বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় · নবম-দশম · অধ্যায় ১ · পরিচ্ছেদ ১.১
বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে ভাষা আন্দোলন।
পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। কিন্তু রাষ্ট্র গঠনের চার বছরের মধ্যেই দেখা গেল, ধর্ম এক হলেও ভাষা এক নয়, আর সেই একটা পার্থক্য থেকেই তেইশ বছরের একটা পথ শুরু হলো। এই নোট সেই পথের প্রথম ধাপটার।
১. শুরুর অঙ্কটা
১৪ আগস্ট ১৯৪৭-এ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হয় দুটি ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন অংশ নিয়ে: পূর্ব বাংলা আর পশ্চিম পাকিস্তান, মাঝে প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার ভারতীয় ভূখণ্ড। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৬ শতাংশ ছিল পূর্ব বাংলার বাঙালি, যাদের মাতৃভাষা বাংলা। অথচ রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব ওঠে উর্দুর, যা তখন পাকিস্তানের একটি ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু অংশের মাতৃভাষা।
এই অসামঞ্জস্যটাই আন্দোলনের যুক্তি, আর যুক্তিটা গোড়া থেকেই গণতান্ত্রিক: রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের ভাষাকে বাদ দিয়ে একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ভাষাকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা অযৌক্তিক। খেয়াল রেখো, আয়তনে পূর্ব বাংলা বরং অনেক ছোট ছিল; সংখ্যাটা জনসংখ্যার, জমির নয়।
মাইলফলকযেকোনো তারিখে ট্যাপ করো
ভাষা আন্দোলনের পাঁচ বছর
দেশভাগ ও পাকিস্তান। ব্রিটিশ ভারত ভাগ হয়ে দুই অংশ নিয়ে পাকিস্তান গঠিত হয়; পূর্ব বাংলা তার একটি প্রদেশ। কেন গুরুত্বপূর্ণ: জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পূর্বে, আর ক্ষমতার কেন্দ্র পশ্চিমে। এই অমিলই পরের সব দ্বন্দ্বের গোড়া।
তমদ্দুন মজলিস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাসেমের উদ্যোগে গঠিত সাংস্কৃতিক সংগঠন। সেপ্টেম্বরেই তারা পুস্তিকা প্রকাশ করে, “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা: বাংলা না উর্দু?” কেন গুরুত্বপূর্ণ: দাবিটি প্রথমবার লিখিত ও যুক্তিসাজানো রূপ পেল।
করাচির শিক্ষা সম্মেলন। কেন্দ্রীয় সরকারের জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ হয়। এর প্রতিবাদে ঢাকায় ছাত্র ও শিক্ষকদের মিছিল বের হয়। কেন গুরুত্বপূর্ণ: এটাই প্রথম আনুষ্ঠানিক সংঘাত।
গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে পূর্ব বাংলার সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রস্তাব করেন, উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাও গণপরিষদের কাজের ভাষা হোক। প্রস্তাবটি নাকচ হয়। কেন গুরুত্বপূর্ণ: দাবির প্রথম সংসদীয় রূপ।
১১ মার্চের ধর্মঘট। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকে পূর্ব বাংলায় সাধারণ ধর্মঘট; সচিবালয়সহ নানা জায়গায় পিকেটিং, গ্রেপ্তার ও লাঠিচার্জ। দিনটি পরে “বাংলা ভাষা দাবি দিবস” হিসেবে পালিত হয়। ১৫ মার্চ সরকার ছাত্রনেতাদের সঙ্গে আট দফা চুক্তি করে আন্দোলন সাময়িকভাবে থামায়।
জিন্নাহর ঘোষণা। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে সমাবর্তনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। কার্জন হলে ছাত্ররা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ জানায়। কেন গুরুত্বপূর্ণ: দাবি সাংস্কৃতিক থেকে রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নিল।
নাজিমউদ্দিনের ঘোষণা। ঢাকার পল্টন ময়দানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন আবার ঘোষণা করেন উর্দুই রাষ্ট্রভাষা হবে। ৩০ জানুয়ারি ছাত্র ধর্মঘট, আর ৩১ জানুয়ারি গঠিত হয় সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ, যারা ২১ ফেব্রুয়ারি সারা প্রদেশে হরতাল ও বিক্ষোভের ডাক দেয়।
১৪৪ ধারা, আর একুশে ফেব্রুয়ারি। ২০ ফেব্রুয়ারি সরকার ঢাকায় এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে। পরদিন আমতলার সভায় সিদ্ধান্ত হয় ধারা ভাঙা হবে; পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে, আর বিকেলে গুলি চালায়। শহিদ হন রফিক উদ্দিন আহমদ, আবুল বরকত, আবদুল জব্বার; আবদুস সালাম গুরুতর আহত হয়ে পরে মারা যান।
স্বীকৃতি। আন্দোলনের চাপে সরকার নতি স্বীকার করে। পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১৪-তে বাংলা ও উর্দু, দুটিকেই রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়। কেন গুরুত্বপূর্ণ: আন্দোলন সফল হলো, কিন্তু প্রশ্নটা থেকে গেল, ভাষা মিলল, বৈষম্য মিটল কি?
২. একুশের ঢাকা
পাঠ্যবইয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি একটা বিমূর্ত দিন। আসলে এটা একটা ঘটনাস্থলও, আর পুরো ঘটনাটা ঘটেছিল ঢাকার রমনা এলাকার কয়েক শ গজের মধ্যে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেডিকেল কলেজ হোস্টেল কয়েক মিনিটের হাঁটা পথ।
এখানে একটা সংজ্ঞা দরকার। ১৪৪ ধারা হলো ফৌজদারি কার্যবিধির যে ধারায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কোনো এলাকায় জনসমাগম নিষিদ্ধ করতে পারেন। ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এক মাসের জন্য এটি জারি হয়, যাতে চার বা তার বেশি মানুষের জমায়েত, মিছিল ও সভা নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
কোথায় কীসংখ্যাগুলোতে ট্যাপ করো
একুশের ঢাকা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আমতলা। ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে কলা ভবন প্রাঙ্গণে ছাত্রদের সভা, সভাপতি গাজীউল হক। দীর্ঘ বিতর্কের পর সিদ্ধান্ত: ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে, তবে ১০ জন করে ছোট দলে।
কার্জন হল। ২৪ মার্চ ১৯৪৮-এ এখানেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে জিন্নাহ উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করলে ছাত্ররা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ জানায়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল। ১৪৪ ধারা ভেঙে বেরোনো ছাত্রদের উপর পুলিশ প্রথমে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে, পরে বিকেলে হোস্টেল এলাকায় গুলি চালায়। শহিদ হন রফিক উদ্দিন আহমদ, আবুল বরকত ও আবদুল জব্বার; আবদুস সালাম গুরুতর আহত হয়ে পরে মারা যান।
প্রথম শহিদ মিনার। ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা নিজেরাই ইট ও বালি জোগাড় করে হোস্টেল প্রাঙ্গণে স্মৃতিস্তম্ভটি গড়ে তোলেন। ২৬ ফেব্রুয়ারি পুলিশ সেটি ভেঙে দেয়।
১৪৪ ধারা। এটি কোনো একটি জায়গা নয়, তাই ছবিতে গোটা এলাকাটাই ঘিরে রাখা। ২০ ফেব্রুয়ারি সরকার ঢাকায় এক মাসের জন্য এটি জারি করে, আর তাতে চার বা তার বেশি মানুষের জমায়েত, মিছিল ও সভা নিষিদ্ধ হয়।
সবগুলোই দেখা হলো। খেয়াল করো, সভা, ধারা ভঙ্গ, গুলি আর স্মৃতিস্তম্ভ, সবই আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে, একই পাড়ায়।
ছবিটি শৈলীকৃত, মাপ বা দিক অনুযায়ী নয়; জায়গাগুলোর আপেক্ষিক নৈকট্য বোঝানোই এর কাজ।
এবার সেই দিনটা ঘণ্টায় ঘণ্টায়। একটা কথা আগে বলে রাখা দরকার, কারণ এটাই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝা হয়। “১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল” শুনে অনেকে হাজার মানুষের একটা মিছিল কল্পনা করে। আসলে সিদ্ধান্তটা ছিল উল্টো, ঝুঁকি কমানোর সিদ্ধান্ত। সময়গুলো সূত্রভেদে সামান্য ভিন্ন, তাই নিচে আনুমানিক ধরে নাও।
ধাপে ধাপেপরের ধাপে যাও
একুশে ফেব্রুয়ারি: ঘণ্টায় ঘণ্টায়
সকাল, আনুমানিক ৮টা থেকে ৯টা। ১৪৪ ধারা জারি থাকা সত্ত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন প্রাঙ্গণে ছাত্র ও ছাত্রীরা জমায়েত হতে শুরু করে।
বেলা, আনুমানিক ১১টা। আমতলার সভা শুরু হয়, সভাপতি গাজীউল হক। প্রশ্ন একটাই: ১৪৪ ধারা মানা হবে, না ভাঙা হবে? মত দুই ভাগ।
দুপুর, আনুমানিক ১২টা। ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত হয়, কিন্তু বড় মিছিল নয়। ১০ জনের ছোট দলে ফটক পেরিয়ে বেরোনো হবে, যাতে ভিড়ে প্রাণহানি না ঘটে।
দুপুর থেকে বিকেল। প্রতিটি দল বেরোতেই পুলিশ আটক করে, সঙ্গে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস। ছাত্ররা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের দিকে সরে যায়, আর সেখানে জমায়েত বাড়তে থাকে।
বিকেল। হোস্টেল এলাকায় পুলিশ গুলি চালায়। শহিদ হন রফিক, বরকত ও জব্বার; সালাম আহত হয়ে পরে মারা যান। রাতেই খবর শহরজুড়ে ছড়ায়, আর পরদিন মিছিল আরও বড় হয়।
পরদিন, ২২ ফেব্রুয়ারি, শহিদদের গায়েবানা জানাজা ও মিছিলে আবার গুলি চলে; শহিদ হন শফিউর রহমানসহ আরও কয়েকজন। আন্দোলন তখন ঢাকা ছাড়িয়ে জেলা শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।
মিলিয়ে দেখো
একটা প্রশ্ন
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভাঙার জন্য কোন কৌশল নিয়েছিল?
ঠিক এটাই এড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। বড় মিছিলে ভিড় ও প্রাণহানির ঝুঁকি বেশি, তাই ছোট দলে বেরোনো হয়।
ঠিক। আমতলার সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে, কিন্তু বড় মিছিলের ঝুঁকি এড়াতে ১০ জন করে ছোট দলে ফটক পেরিয়ে বেরোনো হবে। পুলিশ প্রতিটি দলকেই আটক করতে থাকে।
জমায়েত হয়েছিল দিনের আলোয়, প্রকাশ্যে। গোপনে হলে ধারা ভাঙার প্রতিবাদী অর্থটাই থাকত না।
হরতালের ডাক ছিল, কিন্তু প্রশ্নটা ১৪৪ ধারা ভাঙার কৌশল নিয়ে, আর সেটা ঘরে বসে হয় না।
৩. কে কোন ভূমিকা রেখেছিলেন
পরীক্ষায় সবচেয়ে সাধারণ ভুলটা নাম আর সংগঠন গুলিয়ে ফেলা, বিশেষ করে দুটো সংগ্রাম পরিষদ। ১৯৪৮-এর রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ আর ১৯৫২-র সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এক জিনিস নয়, আর দুটোর কাজও আলাদা।
নাম ও সংগঠননামে ট্যাপ করো
কে কোন ভূমিকা রেখেছিলেন
১৯৪৭। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক; তমদ্দুন মজলিস গঠন করেন এবং প্রথম পুস্তিকা “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা: বাংলা না উর্দু?” প্রকাশের উদ্যোক্তা।
১৯৪৮। ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলাকে কাজের ভাষা করার প্রস্তাব তোলেন। প্রস্তাবটি নাকচ হয়, কিন্তু দাবিটি প্রথমবার সংসদীয় রূপ পায়।
১৯৪৭। ২ সেপ্টেম্বর গঠিত সাংস্কৃতিক সংগঠন; ভাষার দাবিকে প্রথম লিখিত ও যুক্তিসাজানো রূপ দেয়।
১৯৪৮। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ, যারা ১১ মার্চের সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয়। এটিকে ১৯৫২-র পরিষদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলো না।
১৯৫২। ৩১ জানুয়ারি গঠিত সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ, আহ্বায়ক কাজী গোলাম মাহবুব। এরাই ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি ঘোষণা করে।
১৯৪৮। ২১ ও ২৪ মার্চ ঢাকায় ঘোষণা করেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।
১৯৫২। ২৬ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে একই ঘোষণার পুনরাবৃত্তি করেন। এর পরই আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয়।
১৯৫২। ২১ ফেব্রুয়ারি আমতলার ছাত্রসভায় সভাপতিত্ব করেন, যে সভায় ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত হয়।
১৯৫২। ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে শহিদ হন; তাঁদের নামেই দিনটি স্মরণীয়। আবদুস সালাম গুরুতর আহত হয়ে পরে মারা যান।
১৯৫৭ থেকে ১৯৬৩। বর্তমান কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের নকশাকার, সহযোগী ভাস্কর নভেরা আহমেদ। নির্মাণ শুরু ১৯৫৭, উদ্বোধন ১৯৬৩।
দশটাই দেখা হলো। খেয়াল করো, দুটো সংগ্রাম পরিষদের সাল আলাদা: ১৯৪৮-এরটি ধর্মঘট ডেকেছিল, ১৯৫২-রটি একুশে ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি।
৪. স্বীকৃতি, আর যা থেকে গেল
আন্দোলনের চাপে সরকার নতি স্বীকার করে। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের সংবিধানে, যা গণপরিষদে গৃহীত হয় ২৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬ আর কার্যকর হয় ২৩ মার্চ ১৯৫৬, অনুচ্ছেদ ২১৪-তে বাংলা ও উর্দু দুটিকেই রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়। ১৯৬২-র সংবিধানও এই স্বীকৃতি বজায় রাখে।
অনেক পরে এল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯-এ ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করা হয়, আর ২০০০ সাল থেকে দিনটি বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে।
এবার এই নোটের আসল প্রশ্নে আসা যাক: ভাষার একটা দাবি জাতীয়তাবাদের সূচনা হয় কীভাবে? পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে। ভাষা আন্দোলন দেখাল যে ধর্ম এক হলেও ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থ আলাদা হতে পারে। বাঙালি প্রথমবার নিজেকে “পাকিস্তানি মুসলমান” নয়, “বাঙালি” হিসেবে ভাবতে শিখল, আর এই বোধই পরবর্তী সব আন্দোলনের ভিত্তি।
মিলিয়ে দেখো
আরেকটা প্রশ্ন
পাকিস্তানের কোন সংবিধানে এবং কত সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়?
১৯৪৭-এর আইনে দেশভাগের ব্যবস্থা ছিল, রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটা তখনো ওঠেইনি।
ঠিক। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে গৃহীত পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১৪-তে বাংলা ও উর্দু দুটিকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
১৯৬২-র সংবিধান স্বীকৃতিটি বজায় রেখেছিল, কিন্তু দিয়েছিল ১৯৫৬-রটি। প্রশ্নে প্রথমবারের কথা বলা হয়েছে।
লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার ছিল ১৯৭০-এর নির্বাচনের কাঠামো, ভাষার ব্যাপার নয়।
ভাষা আন্দোলনের ফলগুলোও পরপর সাজানো যায়, আর সাজালে দেখা যায় সেগুলো কেবল ভাষার নয়। এক, বাঙালির আত্মপরিচয়ের বোধ। দুই, ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে চলে আসা। তিন, ১৯৫৪-র যুক্তফ্রন্টের একুশ দফার প্রথম দফাই ছিল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা। চার, একুশে ফেব্রুয়ারি ঘিরে গান, কবিতা ও সংকলনের একটা সংস্কৃতি। আর পাঁচ, ১৯৫৬-র সাংবিধানিক স্বীকৃতি।
মিলিয়ে দেখো
শেষ প্রশ্ন
পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৬ শতাংশ ছিল বাঙালি। এই তথ্যটি ভাষা আন্দোলনের যুক্তিকে কীভাবে শক্তিশালী করে?
আয়তনে পূর্ব বাংলা বরং অনেক ছোট ছিল। সংখ্যাটা জনসংখ্যার, জমির নয়, আর যুক্তিটাও মানুষ নিয়ে।
ঠিক। আন্দোলনের মূল যুক্তিটি ছিল গণতান্ত্রিক: রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের ভাষাকে বাদ দিয়ে একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ভাষাকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা অযৌক্তিক।
কোন ভাষা কঠিন আর কোনটা সহজ, সেটা আন্দোলনের যুক্তি ছিল না। যুক্তিটা ছিল কে কোন ভাষায় কথা বলে তা নিয়ে।
শিক্ষার হারের সঙ্গে এই সংখ্যাটার সম্পর্ক নেই। এটা কেবল জনসংখ্যার অনুপাত।
এক নজরে
১৯৪৭। ১৪ আগস্ট পাকিস্তান; ২ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিস ও পুস্তিকা; ডিসেম্বরে করাচি শিক্ষা সম্মেলনের উর্দু-সুপারিশ।
১৯৪৮। ২৫ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব; ১১ মার্চ ধর্মঘট; ২১ ও ২৪ মার্চ জিন্নাহর ঘোষণা।
১৯৫২। ২৬ জানুয়ারি নাজিমউদ্দিনের ঘোষণা; ৩১ জানুয়ারি সর্বদলীয় পরিষদ; ২০ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা; ২১ ফেব্রুয়ারি গুলি ও শহিদ; ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রথম শহিদ মিনার, ২৬ ফেব্রুয়ারি তা ভেঙে দেওয়া হয়।
১৯৫৬ ও ১৯৯৯। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১৪-তে বাংলা ও উর্দু দুটিই রাষ্ট্রভাষা; আর ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯-এ ইউনেস্কোর ঘোষণায় ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
নোট থেকে কাটাকার্ডে ট্যাপ করে উল্টাও
তারিখ মনে রাখার কার্ড
তারিখ২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭
উত্তরতমদ্দুন মজলিস গঠন, অধ্যাপক আবুল কাসেমের উদ্যোগে।
তারিখ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮
উত্তরগণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাংলা-প্রস্তাব, যা নাকচ হয়।
তারিখ১১ মার্চ ১৯৪৮
উত্তরপ্রদেশজুড়ে ধর্মঘট; দিনটি “বাংলা ভাষা দাবি দিবস”।
তারিখ২১ মার্চ ১৯৪৮
উত্তররেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহর ঘোষণা: উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।
তারিখ২৬ জানুয়ারি ১৯৫২
উত্তরপল্টন ময়দানে খাজা নাজিমউদ্দিনের একই ঘোষণা।
তারিখ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২
উত্তরঢাকায় এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি।
তারিখ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২
উত্তরপ্রথম শহিদ মিনার পুলিশ ভেঙে ফেলে।
তারিখ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯
উত্তরইউনেস্কোর ঘোষণা: ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।