ফসল ফলানো যত বড় কাজ, ফলানো জিনিস নষ্ট না হতে দেওয়াও তত বড়। আগের পরিচ্ছেদে দেখেছ, সংরক্ষণের সময় প্রায় ১০ ভাগ ফসল নষ্ট হয়। খাদ্য সংরক্ষণ সেই ক্ষতিটা ঠেকানোরই প্রযুক্তি, আর এই পরিচ্ছেদ মূলত খামারের খাদ্য নিয়ে: মাছের খাদ্য আর পশুপাখির খাদ্য।
১. সংরক্ষণ মানে গুণাগুণ ঠিক রাখা
কোনো খাদ্যের গুণাগুণ ও পুষ্টিমান ঠিক রেখে ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য খাদ্যকে প্রক্রিয়াজাত করে রেখে দেওয়াকেই বলে খাদ্য সংরক্ষণ। সংজ্ঞার ভিতরে “গুণাগুণ ও পুষ্টিমান ঠিক রেখে” অংশটাই সংরক্ষণকে শুধু জমিয়ে রাখা থেকে আলাদা করে। পচেনি মানেই ভালো আছে, ব্যাপারটা তা নয়।
খাদ্য নষ্ট হওয়ার পিছনে চারটে জিনিস, আর প্রত্যেকটার নিজের সীমা আছে। আর্দ্রতা ১০ শতাংশের বেশি হলে ছত্রাক ও পোকা জন্মায়। আপেক্ষিক আর্দ্রতা, অর্থাৎ বাতাসের আর্দ্রতা, ৬৫ শতাংশের বেশি হলে ছত্রাক ও পোকা বংশবৃদ্ধি করে। তাপমাত্রা ২৬ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পোকার বংশবৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে অনুকূল, আর এই তাপে পুষ্টিও নষ্ট হয়। আর সূর্যালোক কয়েক মিনিটেই ভিটামিন নষ্ট করে, অক্সিজেন চর্বিকে জারিত করে বাসি গন্ধ ধরায় ও পোকার বৃদ্ধি ঘটায়।
একটা সতর্কতা এখানেই দিয়ে রাখা ভালো। আগের পরিচ্ছেদে বীজের নিরাপদ আর্দ্রতা ছিল ১২ শতাংশ, আর এখানে খাদ্যের সীমা ১০ শতাংশ। দুটো আলাদা সংখ্যা, আর পরীক্ষায় এরাই সবচেয়ে বেশি গুলিয়ে যায়।
তিনটি কাঁটাতিনটি স্লাইডার টেনে দেখো
কখন নষ্ট হবে
চার শত্রুশত্রুর নামে ট্যাপ করো
চারটি শত্রু
সীমা ১০%। এর বেশি হলে ছত্রাক ও পোকা জন্মায়। উপায়: ভালো করে শুকানো, বায়ুরোধী পাত্র, আর মেঝে থেকে ১২ থেকে ১৫ সেমি উঁচু কাঠের মাচা।
সীমা ৬৫%। বাতাসেই যদি এত আর্দ্রতা থাকে, শুকনা খাদ্যও বাতাস থেকে পানি টেনে নেয়, আর তখন ছত্রাক ও পোকা বংশবৃদ্ধি করে। উপায়: ঠাণ্ডা ও শুকনা গুদাম, বায়ুরোধী পাত্র।
২৬ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পোকার বংশবৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে অনুকূল, আর এই তাপে খাদ্যের পুষ্টিমানও নষ্ট হয়। উপায়: ঠাণ্ডা জায়গা, আর ভিটামিন, খনিজ ও টাটকা মাছ হিমায়িত রাখা।
সূর্যালোকে কয়েক মিনিটেই ভিটামিন নষ্ট হয়; অক্সিজেনে চর্বি জারিত হয়ে বাসি গন্ধ ধরে আর পোকা বাড়ে। উপায়: তেলসমৃদ্ধ খাদ্য অস্বচ্ছ বা অন্ধকার পাত্রে, আর ভিটামিন ও খনিজ বায়ুরোধী ও আলোরোধী পাত্রে।
চারটেই দেখা হলো। খেয়াল করো, চারটে শত্রুর প্রতিকারও ঘুরেফিরে একই চারটে: শুকাও, ঠাণ্ডা রাখো, বাতাস আটকাও, আলো আটকাও।
মিলিয়ে দেখো
একটা প্রশ্ন
একটি গুদামে খাদ্যের আর্দ্রতা ৮%, আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৭৫%, তাপমাত্রা ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। খাদ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি আছে কি?
খাদ্যের নিজের আর্দ্রতা ঠিকই আছে, কিন্তু তিনটি শর্তের একটিই যথেষ্ট। বাতাসের আর্দ্রতাটা দেখো।
ঠিক। তিনটি শর্তের যেকোনো একটি ভাঙলেই ঝুঁকি। এখানে খাদ্যের নিজের আর্দ্রতা ৮% আর তাপমাত্রা ২২ ডিগ্রি, দুটোই ঠিক; কিন্তু বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৭৫%, যা বইয়ের সীমা ৬৫%-এর অনেক উপরে। এমন বাতাসে শুকনা খাদ্যও পানি টেনে নেয়, তারপর ছত্রাক ও পোকা বংশবৃদ্ধি করে।
তাপমাত্রা সত্যিই নিরাপদ পরিসরে, কিন্তু সেটা একটা শর্ত মাত্র। বাকি দুটোও দেখতে হবে।
কম তাপমাত্রা সমস্যা নয়, বরং সুবিধা। বইয়ের বিপজ্জনক পরিসর ২৬ থেকে ৩০ ডিগ্রি।
২. শুকনা না ভেজা
মাছের খাদ্যের জন্য বই দুটো আলাদা নিয়ম দেয়, আর নিয়ম দুটো একেবারে উল্টো। শুকনা খাদ্য ও উপাদান রাখতে হবে বায়ুরোধী পাত্র বা বস্তায়, ঠাণ্ডা ও শুকনা জায়গায়, আর মাছের শুকনা খাদ্যের ক্ষেত্রে সংরক্ষণকাল ৩ মাসের বেশি নয়। বস্তা রাখতে হবে মেঝে থেকে ১২ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার উঁচু কাঠের মাচায়, বস্তার চারপাশে ছাই ছিটিয়ে পোকা ঠেকাতে হবে, আর ইঁদুর থেকে বাঁচাতে হবে।
ভেজা ও সংবেদনশীল উপাদানের নিয়ম আলাদা। টাটকা ছোট মাছ সঙ্গে সঙ্গে খাওয়াতে হবে, নয়তো হিমায়িত রাখতে হবে। তেলসমৃদ্ধ খাদ্য রাখতে হবে অস্বচ্ছ বা অন্ধকার পাত্রে, নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায়, কারণ আলো ও অক্সিজেনে চর্বি নষ্ট হয়। আর ভিটামিন ও খনিজ রাখতে হবে বায়ুরোধী, আলোরোধী পাত্রে, হিমায়িত অবস্থায়।
ভাগ করোচিপে ট্যাপ করে বিন বেছে নাও
কোনটা কোথায় রাখবে
একটা চিপ ধরো, তারপর বিনে ছাড়ো। প্রশ্নটা হলো, এটা কি শুকিয়ে রাখার জিনিস, না ঠাণ্ডা ও অন্ধকারে রাখার?
ঠিক। পরেরটা।
এখানে না। ভাবো, এতে কি পানি বা তেল আছে, নাকি এটা এমনিতেই শুকনা?
সব ঠিক জায়গায়। শুকনা: বায়ুরোধী পাত্র বা বস্তায়, ঠাণ্ডা ও শুকনা জায়গায়; মাছের শুকনা খাদ্যের ক্ষেত্রে ৩ মাসের বেশি নয়; বস্তা রাখো মেঝে থেকে ১২ থেকে ১৫ সেমি উঁচু কাঠের মাচায়, চারপাশে ছাই। ভেজা ও সংবেদনশীল: টাটকা ছোট মাছ সঙ্গে সঙ্গে খাওয়াও নয়তো হিমায়িত করো; তেলসমৃদ্ধ খাদ্য অন্ধকার পাত্রে নিয়ন্ত্রিত তাপে; ভিটামিন ও খনিজ বায়ুরোধী ও আলোরোধী পাত্রে হিমায়িত।
৩. পশুপাখির খাদ্য: পাঁচ পথ
পশুপাখির খাদ্য সংরক্ষণের পাঁচটি পদ্ধতির কথা বই বলে, আর প্রথম দুটো পরস্পরের উল্টো পথে একই কাজ করে। শাখাগুলো খুলে দেখো।
শাখাশাখায় ট্যাপ করে খোলো
পশুপাখির খাদ্য সংরক্ষণের পাঁচ পথ
পশুপাখির খাদ্য সংরক্ষণ
হে শুকিয়ে বাঁচানো
শিম-গোত্রীয় ঘাস ভালো
ফুল আসার সময় কাটতে হয়
শুকিয়ে আর্দ্রতা ১৫ থেকে ২০%
মাচা বা ছাউনির নিচে গাদা করে রাখা
সাইলেজ বাতাস বন্ধ করে বাঁচানো
ভুট্টা, নেপিয়ার ও গিনি ঘাস উপযুক্ত
রসালো অবস্থায়, ফুল আসার সময় কাটা
বায়ুশূন্য গর্তে চাপ দিয়ে ভরা
গুড়ের দ্রবণ মেশানো
বাতাস ঢুকতে না দিয়ে সিল করা
খড় মাড়াইয়ের পর যা থাকে
ধান, ভুট্টা ও ডাল মাড়াই করে দানা আলাদা করার পর
শুকিয়ে আর্দ্রতা ১৫ থেকে ২০%
গাদা করে রাখা
শস্য ও তেলবীজের উপজাত মিলের পর যা থাকে
চালের কুঁড়া
গমের ভুসি
ডালের খোসা
খৈল
কারখানায় প্রস্তুত খাদ্য তিন আকারে
পিলেট
মেশ
ক্রাম্বল
হে আর সাইলেজ, দুটোই ঘাস সংরক্ষণ, আর সেজন্যই এরা সবচেয়ে বেশি গুলিয়ে যায়। পচনের জন্য দরকার পানি আর বাতাস, দুটোই; একটা কেড়ে নিলেই পচন থামে। হে পানি কাড়ে, আর সাইলেজ বাতাস কাড়ে। হাতল টেনে দুটো পাশাপাশি দেখো।
দুই পথহাতল টেনে দেখো
হে না সাইলেজ
মিলিয়ে দেখো
আরেকটা প্রশ্ন
হে ও সাইলেজ, দুটোই ঘাস সংরক্ষণের পদ্ধতি। মূল পার্থক্যটা কী?
উল্টো। হে-র জন্য শিম-গোত্রীয় ঘাস ভালো, আর সাইলেজের জন্য ভুট্টা, নেপিয়ার ও গিনি ঘাস।
ঠিক। পচন ঠেকাতে দুটো পথ, পানি সরানো বা বাতাস সরানো। হে শুকিয়ে আর্দ্রতা ১৫ থেকে ২০%-এ নামায়, আর সাইলেজ রসালো ঘাস বায়ুশূন্য গর্তে চাপ দিয়ে ভরে, গুড়ের দ্রবণ মিশিয়ে সিল করে রাখে।
উল্টো। গর্ত সাইলেজের, আর মাচা বা ছাউনি হে-র।
গুড়ের দ্রবণ শুধু সাইলেজে মেশানো হয়, হে-তে নয়। হে-তে কিছু মেশানোই হয় না, কেবল শুকানো হয়।
মিলিয়ে দেখো
শেষ প্রশ্ন
খাদ্যদ্রব্যে আর্দ্রতা কত শতাংশের বেশি হলে ছত্রাক ও পোকা জন্মায়?
৫% সীমার অনেক নিচে, অর্থাৎ নিরাপদ দিকে। বইয়ের সীমা এর দ্বিগুণ।
ঠিক। বই বলে ১০ শতাংশের বেশি আর্দ্রতা হলে ছত্রাক ও পোকা জন্মায়। সতর্ক থেকো: বীজের নিরাপদ সংরক্ষণ-আর্দ্রতা ১২%, আর ৩৫% থেকে ৬০% হলো যেখানে বীজ নিজেই গজাতে শুরু করে। তিনটি সংখ্যা তিন প্রসঙ্গের।
১৫ থেকে ২০% হলো হে ও খড়ের আর্দ্রতা, শুকনা খাদ্যের সীমা নয়।
৩৫% হলো বীজের গজাতে শুরু করার পরিসরের নিম্নসীমা, আর সেটা আগের পরিচ্ছেদের কথা।
এক নজরে
সংজ্ঞা। গুণাগুণ ও পুষ্টিমান ঠিক রেখে ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য খাদ্যকে প্রক্রিয়াজাত করে রেখে দেওয়া।
চার শত্রু ও তাদের সীমা। আর্দ্রতা ১০%, আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৬৫%, তাপমাত্রা ২৬ থেকে ৩০ ডিগ্রি, আর আলো ও অক্সিজেন।
মাছের খাদ্য। শুকনা: বায়ুরোধী পাত্রে, ঠাণ্ডা-শুকনা জায়গায়, ৩ মাসের বেশি নয়, মাচা মেঝে থেকে ১২ থেকে ১৫ সেমি উঁচু, চারপাশে ছাই। ভেজা: টাটকা মাছ সঙ্গে সঙ্গে বা হিমায়িত, তেলসমৃদ্ধ অন্ধকার পাত্রে, ভিটামিন-খনিজ বায়ুরোধী ও আলোরোধী পাত্রে হিমায়িত।
পাঁচ পদ্ধতি। হে (আর্দ্রতা ১৫ থেকে ২০%), সাইলেজ (বায়ুশূন্য গর্ত, গুড়ের দ্রবণ), খড় (আর্দ্রতা ১৫ থেকে ২০%), শস্য ও তেলবীজের উপজাত, আর কারখানার পিলেট, মেশ ও ক্রাম্বল।
নিরাপত্তা। খাদ্য গুদামে বিষাক্ত দ্রব্য রাখা যাবে না। পোকা ঠেকাতে বইয়ের ব্যবস্থাগুলো অরাসায়নিক: ছাই, মাচা, বায়ুরোধী পাত্র, শুকানো ও হিমায়ন।