কোন কৌশল নিয়েছিল?

৩. কে কোন ভূমিকা রেখেছিলেন

পরীক্ষায় সবচেয়ে সাধারণ ভুলটা নাম আর সংগঠন গুলিয়ে ফেলা, বিশেষ করে দুটো সংগ্রাম পরিষদ। ১৯৪৮-এর রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ আর ১৯৫২-র সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এক জিনিস নয়, আর দুটোর কাজও আলাদা।

নাম ও সংগঠন নামে ট্যাপ করো

কে কোন ভূমিকা রেখেছিলেন

১৯৪৭। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক; তমদ্দুন মজলিস গঠন করেন এবং প্রথম পুস্তিকা “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা: বাংলা না উর্দু?” প্রকাশের উদ্যোক্তা।

৪. স্বীকৃতি, আর যা থেকে গেল

আন্দোলনের চাপে সরকার নতি স্বীকার করে। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের সংবিধানে, যা গণপরিষদে গৃহীত হয় ২৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬ আর কার্যকর হয় ২৩ মার্চ ১৯৫৬, অনুচ্ছেদ ২১৪-তে বাংলা ও উর্দু দুটিকেই রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়। ১৯৬২-র সংবিধানও এই স্বীকৃতি বজায় রাখে।

অনেক পরে এল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯-এ ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করা হয়, আর ২০০০ সাল থেকে দিনটি বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে।

এবার এই নোটের আসল প্রশ্নে আসা যাক: ভাষার একটা দাবি জাতীয়তাবাদের সূচনা হয় কীভাবে? পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে। ভাষা আন্দোলন দেখাল যে ধর্ম এক হলেও ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থ আলাদা হতে পারে। বাঙালি প্রথমবার নিজেকে “পাকিস্তানি মুসলমান” নয়, “বাঙালি” হিসেবে ভাবতে শিখল, আর এই বোধই পরবর্তী সব আন্দোলনের ভিত্তি।

মিলিয়ে দেখো

আরেকটা প্রশ্ন

পাকিস্তানের কোন সংবিধানে এবং কত সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়?

ভাষা আন্দোলনের ফলগুলোও পরপর সাজানো যায়, আর সাজালে দেখা যায় সেগুলো কেবল ভাষার নয়। এক, বাঙালির আত্মপরিচয়ের বোধ। দুই, ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে চলে আসা। তিন, ১৯৫৪-র যুক্তফ্রন্টের একুশ দফার প্রথম দফাই ছিল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা। চার, একুশে ফেব্রুয়ারি ঘিরে গান, কবিতা ও সংকলনের একটা সংস্কৃতি। আর পাঁচ, ১৯৫৬-র সাংবিধানিক স্বীকৃতি।

মিলিয়ে দেখো

শেষ প্রশ্ন

পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৬ শতাংশ ছিল বাঙালি। এই তথ্যটি ভাষা আন্দোলনের যুক্তিকে কীভাবে শক্তিশালী করে?

এক নজরে

১৯৪৭। ১৪ আগস্ট পাকিস্তান; ২ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিস ও পুস্তিকা; ডিসেম্বরে করাচি শিক্ষা সম্মেলনের উর্দু-সুপারিশ।

১৯৪৮। ২৫ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব; ১১ মার্চ ধর্মঘট; ২১ ও ২৪ মার্চ জিন্নাহর ঘোষণা।

১৯৫২। ২৬ জানুয়ারি নাজিমউদ্দিনের ঘোষণা; ৩১ জানুয়ারি সর্বদলীয় পরিষদ; ২০ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা; ২১ ফেব্রুয়ারি গুলি ও শহিদ; ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রথম শহিদ মিনার, ২৬ ফেব্রুয়ারি তা ভেঙে দেওয়া হয়।

১৯৫৬ ও ১৯৯৯। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১৪-তে বাংলা ও উর্দু দুটিই রাষ্ট্রভাষা; আর ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯-এ ইউনেস্কোর ঘোষণায় ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

নোট থেকে কাটা কার্ডে ট্যাপ করে উল্টাও

তারিখ মনে রাখার কার্ড

তারিখ২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭
উত্তরতমদ্দুন মজলিস গঠন, অধ্যাপক আবুল কাসেমের উদ্যোগে।
তারিখ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮
উত্তরগণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাংলা-প্রস্তাব, যা নাকচ হয়।
তারিখ১১ মার্চ ১৯৪৮
উত্তরপ্রদেশজুড়ে ধর্মঘট; দিনটি “বাংলা ভাষা দাবি দিবস”।
তারিখ২১ মার্চ ১৯৪৮
উত্তররেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহর ঘোষণা: উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।
তারিখ২৬ জানুয়ারি ১৯৫২
উত্তরপল্টন ময়দানে খাজা নাজিমউদ্দিনের একই ঘোষণা।
তারিখ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২
উত্তরঢাকায় এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি।
তারিখ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২
উত্তরপ্রথম শহিদ মিনার পুলিশ ভেঙে ফেলে।
তারিখ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯
উত্তরইউনেস্কোর ঘোষণা: ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

এই অধ্যায়ের বোর্ড প্রশ্ন, উত্তর ও ব্যাখ্যা সহ →

সূত্র: বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, নবম-দশম শ্রেণি (এনসিটিবি), অধ্যায় ১, পরিচ্ছেদ ১.১ “বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে ভাষা আন্দোলন”।